ত্রিভাষা নীতিতে ইংরেজিকে ‘দেশীয়’ ভাষা হিসেবে গণ্য করার প্রশ্নে আপত্তি জানাল কেন্দ্র। তবে চলতি শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়াদের এককালীন ছাড় দেওয়ার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে সরকার। বুধবার সুপ্রিম কোর্টে এই দুই প্রসঙ্গ উঠে আসে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে কেন্দ্রের বক্তব্য জানান সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। মামলার পরবর্তী শুনানি ১৭ সেপ্টেম্বর।

মামলাকারীদের আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন ইংরেজিকে বিদেশি ভাষার শ্রেণিতে রাখার বিষয়টি নিষ্পত্তির অনুরোধ জানান। মেহতা বলেন, এ বিষয়ে সরকারের আপত্তি রয়েছে এবং কেন্দ্র নিজের যুক্তি পেশ করতে চায়। অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্যা ভাটী ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে উপস্থিত থাকতে না পারায় শুনানি পিছোনোর আবেদন করেন তিনি। একই সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাড় নিয়ে আলোচনা দ্রুত এগোনোর আশ্বাস দেন।

অন্যদিকে, মামলাকারীদের আর এক আইনজীবী আনন্দ গ্রোভার বলেন, অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে; তাই আর সময় দেওয়া উচিত নয়। যদিও বুধবার কোনও চূড়ান্ত ছাড় ঘোষণা হয়নি। সরকারের আশ্বাসের অর্থ, বিষয়টি দ্রুত বিবেচিত হবে। ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়ারা ইতিমধ্যেই পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পেয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত এই শুনানি থেকে টানা যাবে না।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে সিবিএসই-র ভাষাশিক্ষার নতুন ব্যবস্থা। ২৯ জুনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়াদের তিনটি ভাষার মধ্যে অন্তত দু’টি ভারতীয় ভাষা নিতে হবে। এই পড়ুয়ারা দশম শ্রেণিতে উঠলে তৃতীয় ভাষার বোর্ড পরীক্ষাও দেবে। ফলে বর্তমান ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ২০৩১ সালের পরীক্ষায় নতুন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ প্রয়োগ হওয়ার কথা। তাদের পরবর্তী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

কিন্তু বর্তমান সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবর্তনকালীন ছাড় রয়েছে। তাদের তৃতীয় ভাষা পড়তে হবে এবং বিদ্যালয়েই মূল্যায়ন হবে; দশম শ্রেণিতে উঠে ওই ভাষার বোর্ড পরীক্ষা দিতে হবে না। এই পার্থক্যটি জরুরি: তাদের ছাড় ভাষাশিক্ষা থেকে নয়, বোর্ড পরীক্ষা থেকে। চলতি দশম শ্রেণির পড়ুয়ারা অবশ্য পুরনো দুই ভাষার ব্যবস্থাতেই থাকবে। ষষ্ঠ শ্রেণির জন্যও পরীক্ষাসংক্রান্ত ছাড় বিবেচনা করতে বলেছে আদালত।

ইংরেজির অবস্থান নিয়ে প্রশ্নটির বাস্তব গুরুত্ব রয়েছে। সিবিএসই-র নির্দেশিকায় বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলুগু-সহ ভারতীয় ভাষার পাশাপাশি আলাদা শ্রেণিতে রাখা হয়েছে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান প্রভৃতি ভাষাকে। অর্থাৎ ইংরেজি পড়লে সেটি আবশ্যিক দু’টি ভারতীয় ভাষার একটি হিসেবে ধরা হবে না। ধরা যাক, কোনও শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজি পড়ছে। নতুন ব্যবস্থায় তাকে আরও একটি ভারতীয় ভাষা নিতে হবে। ইংরেজির শ্রেণিবিন্যাস তাই বিষয় বাছাইকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

গত ২০ আগস্টের শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এই শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ভারতের সমাজে ইংরেজির ঐতিহাসিক শিকড় এবং বিভিন্ন রাজ্যে তার সরকারি ব্যবহার বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন তিনি। ভাষাটিকে অভারতীয় হিসেবে দেখার সাংবিধানিক ভিত্তিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল। ‘নেটিভ’ শব্দের ঔপনিবেশিক অনুষঙ্গ নিয়েও আপত্তি জানান তিনি। তবে এগুলি শুনানির পর্যবেক্ষণ; ইংরেজিকে দেশীয় ভাষা ঘোষণা করে আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়নি।

আদালতের উদ্বেগ শুধু ভাষার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন ভাষা শেখানোর জন্য যথেষ্ট প্রশিক্ষিত শিক্ষক, পাঠ্যবই ও শিক্ষা উপকরণ কতগুলি বিদ্যালয়ে রয়েছে, তা জানাতে বলা হয়েছিল। বিচারপতি বাগচীর বক্তব্য ছিল, কাগজে একাধিক ভাষা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলেই বাস্তবে সেই সুযোগ নিশ্চিত হয় না। শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয়কে প্রস্তুতির সময় দিতে হবে। ইতিমধ্যে ভাষা বেছে নেওয়া ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়াদের ছাড় দিয়ে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ থেকে ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও বিবেচনার কথা ওঠে।

মামলাকারীরা অভিযোগ করেছিলেন, কোথাও প্রয়োজনীয় বই নেই, কোথাও শিক্ষক কিংবা পাঠদানের ব্যবস্থা হয়নি। কেন্দ্র সেই অভিযোগের সঙ্গে একমত হয়নি। ঐশ্বর্যা ভাটী জানিয়েছিলেন, সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেছে এবং প্রস্তুতির সমর্থনে তথ্যও রয়েছে। ফলে পরিকাঠামোর ঘাটতি সংক্রান্ত অভিযোগকে আদালতের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না। আদালতও ভাষানীতির উদ্দেশ্য বাতিল করার কথা বলেনি। প্রধান বিচারপতি প্রয়োগের পথে বাধা দূর করে ব্যবস্থাটি সুসংবদ্ধ করার উপর জোর দিয়েছিলেন। নীতির বৈধতা ও প্রয়োগপদ্ধতি পৃথক বিচার্য বিষয়।

এই ব্যবস্থার ভিত্তি জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০২০। তার ৪.১৩ অনুচ্ছেদে তিনটি ভাষা শেখার কথা বলা হয়েছে, যার অন্তত দু’টি ভারতের নিজস্ব ভাষা হতে হবে। পাশাপাশি নীতিতে স্পষ্ট বলা আছে, কোনও রাজ্যের উপর কোনও ভাষা চাপানো হবে না। ভাষা নির্বাচনে রাজ্য, অঞ্চল ও শিক্ষার্থীর পছন্দের জায়গা থাকবে। অর্থাৎ ত্রিভাষা নীতি মানেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য হিন্দি বাধ্যতামূলক—এমন কথা মূল নীতিতে লেখা নেই।

শিক্ষানীতিতে ষষ্ঠ অথবা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়াদের ভাষা বদলানোর সুযোগের কথাও রয়েছে, তবে মাধ্যমিক স্তরের শেষে তিনটি ভাষায় নির্ধারিত দক্ষতা অর্জনের শর্ত আছে। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার শিক্ষক নিয়োগে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনও স্বীকার করা হয়েছে। এই ঘোষিত লক্ষ্যগুলির সঙ্গে বিদ্যালয়ের বাস্তব প্রস্তুতির সামঞ্জস্য কতটা, বর্তমান মামলায় সেই প্রশ্নই গুরুত্ব পাচ্ছে। ভাষা শেখার উদ্দেশ্যের পাশাপাশি শেখানোর সামর্থ্যও তাই আলোচনায় রয়েছে। বহুভাষিক শিক্ষার লক্ষ্য সফল করতে নির্বাচনের স্বাধীনতার সঙ্গে বাস্তবে সেই ভাষা শেখার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। নির্দেশিকা কার্যকর করার আলোচনায় এই যোগসূত্রটি তাই প্রাসঙ্গিক।

আপাতত নজর ১৭ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে। কেন্দ্র ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য কী ছাড় প্রস্তাব করে এবং ইংরেজির শ্রেণিবিন্যাসের পক্ষে কী যুক্তি দেয়, তা তখন স্পষ্ট হতে পারে। পড়ুয়া ও অভিভাবকদের কাছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হবে ছাড়ের সুনির্দিষ্ট পরিধি: কোন নিয়ম কখন থেকে কার্যকর হবে, তৃতীয় ভাষার মূল্যায়ন কীভাবে হবে এবং বোর্ড পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা বর্তমান ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য বহাল থাকবে কি না। দ্রুত সিদ্ধান্তের আশ্বাসের পরে এখন সেই স্পষ্টতার অপেক্ষা।