রিয়াধ–মদিনায় হামলা, সৌদির প্রধান তেল পাইপলাইন বন্ধে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ

যা জানা জরুরি
- রিয়াধ ও মদিনা অঞ্চলে একাধিক হামলার পরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব–পশ্চিম তেল পরিবহণের পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করল সৌদি আরব।
- সৌদি জ্বালানি মন্ত্রক জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর সকালে হামলাগুলি ঘটে।
- শুক্রবার বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে মন্ত্রক জানায়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই তেল পরিবহণ স্থগিত রাখা হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রিয়াধ ও মদিনা অঞ্চলে একাধিক হামলার পরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব–পশ্চিম তেল পরিবহণের পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করল সৌদি আরব। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রক জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর সকালে হামলাগুলি ঘটে। শুক্রবার বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে মন্ত্রক জানায়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই তেল পরিবহণ স্থগিত রাখা হয়েছে। ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন; তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, হামলার পরপরই জরুরি পরিষেবা ও বিশেষজ্ঞ কারিগরি দল ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পাইপলাইন সুরক্ষিত করা এবং সেটি চালানোর উপযুক্ত অবস্থায় রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ, আহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা কিংবা ফের তেল পরিবহণ শুরুর সময়সীমা ওই বিবৃতিতে জানানো হয়নি। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে পরে তথ্য প্রকাশের কথা জানিয়েছে মন্ত্রক।
পরবর্তী বিবৃতিতে সৌদি বিদেশ মন্ত্রক অভিযোগ করেছে, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পাঠানো একাধিক চালকবিহীন বিমান এই হামলা চালিয়েছে। তবে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সৌদি আরব আপাতত পাল্টা আঘাত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাগদাদকে নিজের ভূখণ্ড থেকে প্রতিবেশী দেশে হামলা ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দিতে চায় রিয়াধ। একই সঙ্গে নিজের সার্বভৌমত্ব, নাগরিক এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অধিকার সংরক্ষিত রেখেছে সৌদি সরকার।
ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহারের অভিযোগ আর ইরাক সরকার হামলা চালিয়েছে—এই দুই বক্তব্য এক নয়। সৌদি বিবৃতিতে কোনও নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। ফলে হামলার দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে তদন্তের ফল জরুরি। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এক সামরিক কর্তাকে সরিয়েছেন। সৌদি আরবের নিরাপত্তা বিপন্ন করে এমন আক্রমণের বিরোধিতাও জানিয়েছে বাগদাদ।
এই পাইপলাইন বন্ধের তাৎপর্য সৌদি সীমান্তের অনেক বাইরে। প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যবস্থাটি দেশের পূর্বাঞ্চলের তেল উৎপাদনকেন্দ্রগুলিকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে। এর পূর্ণ পরিবহণক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৭০ লক্ষ ব্যারেল। তবে সর্বোচ্চ ক্ষমতা আর কোনও নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবে পরিবাহিত তেলের পরিমাণ এক নয়। এই পার্থক্য মনে রেখেই সম্ভাব্য সরবরাহঘাটতি বিচার করতে হবে।
বন্ধ হওয়ার আগে এই পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ ব্যারেল তেল যেত, যা বিশ্ব সরবরাহের প্রায় চার থেকে পাঁচ শতাংশের সমান। এই বিপুল পরিমাণই বোঝায়, পাইপলাইনটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তবে হামলার জেরে রফতানিতে ঠিক কতটা প্রভাব পড়েছে, তা তখনও যাচাই করা হচ্ছিল। ক্ষয়ক্ষতির পরিধি সম্পূর্ণ স্পষ্ট না হওয়ায় অনিশ্চয়তাও কাটেনি।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে যুদ্ধজনিত বাধার মধ্যে এই বিকল্প পথের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। পারস্য উপসাগরের বন্দর দিয়ে পাঠানোর পরিবর্তে দৈনিক প্রায় ৫০ লক্ষ ব্যারেল তেল এই পথে ইয়ানবুতে সরিয়ে নিয়েছিল সৌদি আরব। স্থলভাগ পেরিয়ে পশ্চিম উপকূলে তেল পৌঁছনোয় হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমে। সেই ব্যবস্থাই এখন নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
অন্যদিকে, ইয়েমেনে হুতি বাহিনীর উপকূলীয় অগ্রগতি এবং বাব এল মান্দেব প্রণালীর কাছে কৌশলগত দ্বীপগুলিতে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে স্থলপথের পাইপলাইন এবং সমুদ্রপথ—দুই জায়গাতেই চাপ তৈরি হচ্ছে। আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে শুক্রবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ফের ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের দিকে উঠছিল বলে।
ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য সম্ভাব্য উদ্বেগ হল আমদানির খরচ, জাহাজভাড়া ও বিমার ব্যয় বৃদ্ধি। তবে পাইপলাইন বন্ধ মানেই সমপরিমাণ সৌদি রফতানি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। মজুত তেল, বিকল্প পরিবহণ এবং মেরামতের গতি প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করবে। আপাতত সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, কত দ্রুত নিরাপদে এই গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ চালু করা সম্ভব হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



