নোটিস প্রত্যাহার হয়েছে। তবু প্রশ্ন মেটেনি অক্ষত ত্রিপাঠীর। গৌতম বুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের এই আইনপড়ুয়া জানতে চান, অপরাধের কোনও পূর্ব ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে কেন নোটিস পাঠানো হয়েছিল। কুড়ি বছরের ছাত্রটির বক্তব্যের কেন্দ্রে এখন প্রশাসনের জবাবদিহি। শুধু সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট নয়, প্রথমে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভিত্তিটিও জানতে চান তিনি।

গত ৪ সেপ্টেম্বর গ্রেটার নয়ডার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অক্ষতকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠান। তাতে জানতে চাওয়া হয়, ছয় মাস শান্তি বজায় রাখার জন্য কেন তাঁকে পাঁচ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত মুচলেকা এবং সমপরিমাণ অর্থের দু’জন স্থানীয় সচ্ছল জামিনদার দিতে বলা হবে না। পরদিন শুনানির দিন ধার্য হয়েছিল। অক্ষত এলাহাবাদের ঝুঁসির বাসিন্দা; বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সূত্রে থাকতেন ইকোটেক–১ এলাকায়।

পুলিশের প্রতিবেদনে অভিযোগ ছিল, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য পড়ুয়াদের মধ্যে সরকারবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়িয়ে তাঁদের উসকানি দিচ্ছিলেন। এর ফলে জনশান্তি বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার অধীনে এই প্রতিরোধমূলক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরে পুলিশ জানায়, অভিযোগ খতিয়ে দেখে নোটিস জারির পরদিনই নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অক্ষত অবশ্য অভিযোগের ভিত্তিই অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিন মাস তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি। ২৫ মে থেকে দু’মাসের ছুটি ছিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য দূরপাঠে ক্লাস চলছিল। জুলাইয়ে তিনি এলাহাবাদ হাই কোর্টে কাজ করছিলেন। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অন্যদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগ কীভাবে উঠল, প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

ঘটনাটির তাৎপর্য বেড়েছে সুপ্রিম কোর্টের ১ সেপ্টেম্বরের নির্দেশের কারণে। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে জুলাইয়ের আন্দোলনে যোগ দেওয়া পড়ুয়াদের নামে দায়ের হওয়া এফআইআরগুলি খারিজ করেছিল শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ওই নির্দেশ দেয়।

আদালত জানায়, ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের একই প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে অন্য কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে মামলা থাকলেও তা আর এগোনো যাবে না। ওই ঘটনাগুলির জন্য নতুন এফআইআর দায়ের করতেও নিষেধ করা হয়। তবে অপরাধের পূর্ব ইতিহাস রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের বিষয়ে পৃথক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। নির্দেশটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দেওয়া এবং সাধারণ নজির হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয় বলেও আদালত স্পষ্ট করে।

তারপরও একজন ছাত্রকে নোটিস দেওয়ার বিষয়টি বুধবার শীর্ষ আদালতের নজরে আসে। প্রধান বিচারপতি গ্রেটার নয়ডার ম্যাজিস্ট্রেটের পদক্ষেপ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আদালতের আগের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এমন নোটিস দেওয়া হল, সেই প্রশ্ন ওঠে। অক্ষত এসএফআইয়ের উত্তরপ্রদেশ রাজ্য কমিটির সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচ লক্ষ টাকার মুচলেকার প্রক্রিয়াটি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

আইনজীবী বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য আদালতে অভিযোগ করেন, পড়ুয়াদের উপর এই ধরনের পদক্ষেপ কার্যত একটি পরীক্ষা। তাঁর বক্তব্য, নোটিস প্রত্যাহার করা হলেও আদালতের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগের বিষয়টি তাতে থেকে মিটে যায় না।

এই ঘটনাপ্রবাহে দুটি বিষয় আলাদা করে সামনে এসেছে। একটি, প্রশাসনের আশঙ্কার পক্ষে কী তথ্য ছিল। অন্যটি, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার সময় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সেই নির্দেশ কতটা বিবেচনায় নিয়েছিল। নোটিস ফিরিয়ে নেওয়া প্রথম সিদ্ধান্তের কারণ নিজে থেকে ব্যাখ্যা করে না। অভিযোগ যাচাইয়ের আগে একজন পড়ুয়াকে এত বড় অঙ্কের মুচলেকার মুখে দাঁড় করানোর প্রয়োজন কেন হয়েছিল, সেই প্রশ্ন তাই বহাল।

অক্ষতের বক্তব্য সেই অমীমাংসিত জায়গাটিই চিহ্নিত করছে। তাঁর দাবি, তাঁর অপরাধের পূর্ব ইতিহাস নেই। ফলে নোটিস প্রত্যাহারের খবরের চেয়েও তাঁর কাছে জরুরি, কেন তাঁর নাম এই প্রক্রিয়ায় এল তার ব্যাখ্যা। আপাতত পুলিশ নির্দেশ প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছে, আর আদালতও পদক্ষেপটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ছাত্রটির চাওয়া এখন কারণটি জানা।