জি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত দেউলিয়া সংক্রান্ত মামলায় নাটকীয় মোড় নিল। জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনালের পাঁচ সদস্যের বিশেষ বেঞ্চ তাঁর ৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকার ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা অনুমোদনকারী ২৫ আগস্টের নির্দেশ স্থগিত করে দিয়েছে। পাওনাদারদের গৃহীত দাবির মোট পরিমাণ যেখানে ২২ হাজার ৬ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা, সেখানে সুভাষের প্রস্তাবিত অর্থ তার মাত্র ০.০৩ শতাংশ। ফলে ওই পরিকল্পনা কার্যকর হলে পাওনাদারদের প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ অর্থ ছেড়ে দিতে হত।

ট্রাইব্যুনালের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনুপিন্দর সিং গ্রেওয়ালের নেতৃত্বাধীন বিশেষ বেঞ্চ বলেছে, মামলাটির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সুভাষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর কোনও সম্পত্তি বিক্রি, হস্তান্তর, বন্ধক কিংবা অন্য কোনও ভাবে দায়বদ্ধ করতে পারবেন না। সব পক্ষকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে তাদের বক্তব্যও জানতে চেয়েছে বেঞ্চ। বিশেষ বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিয়েছে, সব পক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য না শোনা পর্যন্ত ২৫ আগস্টের নির্দেশ কার্যকর করা যাবে না।

ইন্ডিয়াবুলস হাউজ়িং ফিন্যান্সের আবেদনের ভিত্তিতে দেউলিয়া ও দেউলিয়াত্ব বিধির ৯৫ নম্বর ধারায় সুভাষের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দেউলিয়া প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এসেল গোষ্ঠীর বিভিন্ন সংস্থার নেওয়া ঋণের জন্য তিনি ব্যক্তিগত জামিনদার ছিলেন। তাই ২২ হাজার কোটি টাকা সুভাষ নিজে ঋণ নিয়েছিলেন—বিষয়টি এমন নয়; ওই অঙ্কটি মূলত তাঁর দেওয়া ব্যক্তিগত জামিনের ভিত্তিতে পাওনাদারদের গৃহীত দাবির সমষ্টি।

সুভাষের প্রস্তাব ছিল, পাওনাদারদের তিনি ৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা দেবেন। দেউলিয়া নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াগত খরচ বাবদ রাখা হয়েছিল আরও ২৫ লক্ষ টাকা। পাশাপাশি মূল ঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলির কাছ থেকে প্রায় ১,৪৯৪ কোটি টাকা আদায়ের ব্যবস্থা এবং সংস্থাগুলির বন্ধকী সম্পত্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপের অধিকার পাওনাদারদের হাতে রাখার কথাও পরিকল্পনায় ছিল। তা সত্ত্বেও সুভাষের ব্যক্তিগত দায় এত সামান্য অর্থে মিটিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আপত্তি তোলে।

মামলাটির জটিলতার সূত্রপাত ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্যের বেঞ্চে মতবিরোধ থেকে। বিচারবিভাগীয় সদস্য অশোককুমার ভরদ্বাজ পরিকল্পনাটি কেবল তার পক্ষে ভোট দেওয়া পাওনাদারদের ক্ষেত্রে অনুমোদনের পক্ষপাতী ছিলেন। অন্য দিকে, কারিগরি সদস্য রিনা সিনহা পুরী নিষ্পত্তি-পেশাদারের অনুসৃত প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি রয়েছে বলে পরিকল্পনাটিই প্রত্যাখ্যান করেন।

মতানৈক্যের কারণে কোম্পানি আইনের ৪১৯(৫) ধারায় বিষয়টি তৃতীয় সদস্য নীলেশ শর্মার কাছে পাঠানো হয়। তিনি ২৫ আগস্ট পরিকল্পনাটি অনুমোদন করে বলেন, তা বিরোধিতা করা পাওনাদার-সহ সকলের উপরেই বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু মামলাটি দুই সদস্যের মূল বেঞ্চে ফেরার পরে তাঁরা দেখেন, তিনটি মতামতের মধ্যে কোনও নির্দিষ্ট প্রস্তাবের পক্ষে প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়নি। কারণ এক সদস্য সম্পূর্ণ অনুমোদন, অন্য জন আংশিক অনুমোদন এবং তৃতীয় জন প্রত্যাখ্যানের কথা বলেছেন। সেই কারণেই বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের সভাপতির কাছে পাঠানো হয় এবং পাঁচ সদস্যের বিশেষ বেঞ্চ গঠিত হয়।

বিরোধী পাওনাদাররা জাতীয় কোম্পানি আইন আপিল ট্রাইব্যুনালেও ২৫ আগস্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। তাঁদের হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা যুক্তি দেন, এত বিপুল পরিমাণ গৃহীত দাবির বিপরীতে ৬.২৫ কোটি টাকার পরিকল্পনা কার্যকর হয়ে গেলে দেউলিয়া ও দেউলিয়াত্ব বিধির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। বিশেষ বেঞ্চের স্থগিতাদেশের পরে আপিলটি চালানো হবে কি না, তা স্থির করতে তিনি সময় চেয়েছেন।

পাওনাদারদের আরও অভিযোগ, পরিকল্পনার পক্ষে ভোট দেওয়া কয়েকটি সংস্থা সুভাষ বা তাঁর গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত। ভোটদান পদ্ধতি, কিছু পাওনাদারের দাবি বাদ দেওয়া এবং নিষ্পত্তি-পেশাদারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ বেঞ্চ এখন এই প্রক্রিয়াগত আপত্তিগুলির পাশাপাশি ব্যক্তিগত জামিনদারের দায় কত দূর পর্যন্ত এই ধরনের পরিকল্পনায় লঘু করা যায়, তা পরীক্ষা করবে।

স্থগিতাদেশটির অর্থ অবশ্য এই নয় যে সুভাষকে এখনই ২২ হাজার কোটি টাকা মেটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবার ৬.২৫ কোটি টাকা দিয়ে তাঁর দায়মুক্তির পথও আপাতত বন্ধ। বিশেষ বেঞ্চের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সম্পত্তি হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা জারির উদ্দেশ্য হল সম্ভাব্য আদায়যোগ্য সম্পদ অক্ষত রাখা। ফলে মামলাটি এখন শুধু এক শিল্পপতির ঋণ নিষ্পত্তির প্রশ্ন নয়; বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত জামিন, পাওনাদারদের অধিকার এবং ভারতের দেউলিয়া ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।