দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ সিওপিডির চিকিৎসায় নতুন আশার সঞ্চার করল অ্যাস্ট্রাজেনেকার পরীক্ষাধীন ওষুধ টোজোরাকিম্যাব। শেষ পর্যায়ের দু’টি পরীক্ষায় রোগীদের হঠাৎ অবস্থার অবনতি হওয়ার ঘটনা কমিয়েছে এই ওষুধ। নিয়মিত চিকিৎসার পরেও যাঁদের শ্বাসকষ্ট ও কাশির তীব্রতা বারবার বেড়ে যায়, তাঁদের জন্য এটি ভবিষ্যতে অতিরিক্ত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফলাফলে এই সম্ভাবনা উঠে এসেছে।

তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা দু’টির নাম ওবেরন ও টাইটানিয়া। প্রচলিত শ্বাসের মাধ্যমে নেওয়া ওষুধ চালু রেখেই রোগীদের একাংশকে প্রতি চার সপ্তাহে ৩০০ মিলিগ্রাম টোজোরাকিম্যাব দেওয়া হয়। অন্যেরা পান একই রকম দেখতে নিষ্ক্রিয় ওষুধ। বর্তমান ও প্রাক্তন ধূমপায়ীদের মিলিত হিসাবে মাঝারি থেকে গুরুতর অবনতির বার্ষিক হার যথাক্রমে ৩০ এবং ২৯ শতাংশ কমেছে। শুধু প্রাক্তন ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে হ্রাসের পরিমাণ যথাক্রমে ২৯ ও ৩৪ শতাংশ। বার্সেলোনায় ইউরোপীয় শ্বাসরোগ বিশেষজ্ঞদের সম্মেলনে ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনেও।

ওষুধটির কার্যপদ্ধতিও আগ্রহের কারণ। এটি বিশেষ ধরনের পরীক্ষাগারে তৈরি অ্যান্টিবডি, যা ইন্টারলিউকিন-৩৩ নামে একটি প্রোটিনের সংকেতপ্রবাহে বাধা দেয়। এই প্রোটিনের দু’টি রূপকে লক্ষ্য করে ফুসফুসের প্রদাহ এবং শ্লেষ্মা জমার সমস্যার উপর প্রভাব ফেলাই চিকিৎসাটির উদ্দেশ্য। শ্বাসনালির প্রদাহ ও শ্লেষ্মার অস্বাভাবিকতা সিওপিডির অবনতিতে ভূমিকা নেয়। একই ওষুধ নিয়ে হাঁপানি ও গুরুতর ভাইরাসজনিত নিম্ন শ্বাসনালির রোগেও গবেষণা চলছে।

সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রক্তে ইওসিনোফিল নামে শ্বেতরক্তকণিকার বিভিন্ন মাত্রার রোগীদের মধ্যেও উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। যাঁদের রক্তে প্রতি মাইক্রোলিটারে এই কোষের সংখ্যা ১৫০-এর কম, তাঁদের ক্ষেত্রে অবনতির হার ২৩ শতাংশ কমেছে। সংখ্যা ৩০০ বা বেশি হলে হ্রাস ৪৩ শতাংশ। তবে এই পরিসংখ্যান অবনতির হার বোঝাচ্ছে; মৃত্যুহার একই অনুপাতে কমেছে বা প্রত্যেকে সমান উপকার পেয়েছেন, তা মোটেই বোঝাচ্ছে না। সাধারণভাবে ওষুধটি সহনীয় ছিল; ওষুধজনিত বিরূপ প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইঞ্জেকশন দেওয়ার স্থানে প্রতিক্রিয়ার কথা জানানো হয়েছে। আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনুমোদনের আবেদন অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করেছে। তবে আবেদন গৃহীত হওয়া চূড়ান্ত অনুমোদন নয়।

সিওপিডিতে ফুসফুসে বায়ু চলাচল বাধা পায়। দীর্ঘদিনের কাশি, কফ, হাঁপ ধরা এবং ক্লান্তি রোগটির পরিচিত লক্ষণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এই রোগে। বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর কারণগুলির মধ্যে এর স্থান তৃতীয়। সত্তর বছরের কম বয়সিদের সিওপিডিজনিত মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে। ফলে নতুন চিকিৎসার প্রয়োজনের পাশাপাশি চিকিৎসা পাওয়ার বৈষম্যও বড় প্রশ্ন।

ধূমপান এই রোগের প্রধান কারণগুলির একটি। তবে রান্নার জ্বালানির ধোঁয়া, বাইরের বায়ুদূষণ এবং কর্মক্ষেত্রের ধুলো বা রাসায়নিকের সংস্পর্শও ঝুঁকি বাড়ায়। রোগ বাড়লে দৈনন্দিন কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। হঠাৎ উপসর্গ বেড়ে গেলে অতিরিক্ত ওষুধের প্রয়োজন হয়। রোগীর কর্মক্ষমতা কমা এবং চিকিৎসার খরচ মিলিয়ে পরিবারের উপর আর্থিক চাপও বাড়তে পারে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার কাছেও ফলাফলটি তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ওষুধের পরীক্ষায় ব্যর্থতার পরে এই সাফল্য সংস্থাকে স্বস্তি দিয়েছে। সংস্থা ও বিশ্লেষকদের ধারণা, অনুমোদন পেলে টোজোরাকিম্যাব থেকে বছরে কয়েকশো কোটি ডলারের বিক্রি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাব্য বাজারমূল্য এখনই নিশ্চিত আয় নয়; অনুমোদন এবং বিভিন্ন রোগে কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠার উপর তা নির্ভর করছে।

রোগীদের ক্ষেত্রে আপাতত সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল ফলাফলের অর্থ সঠিকভাবে বোঝা। অবনতির ঘটনা কমা মানেই সিওপিডি সম্পূর্ণ সেরে যাওয়া নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, রোগটি নিরাময়যোগ্য না হলেও চিকিৎসায় উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ধূমপান ত্যাগ, দূষণ এড়ানো, প্রয়োজনীয় টিকা এবং যথাযথ চিকিৎসা এখনও রোগ সামলানোর ভিত্তি। নতুন ওষুধের সম্ভাবনা সেই চিকিৎসাকে আরও কার্যকর করার আশাতেই।