জার্মানিতে অতি ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফ্যুর ডয়েচলান্ড বা এএফডির অভিবাসী বিতাড়নের কর্মসূচিকে ‘জাতিগত নির্মূলের’ পরিকল্পনা বলে অভিযুক্ত করলেন চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্ৎস। স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে দলটির অভূতপূর্ব সাফল্যের পরে বুধবার দেশের সংসদের নিম্নকক্ষ বুন্ডেসটাগে সরাসরি সংঘাতে নামেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, মানুষকে জন্মপরিচয় ও গায়ের রঙের ভিত্তিতে দেশছাড়া করার রাজনীতি জার্মান সমাজকে বিভক্ত করছে। একই সঙ্গে বিপন্ন করছে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি—অভিবাসীদের শ্রম।

রবিবারের নির্বাচনে এএফডি প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। নাৎসি যুগের পরে জার্মানির কোনও রাজ্য নির্বাচনে অতি ডানপন্থী দলের এমন সাফল্য নজিরবিহীন। যদিও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে তিনটি আসন কম পেয়েছে তারা। দলের মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী উলরিখ সিগমুন্ড এখন অন্য দলের প্রতিনিধিদের সমর্থন সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যাতে রাজ্য সরকারের নেতৃত্ব তাঁর হাতে আসে।

এই ফলের পরে সংসদে প্রথম বড় মুখোমুখি বিতর্কেই অভিবাসন প্রশ্নে এএফডিকে তীব্র আক্রমণ করেন ম্যার্ৎস। দলটির বহুল প্রচারিত ‘রিমাইগ্রেশন’, অর্থাৎ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর ধারণাকে তিনি জন্মপরিচয় ও বর্ণের ভিত্তিতে মানুষ সরিয়ে দেওয়ার কর্মসূচি বলে বর্ণনা করেন। তাঁর বক্তব্যে অন্য দলের সাংসদেরা হাততালি দেন। অন্যদিকে এএফডির আসন থেকে বারবার চিৎকার ও কটাক্ষ ভেসে আসে। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে অধিবেশন।

ম্যার্ৎসের যুক্তি, জার্মানিতে কর্মরত লক্ষ লক্ষ অভিবাসী দেশের দৈনন্দিন জীবন ও উৎপাদনব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। তাঁদের চলে যেতে বাধ্য করলে দক্ষ শ্রমনির্ভর বহু পেশা অচল হয়ে পড়বে। বৃদ্ধদের পরিচর্যাকেন্দ্র, হাসপাতাল এবং রেস্তরাঁ চালানোও অসম্ভব হয়ে উঠবে বলে সতর্ক করেন তিনি। এই উদাহরণগুলির মাধ্যমে চ্যান্সেলর বোঝাতে চান, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নির্বিচার অভিযান কেবল মানবিক সংকট তৈরি করবে না; তার মূল্য দিতে হবে জার্মান নাগরিকদেরও, পরিষেবা ও জীবিকার ক্ষেত্রে।

তবে এই আক্রমণের অর্থ যে তাঁর সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান ছাড়ছে, তা নয়। ম্যার্ৎস স্বীকার করেন, অভিবাসন ক্ষেত্রে জার্মানির এখনও সমস্যা রয়েছে। যাঁদের দেশে স্থায়ীভাবে থাকার অধিকার নেই, তাঁদের আরও বেশি সংখ্যায় ফেরত পাঠানোর বিষয়ে শাসক জোট একমত। কিন্তু যাঁরা কাজ করছেন, দেশের সমৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন এবং এখানে স্বাগত, তাঁদের সঙ্গে দেশ ছাড়তে বাধ্য ব্যক্তিদের পার্থক্য করতে হবে। তাঁর অভিযোগ, এএফডি সেই পার্থক্য মুছে দিচ্ছে।

এএফডি দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মিত অভিবাসীদের ব্যাপক হারে বহিষ্কারের দাবি তুলছে। যদিও এমন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গেলে জার্মান আইনের অধীনে কঠিন বাধার মুখে পড়তে হবে। ম্যার্ৎসের দাবি, দলটির বক্তব্যই সমাজের গভীর বিভাজনের অন্যতম কারণ। নির্বাচনী প্রচারে অভিবাসনকে সামনে রেখে যে সমর্থন তারা পেয়েছে, সংসদীয় বিতর্কে সেই রাজনীতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিণতিকেই সামনে আনেন চ্যান্সেলর।

বিতর্কে যুক্ত হয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যও। নিজের সামাজিক মাধ্যমে এএফডির সাফল্যকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি দাবি করেন, জার্মানির ক্ষতিকর অভিবাসন বিধিনিয়মে মানুষ শেষ পর্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। এর পরে বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে নির্ধারিত ফোনালাপ বাতিল করেন ম্যার্ৎস। চ্যান্সেলরের মুখপাত্র নির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করেননি। তবে জানিয়েছেন, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষত নির্বাচন নিয়ে হস্তক্ষেপ বা মন্তব্যের বিরোধিতা বরাবরই করে এসেছেন ম্যার্ৎস।

নিজের রাজনৈতিক দুর্বলতাও এই সংঘাতের পটভূমিতে রয়েছে। মধ্য-বাম সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় আসার ষোলো মাসের মধ্যে রক্ষণশীল খ্রিস্টীয় গণতন্ত্রী নেতা ম্যার্ৎসের জনপ্রিয়তা অনেকটাই কমেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ তার বড় কারণ। এএফডির দিকে চলে যাওয়া ভোটারদের ফেরাতে সীমান্তনীতিতে তিনি কঠোর হয়েছেন। কিন্তু স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল সেই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। রাজ্যে নিজের দলের সমর্থন প্রায় অর্ধেক হয়ে যাওয়ার পিছনে ব্যক্তিগত অজনপ্রিয়তার ভূমিকা স্বীকার করেছেন তিনি।

তবু এএফডির জয়কে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সম্মতি হিসেবে মানতে নারাজ চ্যান্সেলর। সংসদে তিনি মনে করিয়ে দেন, স্যাক্সনি-আনহাল্টের ৫৬ শতাংশ ভোটার ওই দলকে ভোট দেননি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গড়ার চেষ্টা করবেন না বলে সিগমুন্ড যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা ভাঙার অভিযোগও তোলেন তিনি। ম্যার্ৎস একে ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা বলে আক্রমণ করেন। দেশের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা দলটিকে দক্ষিণপন্থী উগ্রবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

অভিবাসনের পাশাপাশি ইউক্রেন ও রাশিয়া প্রসঙ্গেও এএফডিকে নিশানা করেন ম্যার্ৎস। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করে দলটি রাশিয়ার সঙ্গে একই অবস্থানে দাঁড়াচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ। গত মাসে লাইপৎসিগ বিমানবন্দরে ব্যর্থ ড্রোন বোমা হামলার পরিকল্পনা রাশিয়ায় হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। জার্মানির বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাত ও বিভ্রান্তিকর প্রচারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই ঘটনা নিয়ে এএফডির নীরবতাকেও প্রশ্ন করেন চ্যান্সেলর।

অন্যদিকে এএফডির সহনেত্রী আলিস ভাইডেল নির্বাচনী ফলকে ম্যার্ৎসের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গণরায় হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, খ্রিস্টীয় গণতন্ত্রী দল কার্যত চূর্ণ হয়েছে এবং মানুষ নীতির পরিবর্তন চাইছেন। অভিবাসননীতির সঙ্গে অপরাধ ও নিরাপত্তার সমস্যাকে জুড়ে সরকারকে আক্রমণ করেন তিনি। অদূর ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় সরকার গড়ার লক্ষ্যও পুনর্ব্যক্ত করেন।

পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ২০২৯ সালে। কিন্তু জনমত সমীক্ষায় এএফডির সমর্থন এখন ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ, যা তাদের প্রথম স্থানে রেখেছে। বর্তমান শাসক জোট এখন নির্বাচন হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না বলেও সমীক্ষার ইঙ্গিত। চলতি মাসেই বার্লিন ও মেকলেনবুর্গ-ভরপোমার্নে আরও দু’টি রাজ্য নির্বাচন। ফলে স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল কোনও বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক ধাক্কা হয়ে থাকছে না; অভিবাসন, অর্থনীতি এবং মূলধারার দলগুলির প্রতি আস্থার প্রশ্নে জার্মান রাজনীতির বৃহত্তর টানাপড়েনকে আরও তীব্র করছে।

ম্যার্ৎসের সামনে তাই দ্বিমুখী চাপ: একদিকে অভিবাসন নিয়ে অসন্তুষ্ট ভোটারদের আস্থা ফেরানো, অন্যদিকে অভিবাসীদের অবদান স্বীকার করে এএফডির বিতাড়নের কর্মসূচির বিরুদ্ধে সীমারেখা টানা। আপাতত সংঘাত ঘনীভূত হচ্ছে সেখানেই।