দেশজুড়ে পরীক্ষা-দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে তরুণদের আন্দোলন, সমাজমাধ্যমে বিজেপির ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়া এবং উত্তরপ্রদেশ-পঞ্জাব-সহ একাধিক রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন—এই তিনটি চাপকে সামনে রেখেই দলের সংগঠনে বড়সড় রদবদল করলেন বিজেপির নতুন সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন। তাঁর নতুন দলে যেমন স্মৃতি ইরানি ও রাম মাধবের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, তেমনই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ও সমাজমাধ্যম বিভাগের প্রধান অমিত মালব্যকে। বদল এসেছে ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার নেতৃত্বেও।

দলীয় সূত্রের ব্যাখ্যা, এই রদবদলকে নিছক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সাম্প্রতিক যুব-বিক্ষোভের মোকাবিলায় বিজেপির সংগঠন এবং প্রচারযন্ত্র যে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি, নতুন দল গঠনের মধ্যে তার পরোক্ষ স্বীকৃতিও রয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে দেশের বিভিন্ন শহরে বিপুল সংখ্যক তরুণ পথে নেমেছিলেন। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়। একই সঙ্গে সমাজমাধ্যমে সিজেপি অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অনুসারী তৈরি করে ইনস্টাগ্রামে বিজেপি ও কংগ্রেস—দুই দলকেই পিছনে ফেলে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি ও সমাজমাধ্যম বিভাগের প্রধানের পদ থেকে অমিত মালব্যের অপসারণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন তালিকায় বিভাগের নামও শুধু ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ রাখা হয়েছে। দলীয় নেতাদের একাংশের মতে, বিতর্কিত হয়ে ওঠা কয়েকজনকে আপাতত আড়ালে সরিয়ে রাখার কৌশল নিয়েছে দল। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির ডিজিটাল প্রচারের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন মালব্য। কিন্তু তরুণদের ক্ষোভ এবং প্রতিবাদীদের বক্তব্যের পাল্টা বিশ্বাসযোগ্য ভাষ্য তৈরি করতে তাঁর বিভাগ ব্যর্থ হয়েছে বলে দলের ভিতরে অভিযোগ উঠেছিল।

একই কারণে ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার সভাপতি পদে তেজস্বী সূর্যের পরিবর্তে হেমাঙ্গ যোশীকে আনা হয়েছে। বিজেপি নেতৃত্বের মূল্যায়ন, দেশের ‘জেন জি’ বা নবীনতম ভোটার প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে যুব মোর্চা সফল হয়নি। শহরে শহরে আন্দোলনের বিস্তার এবং অনলাইনে প্রতিবাদীদের দ্রুত জনসমর্থন লাভ সেই সাংগঠনিক দুর্বলতাকেই প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে।

নতুন দলে সবচেয়ে আলোচিত নাম স্মৃতি ইরানি। তাঁকে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করা শুধু রাজনৈতিক পুনর্বাসন নয়; উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী প্রচারে বিজেপির আক্রমণাত্মক শক্তি বাড়ানোর পরিকল্পনাও এর মধ্যে রয়েছে। ২০২৪ সালে অমেঠী থেকে পরাজিত হওয়ার পরে স্মৃতি মন্ত্রিসভা এবং দলের সামনের সারি—দুই জায়গা থেকেই কার্যত ছিটকে গিয়েছিলেন। অথচ মহিলা মোর্চার সভানেত্রী ও জাতীয় সম্পাদক থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়ে ওঠা স্মৃতি এক সময় নতুন মাধ্যমে বিজেপির অন্যতম তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ছিলেন। বিশেষ করে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে তাঁর আক্রমণাত্মক প্রচারের পরিচিতি রয়েছে। যুবসমাজের সমস্যা নিয়ে রাহুল এখন আরও সক্রিয় হওয়ায় স্মৃতির প্রত্যাবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ।

দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের পরে রাম মাধবকে সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি করা হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি ও নির্বাচনী কৌশল বাস্তবায়নে তাঁর দক্ষতা অতীতে প্রমাণিত। ফলে স্মৃতি ও মাধবের প্রত্যাবর্তন বুঝিয়ে দিচ্ছে, নবীন মুখকে সামনে রাখলেও বিজেপি আপাতত অভিজ্ঞ সাংগঠনিক নেতাদের উপরেই বেশি ভরসা করছে।

নবীনের আটজন সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে পুরনো দল থেকে শুধু বিনোদ তাওড়ে ও সুনীল বনসল পদ ধরে রেখেছেন। নবীনের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত স্বদেশ সিংহ ও সিদ্ধার্থ শম্ভুকে জাতীয় সম্পাদক করা হয়েছে। বিহারের শিবেশ কুমার রাম হয়েছেন তফসিলি জাতি মোর্চার সভাপতি। আপ থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া সন্দীপ পাঠক এবং কংগ্রেসত্যাগী রোহন গুপ্তও জাতীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন। অর্থাৎ, নিজস্ব অনুগামী এবং অন্য দল থেকে আসা নেতাদের জায়গা দিয়ে নবীন তাঁর ব্যক্তিগত সাংগঠনিক ছাপও স্পষ্ট করেছেন।

তবে নতুন তালিকার কয়েকটি ঘাটতি ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে। আটজন সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কোনও দলিত মুখ নেই। বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য জানিয়েছে, পরে আরও নিয়োগ হতে পারে। সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি দায়িত্ব নেওয়ার পরেও দলে তরুণদের জন্য আলাদা কোনও বিশেষ অগ্রাধিকার দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ সম্পাদকদের অধিকাংশই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ সংগঠক।

আসন্ন নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে উত্তরপ্রদেশ ও পঞ্জাব থেকে প্রায় ছ’জন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে নেওয়া হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের রেখা বর্মা, তারিক মনজুর, সংখ্যালঘু মোর্চার দায়িত্বপ্রাপ্ত কুনওয়ার বাসিত আলি এবং ওবিসি নেতা অমরপাল মৌর্য নতুন দলে রয়েছেন। পঞ্জাব থেকে জায়গা পেয়েছেন মনপ্রীত বাদল এবং প্রাক্তন আপ সাংসদ সন্দীপ পাঠক।

বিপরীতে, দক্ষিণ ভারতে কংগ্রেসের প্রভাব বৃদ্ধির পরেও নবীনের দলে ওই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব সীমিত—মাত্র ছ’জন। তেলঙ্গানা থেকে কাউকেই নেওয়া হয়নি। ফলে রদবদলে ‘নতুন দিশা’র বার্তা থাকলেও দক্ষিণ ভারত, দলিত প্রতিনিধিত্ব এবং তরুণ নেতৃত্বের প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেল। আপাতত স্পষ্ট, বিজেপি ২০২৯-এর নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণ করতে চাইছে; কিন্তু সেই পথে এগোতে তার প্রধান ভরসা এখনও পরীক্ষিত পুরনো মুখ।