সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: ভারতীয় গণতন্ত্রে সময় বড় আপেক্ষিক বস্তু। ভোটের আগে দল বদলাতে সাত মিনিট লাগে না, নতুন দলের মঞ্চে উঠে পুরনো নেত্রীকে স্বৈরাচারী বলতে সাত সেকেন্ডও লাগে না, কিন্তু সেই দলবদলের কারণ লিখে জানাতে সাত দিন নিতান্তই অমানবিক। অতএব তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে পরে এনসিপিআইয়ের ছাতার তলায় আশ্রয় নেওয়া কুড়ি সাংসদ লোকসভা সচিবালয়ের কাছে তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছেন। গণতন্ত্রের এই কুড়ি কৃতী সন্তান নিশ্চয়ই স্মৃতিশক্তি ঝালিয়ে দেখবেন—কখন তাঁরা তৃণমূল ছাড়লেন, কেন ছাড়লেন, আদৌ ছাড়লেন কি না, আর ছেড়ে থাকলেও কীভাবে না-ছাড়ার সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।

লোকসভা সচিবালয় ২৬ আগস্ট তাঁদের কাছে নোটিস পাঠিয়েছিল। নোটিসে বলা হয়েছিল, সাত দিনের মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা সদস্যপদ খারিজের আবেদনের জবাব দিতে হবে। কিন্তু সাত দিন! এত কম সময়ে কি একটি রাজনৈতিক আত্মার সম্পূর্ণ পুনর্জন্ম ব্যাখ্যা করা সম্ভব? জন্মান্তর নিয়ে পুরাণে হাজার হাজার শ্লোক লেখা হয়েছে। আর এঁদের কাছে চাওয়া হচ্ছে মাত্র এক সপ্তাহে তৃণমূল থেকে এনসিপিআই হয়ে ওঠার কাহিনি! তাই সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তাঁরা তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছেন। আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ চলছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়ে গিয়েছে; এখন তার জন্য উপযুক্ত আইন খোঁজা হচ্ছে।

এই হল ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে মনোহর রীতি—আগে কাজ, পরে কারণ। আগে নদী পার হওয়া, পরে সেতুর নকশা। আগে দল ছাড়া, পরে আইনজীবীকে জিজ্ঞাসা করা, “স্যর, আমরা কি সত্যিই দল ছেড়েছি?” আইনজীবী তখন সংবিধানের দশম তফসিল খুলে বোঝাবেন, চোখে যা দেখা যায়, আইনে তা সব সময় দেখা যায় না। আপনি অন্য দলের সভায় বসে থাকলেও বলতে পারেন, আপনার শরীর গিয়েছিল, মন যায়নি। অন্য দলের পতাকা ধরলেও যুক্তি দেওয়া যায়, সেটি বাতাসে উড়ে এসে হাতে পড়েছিল। পুরনো দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলেও বলা যায়, আঙুল ভুল বোতাম টিপেছে। গণতন্ত্রে ব্যাখ্যার অভাব নেই; প্রয়োজন শুধু পর্যাপ্ত সময় ও দক্ষ উকিল।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য ব্যাপারটিকে এত কাব্যিক চোখে দেখছেন না। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূলের টিকিটে জয়ী এই কুড়ি সাংসদ দল ছেড়ে এনসিপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, দলীয় নির্দেশের বিরুদ্ধেও কাজ করেছেন; ফলে দলত্যাগ-বিরোধী আইনে তাঁদের সদস্যপদ খারিজ হওয়া উচিত। জুন মাসে পৃথক পৃথক আবেদন করা হলেও সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তিনি সুপ্রিম কোর্টে যান। তাঁর দাবি, বিলম্ব যত বাড়বে, দলত্যাগের পুরস্কার হিসেবে সাংসদ পদ ভোগ করার সুযোগও তত দীর্ঘ হবে।

অভিষেকের এই উদ্বেগ অবশ্য অতিশয় সংসারী। রাজনীতির উচ্চতর দর্শনে দলত্যাগ কোনও অপরাধ নয়, বরং আত্মোপলব্ধি। নির্বাচনের সময়ে এক দলের প্রতীক, কর্মী, সংগঠন ও ভোটারের শ্রম ব্যবহার করে সংসদে পৌঁছে অন্য শিবিরে চলে যাওয়াকে সাধারণ মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা বলতে পারেন। কিন্তু রাজনীতিবিদেরা বলেন, “বিবেকের ডাকে সাড়া।” এই বিবেকটি বড় আশ্চর্য জীব। ভোটের আগে সে সাধারণত ঘুমিয়ে থাকে। মন্ত্রীপদ, ক্ষমতার পালাবদল কিংবা পুরনো দলের দুর্দিনের আভাস পেলেই হঠাৎ তার ঘুম ভাঙে। তারপর সে এমন তীব্র স্বরে ডাকতে থাকে যে সাংসদের পক্ষে পুরনো দলে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কুড়ি সাংসদের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা হতে পারে—তাঁদের সংখ্যা যথেষ্ট, অতএব এটি দলত্যাগ নয়, এক প্রকার সমবেত দেশসেবা। এক জন গেলে তিনি লোভী; কুড়ি জন গেলে তাঁরা আদর্শবাদী। এক জনের পলায়ন বিশ্বাসঘাতকতা; দল বেঁধে পলায়ন রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস। চোর একা এলে চুরি, মিছিল করে এলে আন্দোলন—আমাদের গণতন্ত্র সংখ্যার এই পবিত্র রসায়ন বহু আগেই আয়ত্ত করেছে।

মুশকিল হল, দলত্যাগ-বিরোধী আইনের বর্তমান কাঠামোয় শুধু সংসদীয় দলের দুই-তৃতীয়াংশ একসঙ্গে বেরিয়ে গেলেই সব পাপ ধুয়ে যায়—এমন সরল রাস্তা নেই। পুরনো আইনে ‘স্প্লিট’ বা বিভাজনের ছাড় থাকলেও তা ২০০৩ সালে তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন বৈধ সংযুক্তির প্রশ্নে মূল রাজনৈতিক দলের অন্য দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার শর্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিষেকের আপত্তির কেন্দ্রও সেখানে—সংসদীয় দলের কয়েকজন সদস্য নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে গোটা রাজনৈতিক দলকে অন্য দলের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন বলে দাবি করতে পারেন কি না। এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে তাঁরা বিপ্লবী, দলত্যাগী, না কি সংবিধানের সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে গলে যাওয়া দক্ষ ক্রীড়াবিদ।

সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চও বুঝিয়ে দিয়েছে, শুধু নোটিস পাঠিয়ে কর্তব্য শেষ হয় না; নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ হওয়াটাই আসল। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর মন্তব্য ছিল, প্রশ্নটি কেবল নোটিস জারির নয়, একটি সময়সীমার মধ্যে কার্যক্রম শেষ করার।

এখানেই ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির চিরন্তন নাটক। দলত্যাগ ঘটে দ্রুতগামী ট্রেনের বেগে, কিন্তু তার বিচার চলে গোরুর গাড়িতে। স্পিকার নোটিস দেন, সাংসদ সময় চান, উকিল ব্যাখ্যা লেখেন, আবার জবাব আসে, শুনানি হয়, নথি জমা পড়ে—তত দিনে লোকসভার মেয়াদই হয়তো শেষের দিকে। তখন সদস্যপদ খারিজের সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে পারে বিয়ের ভোজ শেষ হওয়ার পর নিমন্ত্রণপত্র পৌঁছনোর মতো অর্থবহ।

তিন সপ্তাহ সময় চাওয়া তাই নিছক আইনি আবেদন নয়; এটি রাজনৈতিক সময় কেনার সুপ্রাচীন শিল্প। প্রতিটি অতিরিক্ত দিন মানে সাংসদ পদ অক্ষত, বেতন-ভাতা অক্ষত, সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা অক্ষত এবং নতুন দলের সংখ্যাও অক্ষত। গণতন্ত্রে সময়ই ক্ষমতা, আর বিলম্ব তার স্থায়ী আমানত।

এখন দেখার, তিন সপ্তাহ পরে কুড়ি সাংসদ কী মহাগ্রন্থ রচনা করেন। তাঁরা কি বলবেন, তৃণমূল ছাড়েননি—তৃণমূলই তাঁদের নিচ থেকে সরে গিয়েছে? না কি এনসিপিআইয়ে যোগ দেননি—এনসিপিআই তাঁদের চারপাশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গজিয়ে উঠেছে? যুক্তি যাই হোক, একটি সত্য ইতিমধ্যে পরিষ্কার: ভোটার পাঁচ বছরে এক দিন সিদ্ধান্ত নেন; সাংসদরা বাকি এক হাজার আটশো চব্বিশ দিন সেই সিদ্ধান্তের অর্থ বদলানোর স্বাধীনতা ভোগ করেন। এই ব্যবস্থার নামই প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র—প্রথমে মানুষ প্রতিনিধি বাছেন, তারপর প্রতিনিধি নিজের সুবিধামতো দল বাছেন।