হাইলাইটস
• তামিলনাড়ুর হোসুরে টাটা ইলেকট্রনিক্সের আইফোন যন্ত্রাংশ কারখানার বিরুদ্ধে ভূগর্ভস্থ জল দূষণের অভিযোগ।
• রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের দাবি, কারখানার বর্জ্যজল পাশের কৃষিজমির কুয়ো ও জলস্তরে পৌঁছেছে।
• পাঁচ দফা পরিদর্শনের পর টাটাকে কারণ দর্শানোর নোটিস।
• সন্তোষজনক জবাব না পেলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও কারখানা বন্ধের হুঁশিয়ারি।
• টাটার দাবি, তারা সমস্ত পরিবেশগত বিধি মেনেই কাজ করছে।
ভারতে অ্যাপলের উৎপাদন সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান ভরসা টাটা ইলেকট্রনিক্স। চীনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারতের উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে গুরুত্ব দেওয়ার যে কৌশল নিয়েছে অ্যাপল, তার কেন্দ্রে রয়েছে টাটার বিভিন্ন কারখানা। কিন্তু সেই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের মধ্যেই সামনে এল এক গুরুতর পরিবেশগত অভিযোগ।
তামিলনাড়ুর হোসুরে অবস্থিত টাটা ইলেকট্রনিক্সের আইফোন যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী কারখানার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে সেখান থেকে নির্গত বর্জ্যজল আশপাশের কৃষিজমির ভূগর্ভস্থ জল দূষিত করেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ টাটাকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নথি অনুযায়ী, স্থানীয় কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন যে কারখানার বর্জ্যজল তাদের জমি ও খোলা কুয়োর জলে মিশে যাচ্ছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট পাঁচবার পরিদর্শন চালানো হয়। তদন্তকারীরা দেখতে পান, কারখানার ভেতরে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের জন্য তৈরি একটি পুকুরে শিল্পবর্জ্য ফেলা হচ্ছিল। পরে সেই জল উপচে পাশের কৃষিজমির দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং খোলা কুয়োর জল দূষিত করে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও অভিযোগ, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই টাটাকে কিছু সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী পরিদর্শনে দেখা যায়, সেই নির্দেশ যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়নি। ফলে ২৫ মে জারি হওয়া তিন পাতার নোটিসে টাটাকে জবাব দিতে বলা হয়েছে কেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এর মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে টাটা ইলেকট্রনিক্স সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংস্থার বক্তব্য, একটি স্বীকৃত পরীক্ষাগারে স্বাধীনভাবে জল ও পরিবেশগত মান পরীক্ষা করানো হয়েছে এবং সেই পরীক্ষায় তারা সমস্ত নিয়ন্ত্রক বিধি মেনে চলেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে। সংস্থা আরও জানিয়েছে, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নোটিসের জবাবও দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি পরিবেশগত বিতর্ক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদন শিল্পের ভাবমূর্তি। গত কয়েক বছরে অ্যাপলের ভারতীয় সরবরাহ শৃঙ্খলে একাধিক সমস্যা সামনে এসেছে। ২০২৪ সালে হোসুরের একই শিল্পাঞ্চলে টাটার একটি ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যার ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। তার আগে অ্যাপলের অন্যান্য সরবরাহকারী সংস্থাগুলিকেও নানা বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছে।
ভারত সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে দেশকে বৈশ্বিক ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বিশেষত স্মার্টফোন উৎপাদনে ভারতের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। গবেষণা সংস্থাগুলির হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে যেখানে বিশ্বের মাত্র ৬ শতাংশ আইফোন ভারতে তৈরি হতো, ২০২৬ সালে সেই হার বেড়ে ২৬ শতাংশে পৌঁছতে পারে। এই পরিস্থিতিতে টাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, শিল্পায়ন এবং পরিবেশ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজন যেমন রয়েছে, তেমনই কৃষিজমি ও জলসম্পদের সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যে অঞ্চলের মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল, সেখানে ভূগর্ভস্থ জলের দূষণ দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন নজর থাকবে টাটা ইলেকট্রনিক্সের জবাবের দিকে। যদি সংস্থার ব্যাখ্যায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ সন্তুষ্ট না হয়, তাহলে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইফোন যন্ত্রাংশ উৎপাদন কেন্দ্রের সামনে প্রশাসনিক সঙ্কট তৈরি হতে পারে। আর যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু টাটার জন্য নয়, ভারতের দ্রুত বিকাশমান ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্পের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠবে।