বিরোধ ছিল ক্লাসে হাজিরা নিয়ে। দাবি ছিল পরীক্ষায় বসতে দেওয়ার। কিন্তু উপাধ্যক্ষার পদত্যাগের পরে তাঁর ঘরে গঙ্গাজল ছিটিয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে ‘শুদ্ধিকরণ’ করতে হল কেন? সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজের ঘটনাকে ঘিরে এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে জরুরি। যে শিক্ষিকা ওই ঘরে বসতেন, তিনি মুসলিম—মহম্মদি তরন্নুম। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে এই ‘শুদ্ধিকরণ’-এর সম্পর্ক নেই তো? পরীক্ষায় বসার আন্দোলনের শেষে এমন ধর্মীয় আচার কেন প্রয়োজন হল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা আন্দোলনকারীদের দেওয়া উচিত।

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, দীর্ঘ ঘেরাওয়ের পরে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে পুলিশের নিরাপত্তায় কলেজ ছাড়েন তরন্নুম। তাঁর অভিযোগ, সই করতে তাঁকে বাধ্য করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে সঙ্গে থাকা শিক্ষকদের সরিয়ে দিয়ে তাঁকে একা আটকে রাখা হয়; খাবার, পানীয় জল পেতে দেওয়া হয়নি, আলোও বন্ধ করা হয়েছিল। কলেজ থেকে বেরিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে তদন্তের আবেদন জানান। পদত্যাগপত্রে অবশ্য পারিবারিক, স্বাস্থ্যগত ও ব্যক্তিগত কারণ লেখা ছিল। সেই চিঠির ভাষার সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য অভিযোগের ফারাকই প্রশ্ন তোলে—কোন পরিস্থিতিতে সই করেছিলেন তিনি?

পড়ুয়াদের অভিযোগও তদন্তযোগ্য। তাঁদের বক্তব্য, নিয়মিত ক্লাস হত না, হাজিরার হিসাব যথাযথভাবে রাখা হয়নি, আবার ক্লাসের সময় এত সকালে এগিয়ে আনা হয়েছিল যে অনেকের পক্ষে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়ে। কলেজের পাঠদান ও উপস্থিতির নথিতে গলদ থাকলে তার দায় কর্তৃপক্ষকে নিতেই হবে। কিন্তু সেই অভিযোগের নিষ্পত্তির সঙ্গে একজন শিক্ষিকার চলে যাওয়ার পরে তাঁর ঘরকে ‘শুদ্ধ’ করার সম্পর্ক কোথায়? হাজিরার খাতা ভুল হলে খাতা পরীক্ষা করতে হয়। গঙ্গাজল দিয়ে সেই হিসাব সংশোধন করা যায় না।

সূত্রের খবর, তরন্নুমকে পুলিশ বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় কলেজে এবিভিপির পতাকা ওড়ানো হয়। পরে তাঁর ঘরে গঙ্গাজল ছিটিয়ে ধূপের আরতি করেন পড়ুয়াদের একাংশ। কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতি তথা বিজেপি বিধায়ক কৌস্তভ বাগচী এই ‘শুদ্ধিকরণ’কে পড়ুয়াদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এবিভিপি-সমর্থক এক ছাত্রের অভিযোগও রয়েছে—কম হাজিরার প্রশ্ন তুলে সংগঠনের সমর্থকদের নিশানা করতেন উপাধ্যক্ষা।

কিন্তু ‘আবেগ’ বললেই প্রশ্নের উত্তর হয় না। কীসের আবেগ? একজন শিক্ষিকার উপস্থিতিতে ঘরটি অপবিত্র হয়ে গিয়েছিল—এই ধারণাই কি ওই আচারের মাধ্যমে প্রকাশ পেল না? মুসলিম শিক্ষিকার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কর্মস্থলে ধর্মীয় শুদ্ধতার আচার পালন করলে যে অপমানজনক সাম্প্রদায়িক বার্তা তৈরি হয়, দায়িত্বশীল পরিচালন সমিতির সভাপতি তা উপেক্ষা করতে পারেন কি? তাঁর কাছে ব্যাখ্যার দাবি আরও বেশি, কারণ কলেজের প্রত্যেক শিক্ষক ও ছাত্রের সমান মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বও তাঁর।

তরন্নুমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। তিনি বলেছেন, অতীতে বাম রাজনীতি করলেও ২০১৬ সালে রাজনৈতিক সদস্যপদ ছেড়ে দিয়েছেন। পূর্বতন তৃণমূল আমলে স্থানীয় নেতার বাধার মুখে পড়ার অভিযোগও করেছেন। এমনকি পরিবর্তনের আশায় বিজেপিকে ভোট দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন। কিন্তু একজন শিক্ষিকার মর্যাদা পাওয়ার জন্য নিজের ভোটের হিসাব দেওয়ার প্রয়োজন হবে কেন? তিনি কোন দলকে সমর্থন করেন, তা দিয়ে তাঁর নিরাপত্তা বা সম্মানের অধিকার নির্ধারিত হতে পারে

আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের একাংশ হেনস্থার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, শুধু ঘেরাও হয়েছিল; কলেজে জল না থাকায় তাঁরাও সমস্যায় পড়েছিলেন। কেউ বলেছেন, উপাধ্যক্ষা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। এই পাল্টা বক্তব্য অবশ্যই যাচাই করতে হবে। শিক্ষক সংগঠনগুলি ঘটনার নিন্দা করে তদন্ত চেয়েছে।

মুসলিম পরিচয়ের কারণেই ‘শুদ্ধিকরণ’ করা হয়েছিল—এমন উদ্দেশ্য এখনও প্রমাণিত নয়। কিন্তু ঘটনাটির সময়, স্থান এবং যাঁর বিদায়ের পরে আচারটি পালন করা হল, তাঁর পরিচয় মিলিয়ে প্রশ্নটি এড়ানোরও উপায় নেই। তদন্তে হাজিরার খাতার পাশাপাশি দেখা দরকার, কারা এই আয়োজন করেছিলেন এবং কী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। একজন মুসলিম শিক্ষিকার চলে যাওয়ার পরে তাঁর ঘর ‘শুদ্ধ’ করতে হবে কেন—এই প্রশ্নের উত্তর গঙ্গাজলে ধুয়ে ফেলা যাবে না।