পশ্চিমবঙ্গের একাধিক বেসরকারি রক্তব্যাঙ্কে মঙ্গলবার ব্যাপক তল্লাশি চালাল রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর। অভিযোগ, রাজ্যে স্বেচ্ছায় সংগৃহীত রক্ত ও রক্তের বিভিন্ন উপাদান নিয়ম ভেঙে অন্য রাজ্যে পাঠানো হচ্ছে এবং এই প্রক্রিয়ার আড়ালে গড়ে উঠেছে একটি অবৈধ বাণিজ্যচক্র। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই কলকাতা-সহ রাজ্যের ছয়টি বেসরকারি রক্তব্যাঙ্কে একযোগে অভিযান চালানো হয়।
স্বাস্থ্য দফতরের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে অভিযোগ মিলেছে যে কিছু রক্তব্যাঙ্ক রক্তদান শিবির থেকে সংগৃহীত রক্ত ও রক্তের উপাদান নির্ধারিত নিয়ম না মেনে অন্য রাজ্যে সরবরাহ করছে। কোথাও রক্ত পরিবহণের নথিতে অসঙ্গতি, কোথাও আবার রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণের হিসাবের মধ্যে বড় ফারাক ধরা পড়েছে। এই কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র, কম্পিউটার তথ্য, রক্ত মজুতের রেকর্ড এবং সরবরাহ সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষ আধিকারিকের বক্তব্য, রক্ত কোনও বাণিজ্যিক পণ্য নয়। মানুষের স্বেচ্ছায় দান করা রক্ত নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় রোগীদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করার কথা। সেই রক্ত যদি মুনাফার উদ্দেশ্যে রাজ্যের বাইরে পাচার করা হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
অভিযান চলাকালীন সংশ্লিষ্ট রক্তব্যাঙ্কগুলির লাইসেন্সের শর্ত, রক্ত সংগ্রহের অনুমতি, শিবির আয়োজনের নিয়ম এবং রক্ত পরিবহণের বৈধতা পরীক্ষা করা হয়েছে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, কোন হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কত ইউনিট রক্ত পাঠানো হয়েছে এবং সেই সরবরাহ আইনসম্মত ছিল কি না।
স্বাস্থ্য দফতরের সূত্রে জানা গিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছিল যে কিছু বেসরকারি রক্তব্যাঙ্ক রক্তদান শিবির আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নির্দেশিকা মানছে না। অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের আয়োজিত শিবির থেকে সংগৃহীত রক্তের একটি অংশ রাজ্যের রোগীদের পরিবর্তে অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই এই অভিযান।
তদন্তকারীরা রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং সরবরাহের সম্পূর্ণ শৃঙ্খল পরীক্ষা করছেন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, রক্তদান শিবিরের আয়োজক এবং পরিবহণ সংস্থার প্রতিনিধিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট রক্তব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে লাইসেন্স স্থগিত, বাতিল বা ফৌজদারি মামলা রুজু করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ রক্ত পরিষেবা বজায় রাখতে রক্ত সংগ্রহ থেকে রোগীর শরীরে সঞ্চালন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি। এই ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক স্বার্থ বা অনিয়ম ঢুকে পড়লে শুধু আইনি সমস্যাই নয়, রোগীর নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হতে পারে।
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর স্পষ্ট করেছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও প্রতিষ্ঠানকে দোষী বলা হচ্ছে না। তবে যেখানেই অনিয়মের প্রমাণ মিলবে, সেখানে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রাজ্যের সব বেসরকারি রক্তব্যাঙ্ককে রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ সংক্রান্ত জাতীয় ও রাজ্যস্তরের সমস্ত নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।