সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: কুম্ভমেলায় নাগা সন্ন‍্যাসীদের কখনও দেখেছেন? না হলে পরের কুম্ভে একবার ঘুরে আসুন। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী যাই হোননা কেন, এমন অভিজ্ঞতা জীবনে আর কোথাও কখনও হবেনা।ইয়ে দাড়ি সুমনরা গ্যারান্টি হ‍্যায়!।
মহাস্নানের দিনে হাজার হাজার ভস্মমাখা সন্ন্যাসী যখন শোভাযাত্রা করে এগোন, সে এক দেখার মতো দৃশ্য। জটা উড়ছে, পতাকা উড়ছে, জয়ধ্বনি উঠছে। দর্শনার্থীর চোখ জুড়িয়ে যায়। কর্তব্যরত পুলিশকর্মীর অবশ্য চোখ জুড়োনোর অবকাশ কম। তিনি দেখেন রাস্তা পরিষ্কার আছে কি না। ভক্তের লক্ষ্য পুণ্যলাভ, পুলিশের লক্ষ্য নির্বিঘ্নে কর্তব্য সমাপন। একই মেলা, মুক্তির সংজ্ঞা আলাদা।নাগাদের আদরযত্নের সঙ্গে তাই একটু সম্ভ্রম, একটু সতর্কতাও মেশানো থাকে। আখড়ার মর্যাদা, স্নানের পালা, শোভাযাত্রার পথ নিয়ে টানাপড়েনের ইতিহাস আছে। যোদ্ধা সন্ন্যাসীদের ঐতিহ্যটি নিছক সাজসজ্জার নয়। ফলে কোনও মহারাজ রুষ্ট হয়েছেন শুনলে দায়িত্বে থাকা আধিকারিক সাধারণত দর্শনের বই খুলে ক্রোধের অসারতা বোঝাতে বসেন না। হাতজোড় করে সমস্যাটা শুনে নেন। প্রলয়ের সম্ভাবনা নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক তর্ক পরে হবে। আগে মহারাজকে নির্দিষ্ট ঘাটে পৌঁছে দেওয়া যাক। চাকরিজীবী মানুষেরও সংসার আছে, ছেলেমেয়ে আছে, অবসরের পরে তীর্থ করার ইচ্ছে আছে।

গঙ্গাসাগরেও নাগাবাবারা আসেন। কুম্ভের বিপুল সমারোহের তুলনায় সে উপস্থিতি অনেক ছোট। তবু তাঁদের ঘিরে কৌতূহল কম হয় না। কেউ প্রণাম করেন, কেউ দূর থেকে দেখেন, কেউ ছবি তোলার সুযোগ খোঁজেন। সাগরের জল, কপিলমুনির আশ্রম, ধুনির পাশে সন্ন্যাসী, সব মিলিয়ে একটা চেনা পরিমণ্ডল। নাগাদের সেখানে মানায়। যেমন মাছকে জলে মানায়, কবিকে অন্যমনস্কতায় । সেই নাগাবাবাদের কয়েকজনকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে রাজনৈতিক মিছিলে দেখে মনে হল, তীর্থযাত্রার মানচিত্রে হঠাৎ একটা মুদ্রণপ্রমাদ ঘটেছে।

এই অসাধ্যসাধন কে করেছেন জানি না। যিনিই করে থাকুন, তাঁকে অবিলম্বে সরকারের তরফে একটি নাগার্জুন পুরস্কার দেওয়া উচিত। পুরস্কারটি চালু না থাকলে চালু করা হোক। অর্জুন লক্ষ্যভেদ করেছিলেন মাছের চোখে, ইনি নাগাবাবাদের পৌঁছে দিয়েছেন যাদবপুরের ফটকে। কৃতিত্ব কম কীসে? মানপত্রে লেখা থাকুক, প্রচলিত তীর্থপথের বাইরে সন্ন্যাসীদের পদচারণার সুযোগ সৃষ্টিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি। সঙ্গে একটি ফলক। উত্তরীয় দেওয়ার আগে অবশ্য জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভাল, মহারাজ গ্রহণ করবেন কি না।

বুধবারের গেরুয়া মিছিলে তাঁদের উপস্থিতির খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কোন আখড়া থেকে, কার আমন্ত্রণে, কী বুঝিয়ে তাঁদের আনা হয়েছিল, সেই কাহিনি এখনও অজানা। কল্পনায় আমন্ত্রণপত্রটি বেশ মনোহর হতে পারে। গঙ্গাস্নান নেই, সাগর নেই, সামনে বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সেখানে কিছু ছেলেমেয়ে খুব তর্ক করে। বাবাদের এক বার নিয়ে গিয়ে দেখানো দরকার। নাগাবাবারা হয়তো ভেবেছেন, বেশ তো, তর্ক করা ছেলেমেয়ে দেখা যাক। সারাক্ষণ প্রণাম করা লোক দেখতে দেখতেও একঘেয়েমি আসে।

বেপাড়ায় এসে বাবারা কিন্তু দিব্যি শান্ত। মুখে অনাবিল হাসি, চোখে শিশুসুলভ কৌতূহল। রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছেন, যেন প্রথম বার চিড়িয়াখানায় এসে শিশু এক খাঁচা থেকে অন্য খাঁচায় চোখ ফেরাচ্ছে। নাগাবাবাদের কাছে জায়গাটা নতুন। যাঁরা সঙ্গে এনেছেন তাঁদের উত্তেজনা আর অতিথিদের কৌতুহল এক বস্তু নয়। বরযাত্রী ভুল বিয়েবাড়িতে পৌঁছে গেলেও প্রথমে তো চারপাশটা দেখে। এখানে পাত্র কে, পাত্রী কে, রান্নাঘর কোন দিকে, সে সব পরে জানা যাবে।

আমাদেরও নাগাবাবাদের দেখার অভ্যাস আছে, বিস্ময়ে বিভোর হয়ে তাঁদের কিছু দেখছেন, এমন দৃশ‍্য সচরাচর দেখা যায়না। তাঁরা সাধারণত দর্শন দেন, এ বার নিজেরাই দর্শক। এই ভূমিকাবদলটিই ভারী মজার। এত দিন মানুষ তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হয়েছে। এ বার তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্মিত। ভিতরের ছেলেমেয়েরাও নিশ্চয়ই তাকিয়েছে। দুপক্ষের এই পারস্পরিক নিরীক্ষণে কোনও অসুবিধা ছিল না। অসুবিধা হতে পারে তাঁদের, যাঁরা ধরে নিয়েছেন অতিথির কৌতূহলটুকুও আমন্ত্রণকারীর রাজনৈতিক সম্পত্তি।

বাবাদের নিয়ে ছবি তোলার সুবিধে যেমন আছে, অসুবিধেও আছে। সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী ক্যামেরা দেখলে মুখের ভাব ঠিক করে নিতে পারেন। কখন কঠোর হতে হবে, কখন ক্ষুব্ধ, কখন জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, অভ্যাসে শিখে যান। অতিথি নাগাবাবা হয়তো সেই মুহূর্তেই হেসে ফেললেন। সর্বনাশ! পিছনে আয়োজকের মুখ গম্ভীর, সামনে মহারাজের মুখে ফিকফিক হাসি। তাঁকে কি বলা যায়, বাবা, একটু রাগী রাগী মুখ করুন, আমরা এই ছবিটা দিয়ে ভয় দেখাব? শুনে তিনি আরও হেসে উঠলে তো গোটা পরিকল্পনাই মাঠে মারা যাবে। হাসির উপর তো আয়োজকদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই!

নাগাবাবাদের এনে ভালই করেছেন। প্রশ্ন একটাই, জেনেশুনে এনেছেন তো? শোভাযাত্রায় কয়েকজন সন্ন্যাসী থাকলে ছবি ভাল হয়, কিন্তু ছবির মানুষগুলো ছবির নির্দেশ মেনে সারাজীবন দাঁড়িয়ে থাকেন না। তাঁদের নিজস্ব পছন্দ আছে, অপছন্দ আছে, গুরু আছেন, সাধনার রীতি আছে। কে কার সঙ্গে কথা বলবেন, কাকে আশীর্বাদ করবেন, তা মিছিলের ব্যবস্থাপক ঠিক করে দিতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা কোথায়? অতিথিকে রাস্তা দেখানো যায়। তাঁর মন কোন দিকে হাঁটবে, তার জন্য আলাদা ব্যারিকেড পাওয়া যায় না।

নাগা সন্ন্যাসীদের পরিচিত ধারাটি প্রধানত শৈব। মহাদেবের সংসারের সঙ্গে ভদ্রলোকের বৈঠকখানার নিয়মকানুন পুরো মেলে না। শ্মশান, ভস্ম, ধুনি, তপস্যা, সব মিলিয়ে সেখানে অন্য আবহ। সাধুদের ছিলিম হাতে বসে থাকার ছবিও আমাদের অপরিচিত নয়। সেই পরিচিত ছবিটুকু মনে রেখেই উদ্যোক্তাদের একটি সাবধানবাণী শোনাতে চাই। বাবাদের বাইরে যত খুশি ঘোরান, ছবি তুলুন, জল খাওয়ান। কিন্তু ভুল করেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ঢুকিয়ে দেবেন না। বিপদটা যেখানে ভাবছেন, সেখানে নয়। একেবারে অন্য জায়গায়।

এর পরের দৃশ্যটি অবশ্যই আমার কল্পনা। ধরা যাক, ভিতরে ঢুকেই কোনও গাছতলায় কয়েকজন দিমাগি ছেলেপিলেদের হাতে ছিলিম দেখে এক নাগাবাবা থমকে দাঁড়ালেন। সঙ্গে আসা লোক ভাবল, সর্বনাশ, মহারাজ রেগে গেলেন বুঝি! তিনি তাড়াতাড়ি বোঝাতে গেলেন, দেখছেন তো বাবা, এই হচ্ছে এখানকার অধঃপতন। বাবা কিন্তু তাঁর বাক্য শেষ হওয়ার আগেই হাসিমুখে গাছতলায় বসে পড়লেন। তার পরে ছাত্রের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, বেটা, একটু জায়গা করে দে!

ব্যস, সেখানেই মিছিলের নির্ধারিত কর্মসূচির বিসর্জন। যাঁদের দেখিয়ে বাবাকে রাগানোর কথা, বাবা তাঁদের সঙ্গেই বসে পড়েছেন। আয়োজক বলছেন, মহারাজ, এরা কিন্তু নকশাল। বাবা বলছেন, আচ্ছা, তা বসতে দাও। আয়োজক বলছেন, এরা কারও কথা শোনে না। বাবা বলছেন, খুব ভাল, আমিও তো সংসারের কথা শুনিনি। আয়োজক বলছেন, এরা প্রতিষ্ঠানের বিরোধী। বাবা বলছেন, সংসার ছেড়ে বেরোনোর সময়ে আমার বাড়ির লোকও সেই কথাই বলেছিল। কথোপকথন যত এগোয়, আয়োজকের মুখ তত ছোট হয়।

এ দিকে ছাত্রদেরও কৌতূহল। বাবা, আখড়ায় কী ভাবে ঢুকতে হয়? বাবা বলছেন, গুরু ধরতে হয়। ছাত্র বলছে, আমাদের এখানেও প্রায় তাই। বাবা বলছেন, অনেক সাধনা করতে হয়। ছাত্র বলছে, গবেষণার টাকাটা পেতে আমাদেরও কম তপস্যা করতে হয় না। বাবা বলছেন, মোহ ছাড়তে হয়। ছাত্র বলছে, চাকরির আশা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই আশা ত‍্যাগ করেছি।দেখা গেল, আলাপ দিব্যি জমে উঠেছে। এত দিন যাঁদের মধ্যে সভ্যতার সংঘর্ষ ঘটানোর আয়োজন চলছিল, তাঁরা পাঁচ মিনিটে নিজেদের মধ্যে মিল খুঁজে পেয়েছেন।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হবে আশীর্বাদের মুহূর্তটি। মহারাজ যদি ছাত্রদের মাথায় হাত রেখে বলেন, সুখে থাকো, ভয় পেয়ো না, তখন কী হবে? আশীর্বাদ প্রত্যাহারের আবেদন করা যায়? বলা যায়, বাবা, তালিকায় ভুল হয়েছে, ওদের জন্য ভর্ৎসনা বরাদ্দ ছিল? নাগাবাবা কি আশীর্বাদের আগে দলীয় পরিচয়পত্র পরীক্ষা করেন? আয়োজক তখন বুঝবেন, সাধুকে আনা আর সাধুকে দিয়ে নিজের মনের কথাটি বলানো আলাদা কৃতিত্ব। প্রথমটির জন্য গাড়ি লাগে। দ্বিতীয়টির জন্য কখনও কখনও অলৌকিক ক্ষমতাও কম পড়ে।

ধরা যাক, এর মধ্যেই কোনও ছাত্র বলল, বাবা, আমরা একটু হাঁটতে বেরোচ্ছি, যাবেন? বাবা উঠে দাঁড়ালেন। একজনের কাঁধে হাত রাখলেন, অন্যজনের সঙ্গে গল্প করতে করতে এগোলেন। সামনে ছাত্র, পাশে নাগা। আয়োজক দূর থেকে ছুটে এসে বলছেন, মহারাজ, আমাদের মিছিল ওদিকে! বাবা অবাক হয়ে বললেন, মিছিলের আবার আমাদের তোমাদের কী? হাঁটছি তো! তখন তাঁকে রাজনৈতিক বিভাজন বোঝাতে বসতে হবে। কিন্তু মহারাজের ততক্ষণে নতুন সঙ্গীদের বেশ ভাল লেগে গিয়েছে।

সে ছবি বেরোলে ব্যাখ্যার কী দুর্দশা হবে ভাবুন। যাঁদের উপস্থিতি দিয়ে ছাত্রদের চমকে দেওয়ার কথা, তাঁরাই ছাত্রদের কাঁধে হাত রেখে হাঁটছেন। ছবির নীচে কী লেখা হবে? সৌজন্য সাক্ষাৎ? আধ্যাত্মিক ভুল বোঝাবুঝি? সাময়িক পথবিভ্রাট? নাগাবাবাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কম বলে ক্ষমা চাওয়া হবে না ছাত্রদের আতিথেয়তাকে গভীর ষড়যন্ত্র বলা হবে? সবচেয়ে মুশকিল, বাবারা হয়তো সাংবাদিককে সোজাসুজি বলে বসবেন, ছেলেগুলো বেশ ভাল। ওই একটি বাক্যের মোকাবিলায় কত মুখপাত্র যে লাগবে!

তাই নাগার্জুন পুরস্কারের প্রস্তাব বহাল রেখেই বলছি, নাগাবাবাদের সঙ্গে একটু সাবধানে চলুন। যে মানুষ সংসারের বাঁধন ছেড়েছেন, তাঁকে মিছিলের দড়িতে বেঁধে রাখা সহজ নয়। তাঁকে কোথায় নিয়ে যাবেন ঠিক করতে পারেন, কাকে দেখে তাঁর মুখে হাসি ফুটবে ঠিক করতে পারবেন না। যাদবপুরের ফটকে দাঁড়িয়ে তাঁদের সেই কৌতূহলী হাসিই যথেষ্ট আশঙ্কাজনক। আজ বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছেন। কাল ভিতরে বসে গল্প করবেন। পরশু হয়তো ফের আসতে চাইবেন। তখন নাগাবাবাদের হাত থেকে ছাত্রদের উদ্ধার করতে হবে না, ছাত্রদের আড্ডা থেকে নাগাবাবাদের ফেরত আনতে হবে।