জেন ‘জি’ জয় হো

যা জানা জরুরি
- নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে পথে নামা ছাত্রছাত্রীদের বড় স্বস্তি দিল সুপ্রিম কোর্ট।
- গত ২০ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে হওয়া আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রকৃত ছাত্র-বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত এফআইআর খারিজ করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
- সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে দেওয়া বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আদালত জানিয়েছে, কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ওই সময়ের আন্দোলন নিয়ে আর নতুন করে এফআইআর দায়ের…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে পথে নামা ছাত্রছাত্রীদের বড় স্বস্তি দিল সুপ্রিম কোর্ট। গত ২০ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে হওয়া আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রকৃত ছাত্র-বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত এফআইআর খারিজ করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে দেওয়া বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আদালত জানিয়েছে, কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ওই সময়ের আন্দোলন নিয়ে আর নতুন করে এফআইআর দায়ের করতে পারবে না।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চের তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ—কেবল কোনও প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই আদালত এই ব্যতিক্রমী নির্দেশ দিয়েছে। তবে মামলার বিশেষ পরিস্থিতিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; ভবিষ্যতের অন্য কোনও মামলায় একে নজির হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না বলেও বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে।
কেন্দ্র, দিল্লি পুলিশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মহারাষ্ট্র ও অসম সরকার নির্দিষ্ট কয়েকটি এফআইআর প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তার নির্দেশের পরিধি গোটা দেশে বিস্তৃত করেছে। বেঞ্চ বলেছে, ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের আন্দোলনকে ঘিরে দেশের যে কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে দায়ের হওয়া সংশ্লিষ্ট এফআইআরের তদন্ত বন্ধ করতে হবে এবং সেগুলিকে সব দিক থেকেই নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে বলে ধরতে হবে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীদের আর পৃথকভাবে আদালতে গিয়ে মামলা খারিজ করাতে হবে না।
তবে এই আইনি সুরক্ষা নির্বিচার নয়। দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনে উপস্থিত ২,৮৭৩ জনের বিরুদ্ধে একটি সংহত এফআইআর দায়েরের অনুমতি দিল্লি পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, এঁদের অনেকের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ-সহ গুরুতর অপরাধের পূর্ব-ইতিহাস রয়েছে এবং ছাত্র আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে তাঁরা হিংসা বা সম্পত্তি নষ্টে যুক্ত হয়েছিলেন। কারও বিরুদ্ধে শারীরিক আক্রমণ কিংবা সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের নির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে তদন্ত চালানো যাবে। অবশ্য অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সমস্ত আইনি অধিকার বজায় থাকবে। আদালত প্রকৃত আন্দোলনকারী ও অপরাধমূলক কাজে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে এই স্পষ্ট বিভাজন রেখেছে।
শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, ২৫ জুলাই আন্দোলনকারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের কাছে কেন্দ্র যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা মেনেই এফআইআরগুলি খারিজের আবেদন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে নথিভুক্ত এফআইআর সাধারণ প্রশাসনিক নির্দেশে প্রত্যাহার করতে গেলে সংশ্লিষ্ট আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া এবং বিচারবিভাগীয় অনুমোদনের মতো আইনি জটিলতা থাকত। সেই কারণেই সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করেছে।
পুলিশি অভিযানে আহত বিক্ষোভকারীদের জন্য ক্ষতিপূরণের একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরির নির্দেশও কেন্দ্রকে দিয়েছে আদালত। রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির সঙ্গে আলোচনা করে ক্ষতিপূরণের যোগ্যতা, আঘাতের মাত্রা, অর্থের পরিমাণ এবং আবেদন নিষ্পত্তির পদ্ধতি স্থির করতে হবে। তৈরি হওয়া ব্যবস্থাটি ভবিষ্যতেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে অনুসরণযোগ্য নিয়মিত কাঠামো হিসেবে গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিট পরীক্ষা বাতিলের অভিঘাতে আত্মঘাতী হওয়া পড়ুয়াদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও আদালতে পুনর্ব্যক্ত করেছে কেন্দ্র। সেই সহায়তার রূপরেখা চূড়ান্ত করতে তিন মাস সময় চাওয়া হয়েছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ অবশ্য এফআইআর খারিজের সঙ্গে শেষ হয়ে যাচ্ছে না। পেলেট বন্দুক, বৈদ্যুতিক লাঠি, কাঁদানে গ্যাস এবং অনিয়ন্ত্রিত লাঠিচার্জের অভিযোগ তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আর সুবাশ রেড্ডির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি আগেই গঠন করেছে সুপ্রিম কোর্ট। গুরুতর জখম, মহিলা আন্দোলনকারীদের হেনস্থা এবং পুলিশি বিধিভঙ্গের অভিযোগকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। সিসিটিভি, ড্রোন, দেহ-ক্যামেরা ও পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষের নথিও সংরক্ষণের নির্দেশ রয়েছে। ফলে আন্দোলনকারীদের মামলা থেকে মুক্তি দেওয়া হলেও অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলবে। এই তদন্তকে পুলিশি বলপ্রয়োগের সাংবিধানিক সীমা নির্ধারণের বৃহত্তর প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আদালতের নির্দেশ এবং কেন্দ্রের প্রতিশ্রুতির পরে ককরোচ জনতা পার্টির সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস ৫ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ঘোষিত মিছিল প্রত্যাহারের কথা জানান। সরকারের ইতিবাচক আশ্বাস আদালতের অনুমোদন পাওয়ায় আন্দোলন স্থগিত করা হচ্ছে বলে তিনি বেঞ্চকে জানান।
এই নির্দেশের তাৎপর্য তাই শুধু কয়েকটি ফৌজদারি মামলা খারিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার—সুপ্রিম কোর্ট সেই নীতিই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করল। একই সঙ্গে বুঝিয়ে দিল, প্রতিবাদের আড়ালে হিংসা যেমন সুরক্ষা পাবে না, তেমনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা বা মাত্রাতিরিক্ত পুলিশি বলপ্রয়োগও বিচারবিভাগীয় পরীক্ষার ঊর্ধ্বে নয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



