ভারতের যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে আগস্ট মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এসেছে। প্রথমবার সম্মিলিত বিক্রির হিসাবে পেট্রোলচালিত গাড়িকে পিছনে ফেলেছে বিকল্প জ্বালানিতে চলা গাড়ি। ফেডারেশন অব অটোমোবাইল ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনস বা ফাডার তথ্য অনুযায়ী, অগস্টে যাত্রীবাহী গাড়ির মোট খুচরো বিক্রির ৪১.৯৫ শতাংশ ছিল সিএনজি, হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি। সেখানে পেট্রোলচালিত গাড়ির অংশ ছিল ৪০.৮৫ শতাংশ।

ফাডার সভাপতি সাই গিরিধর এই পরিবর্তনকে বাজারের কাঠামোগত বদল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে সিএনজি, হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি মিলিয়ে বিকল্প জ্বালানির গাড়ি পেট্রোলচালিত গাড়িকে ছাপিয়ে গেল।’’

এই পরিবর্তন এমন সময়ে ঘটছে, যখন ই২০ পেট্রোল নিয়ে ক্রেতাদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ই২০ হল সাধারণ পেট্রলের সঙ্গে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো জ্বালানি। তবে ভারতীয় গাড়িচালকেরা যে শুধু ই২০-র কারণেই পেট্রোল থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন, তা নয়।

গিরিধর জানিয়েছেন, ই২০ নিয়ে উদ্বেগ প্রথম দিকে পেট্রোল থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতাকে কিছুটা ত্বরান্বিত করে থাকতে পারে। কিন্তু সেই প্রবণতা বজায় থাকার পিছনে আরও বড় কারণ রয়েছে—বিকল্প জ্বালানির গাড়ির আরও বেশি মডেল বাজারে আসা, বৈদ্যুতিক গাড়ির একবার চার্জে চলার দূরত্ব বৃদ্ধি এবং চার্জ দেওয়ার পরিকাঠামোর ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ।

ঠিক কী বদলাচ্ছে? আর সেই বদলের কতটা ই২০-র কারণে?

ই২০ নিয়ে সমস্যা কোথায়

ই২০ ব্যবহারে ভারতের জোর দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমানো। ভূগর্ভ থেকে তোলা এই অপরিশোধিত তেল শোধন করেই তৈরি হয় দৈনন্দিন ব্যবহারের পেট্রোল ও ডিজেল। দেশে উৎপাদিত ইথানল জ্বালানির সঙ্গে মিশিয়ে ভারত জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা বাড়াতে চায়।

কিন্তু ইথানলের অনুপাত বাড়ায় গাড়িচালকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষত যাঁরা পুরনো গাড়ি চালান, তাঁদের দুশ্চিন্তা বেশি। রয়টার্স জানিয়েছে, সমালোচকদের অন্যতম আশঙ্কা হল, একই পরিমাণ জ্বালানিতে গাড়ি আগের তুলনায় কম দূরত্ব চলবে। অন্যদিকে, সরকার এই জ্বালানি সম্পর্কে কিছু দাবিকে অতিরঞ্জিত বলে খারিজ করেছে।

তবে ই২০ ব্যবহারে প্রতি লিটারে গাড়ির চলার দূরত্ব কমতে পারে—এর একটি বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। পেট্রোলের তুলনায় ইথানলে শক্তির পরিমাণ কম।

অটোমোটিভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া বা এআরএআইয়ের অধিকর্তা রেজি মাথাই জানিয়েছেন, গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, ই১০-এর তুলনায় ই২০ ব্যবহারে জ্বালানি খরচ ২ থেকে ৬ শতাংশ বাড়ে। গাড়িভেদে এই বৃদ্ধির পরিমাণ আলাদা।

তাঁর ব্যাখ্যা, ‘‘জ্বালানি হিসেবে ইথানলের তাপমূল্য কিছুটা কম। ফলে মিশ্রণটির তাপমূল্যও কিছুটা কম হয়।’’

সহজ করে বললে, সমপরিমাণ ই১০-এর তুলনায় ই২০-তে রাসায়নিক শক্তি সামান্য কম থাকে। তাই একই দূরত্ব যেতে গাড়িকে কিছুটা বেশি জ্বালানি পোড়াতে হয়।

গাড়িচালকের কাছে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পকেটে। বাড়তি জ্বালানি কিনতে পাম্পে যেতে হয় আরও ঘন ঘন। ফলে প্রতি কিলোমিটার গাড়ি চালানোর জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়।

কিন্তু এই কথা বলা আর ই২০ ব্যবহারে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় বলা এক বিষয় নয়।

এআরএআইয়ের পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট গাড়িগুলির চালানোর স্বাভাবিকতা, ইঞ্জিন চালু হওয়া কিংবা গতি বাড়ানোর ক্ষমতায় বিরূপ প্রভাব পাওয়া যায়নি। পরীক্ষায় গাড়ির স্থায়িত্ব এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন যন্ত্রাংশও খতিয়ে দেখা হয়েছিল।

এআরএআইয়ের ফলাফল নিয়ে পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কম ইথানলযুক্ত জ্বালানির জন্য তৈরি পুরনো গাড়ির কিছু রবারের যন্ত্রাংশ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে ধাতব যন্ত্রাংশে বিরূপ প্রভাব পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, ই২০ ইঞ্জিন নষ্ট না করলেও তার কম শক্তিঘনত্বের কারণে প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানির খরচ কিছুটা বাড়তে পারে। এই অস্বস্তি থেকেই সামনে আসছে প্রশ্ন—বিকল্প কী?

বিকল্প জ্বালানি বলতে কী বোঝায়

‘বিকল্প জ্বালানি’ একটি বিস্তৃত ধারণা। এটি কোনও একটি প্রযুক্তির নাম নয়।

সায়েন্সডাইরেক্টের ‘ডিকশনারি অব এনার্জি’ অনুযায়ী, গাড়ি চালানোর জন্য ব্যবহৃত পেট্রোলিয়ামজাত নয় এমন শক্তির উৎসকে বিকল্প জ্বালানি বলা হয়। ব্যাপক অর্থে, প্রচলিত তেলের উপর নির্ভরতা কমায় এমন বিভিন্ন উৎস এর অন্তর্ভুক্ত—প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে হাইড্রোজেন, বায়োডিজেল এবং কিছু অ্যালকোহলজাত জ্বালানি।

ভারতের যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে বর্তমান পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি তিন ধরনের গাড়ি। তাদের কাজ করার পদ্ধতিও যথেষ্ট আলাদা।

সিএনজি হল সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস। এটি এখনও জীবাশ্মজাত জ্বালানি, তবে পেট্রোল বা ডিজেলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় স্ফুলিঙ্গের সাহায্যে জ্বালানি প্রজ্বলিত হয় এমন ইঞ্জিনের অন্যতম প্রধান বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সিএনজিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্রেতাদের কাছে এর আকর্ষণের প্রধান কারণ গাড়ি চালানোর খরচ এবং প্রচলিত তরল জ্বালানির তুলনায় নির্গমনের ধরন।

হাইব্রিড গাড়িতে অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের সঙ্গে বৈদ্যুতিক মোটর ও ব্যাটারি থাকে। ফলে এই গাড়িও তরল জ্বালানি ব্যবহার করে। তবে প্রযুক্তি এবং গাড়ি চালানোর পরিস্থিতি অনুযায়ী বিদ্যুতের সহায়তায় জ্বালানি খরচ কমাতে পারে।

কিন্তু সব বিকল্প একই ভাবে কাজ করে না। আর ‘বিকল্প’ বলেই কোনও গাড়িকে আপনা থেকে ‘নির্গমনহীন’ ধরে নেওয়া যায় না।

সিএনজি এখনও জীবাশ্ম জ্বালানি। কিছু ধরনের নির্গমনের ক্ষেত্রে পেট্রল ও ডিজেলের তুলনায় এর সুবিধা থাকতে পারে, কিন্তু উষ্ণায়নকারী গ্যাসের নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ হয় না।

হাইব্রিড গাড়িও পেট্রোলকে বিদায় জানায়নি। বরং সাধারণ পেট্রল ইঞ্জিনের সঙ্গে বৈদ্যুতিক মোটর যুক্ত করে প্রতি লিটার জ্বালানিতে আরও বেশি দূরত্ব চলার ব্যবস্থা করেছে।

ইথানলের মতো জৈব জ্বালানিকেও সরল ভাবে ‘পরিবেশবান্ধব’ বলে দেওয়া যায় না। সায়েন্সডাইরেক্টের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিকল্প জ্বালানির পরিবেশগত ও শক্তিসংক্রান্ত সুবিধা নির্ভর করে সেটি কী ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, কী কাঁচামাল ব্যবহার করা হচ্ছে এবং উৎপাদনে কতটা শক্তি খরচ হচ্ছে তার উপর।

এমনকি বৈদ্যুতিক গাড়িরও বৃহত্তর পরিবেশগত প্রভাব রয়েছে। ইবস্কোতে প্রকাশিত বিকল্প জ্বালানি বিষয়ক ২০২৩ সালের একটি গবেষণামূলক বিশ্লেষণে ডক্টর রবিন এল উলফসন জানিয়েছেন, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি চার্জ করতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ নিজেই জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসতে পারে।

তাঁর বক্তব্য, কোনও বিকল্প জ্বালানির প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাব বুঝতে হলে উৎপাদন থেকে ব্যবহার পর্যন্ত তার সম্পূর্ণ জীবনচক্র বিচার করতে হবে। শুধু গাড়ির নিষ্কাশননল থেকে কী বেরোচ্ছে, তা দেখলে চলবে না।

তাই কোন গাড়ি পরিবেশের পক্ষে তুলনামূলক ভাল, সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু জ্বালানির ট্যাঙ্ক বা নিষ্কাশননলের দিকে তাকিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। শক্তির উৎপাদন থেকে ব্যবহার পর্যন্ত গোটা ব্যবস্থাকে তুলনার মধ্যে আনতে হবে।

বৈদ্যুতিক গাড়ি মৌলিক ভাবে আলাদা কেন

বৈদ্যুতিক গাড়ির সঙ্গে অধিকাংশ বিকল্প জ্বালানিচালিত গাড়ির সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত পার্থক্য হল, গতি তৈরির আগে বৈদ্যুতিক গাড়িকে রাসায়নিক জ্বালানি পুড়িয়ে তাপ উৎপন্ন করতে হয় না।

সাধারণ ইঞ্জিনে জ্বালানি পুড়িয়ে তাপ তৈরি করা হয়। তার পরে সেই তাপকে গাড়ির চাকা ঘোরানোর শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। ‘প্রসিডিংস অব দ্য কমবাসশন ইনস্টিটিউট’-এ প্রকাশিত ২০১৭ সালের একটি গবেষণায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এই ব্যবস্থায় মূলত রাসায়নিক জ্বালানি প্রথমে তাপে এবং সেই তাপ পরে গতিতে রূপান্তরিত হয়।

বৈদ্যুতিক গাড়ির পথ আলাদা। ব্যাটারিতে সঞ্চিত বিদ্যুৎ সরাসরি বৈদ্যুতিক মোটরে সরবরাহ করা হয়। মোটর সেই বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক গতিতে রূপান্তরিত করে।

ডক্টর উলফসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রচলিত ইঞ্জিনের তুলনায় বৈদ্যুতিক মোটর অনেক বেশি দক্ষ। কারণ, তাপ হিসেবে শক্তির অপচয় সেখানে অনেক কম হয়।

সিএনজি বা ইথানল পেট্রোলের বিকল্প জ্বালানি হতে পারে। কিন্তু সেগুলি দিয়েও দহন ইঞ্জিনই চালানো হয়। ফলে এই ধরনের ইঞ্জিনের তাপক্ষয় এবং শক্তি ব্যবহারের দক্ষতার সীমাবদ্ধতা তাদের ক্ষেত্রেও থেকে যায়।

এই কারণেই বৈদ্যুতিক গাড়ি কেবল পেট্রোলের জায়গায় অন্য কোনও জ্বালানি বসানোর বিষয় নয়। এটি গাড়ি চালানোর একটি ভিন্ন ব্যবস্থা।

তবে এর সীমাবদ্ধতাগুলিও আলাদা। ব্যাটারির খরচ, গাড়ির দাম, একবার চার্জে কত দূর যাওয়া যায় এবং চার্জ দেওয়ার পরিকাঠামো—সবই বিবেচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি, পরিবেশগত সুবিধা কতটা হবে, তা আংশিক ভাবে নির্ভর করে গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কী ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে তার উপর।