খবর

সৌদি মরুভূমির আকাশে ৩৭ সেকেন্ড: ছুরিকাঘাত, ভয়াবহ পতন, তারপর উদ্ধার

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • সেই সময়েই ১৪,৩০০ ফুট উচ্চতা হারাল দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩।
  • ৩০ সেপ্টেম্বরের সেই উড়ানে ভারতীয় ক্যাপ্টেনকে তাঁর সহকারী পাইলট ছুরি মারেন বলে অভিযোগ।
  • তার পর বিপজ্জনক পতন, জরুরি সংকেত, জর্ডনের আকাশসীমায় ঢুকে আবার ঘুরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুকে অবতরণ।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

সৌদি মরুভূমির আকাশে মাত্র ৩৭ সেকেন্ড। সেই সময়েই ১৪,৩০০ ফুট উচ্চতা হারাল দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩। ৩০ সেপ্টেম্বরের সেই উড়ানে ভারতীয় ক্যাপ্টেনকে তাঁর সহকারী পাইলট ছুরি মারেন বলে অভিযোগ। তার পর বিপজ্জনক পতন, জরুরি সংকেত, জর্ডনের আকাশসীমায় ঢুকে আবার ঘুরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুকে অবতরণ।

হিন্দুস্তান টাইমসের অনুসন্ধান এবং বিমানটির প্রকাশ্য উড়ানতথ্য মিলিয়ে ফুটে উঠছে মাঝআকাশে প্রায় চার ঘণ্টার সেই সংকটের ঘটনাক্রম। নিচের সময়গুলি সৌদি আরবের স্থানীয় সময় অনুযায়ী।

উড়ান শুরু

সকাল ৬টা ৫ মিনিট। দুবাইয়ে তখন ৭টা ৫। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটি। গন্তব্য ইজরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর। এয়ারন্যাভ রাডারের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটির নিবন্ধন নম্বর এ৬-এফকেএফ।

উড়ানের প্রথম পর্বে অস্বাভাবিকতার কোনও উল্লেখ নেই। বিমানটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছয়। এই উচ্চতা থেকেই পরে শুরু হয় দ্রুত অবতরণ।

৩৭ সেকেন্ডে ১৪,৩০০ ফুট

সকাল ৮টা ২১ মিনিট। ফ্লাইটরাডার২৪-এর নথিতে শুরু হয় তীব্র উচ্চতা হারানোর পর্ব। তবে সেটি একবার নেমেই স্থির হয়ে যায়নি। বিমানটি আবার ওপরে ওঠে, পরে দ্বিতীয় বারও নেমে আসে।

এইচটি-র ব্যবহৃত রেকর্ড অনুযায়ী, সকাল ৮টা ২১ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে বিমানটির উচ্চতা ছিল ৩৩,২২৫ ফুট। মাত্র ৩৭ সেকেন্ড পরে, ৮টা ২২ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে তা নেমে দাঁড়ায় ১৮,৯২৫ ফুটে। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে উচ্চতা কমে যায় ১৪,৩০০ ফুট।

দুই মাপের মাঝখানে প্রকাশ্য তথ্য নেই। ৮টা ২২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে বিমানটি ১৬,৬০০ ফুটে নেমে যাওয়ার পর আবার উঠে যায় ২১,৭২৫ ফুটে। পরে দ্বিতীয় পতনে ৮টা ২৭ মিনিট নাগাদ উচ্চতা দাঁড়ায় ১৩,৬৭৫ ফুটে।

এডিএস-বি এক্সচেঞ্জের রিসিভারে সকাল ৮টা ২২ মিনিট ১৩ সেকেন্ড থেকে ৮টা ৩১ মিনিট ২৮ সেকেন্ড পর্যন্ত বিমানটির অবস্থান ধরা পড়েনি। ফলে প্রকাশ্যে পাওয়া গতিপথে ওই সময়টুকুতে ফাঁক রয়েছে। তবে এটিকে বিমান থেকে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ বলা যায় না।

ককপিটে তখন কী?

বিমান যখন এ ভাবে ওঠানামা করছে, ককপিটে ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে তীব্র সংঘর্ষ—এমনটাই উঠে এসেছে যাত্রীদের বয়ান এবং ইজরায়েলি কর্তাদের বক্তব্যে।

রয়টার্সকে যাত্রী আলমগ ইতালি জানান, প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল বিমানটি প্রবল বায়ুক্ষোভে পড়েছে। এক বার নিচে নামার পর বিমানটি সামলে উঠছিল, তার পর আবার নেমে যাচ্ছিল। এর মধ্যেই তিনি সামনের দিকে যাত্রীদের ছুটতে এবং ককপিটের সামনে হইচই করতে দেখেন।

ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, রক্তাক্ত ক্যাপ্টেন মেঝেতে পড়ে থেকেও ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এর পর যাত্রীরা ভিতরে ঢুকে অভিযুক্তকে কাবু করেন।

তবে দরজা ঠিক কখন খোলা হয়েছিল বা অভিযুক্তকে কখন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়, তা প্রকাশ্য উড়ানতথ্য থেকে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

৭৭০০ থেকে ৭৫০০

সকাল ৮টা ২৮ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড। এয়ারন্যাভ রাডারের রেকর্ড অনুযায়ী, বিমান থেকে ‘৭৭০০’ সংকেত পাঠানো শুরু হয়। এটি আন্তর্জাতিকভাবে সাধারণ জরুরি পরিস্থিতির সংকেত।

প্রায় ছয় মিনিট পরে, ৮টা ৩৫ মিনিট নাগাদ, সংকেত বদলে যায় ‘৭৫০০’-এ। এই কোড বেআইনি হস্তক্ষেপের সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং বিমান ছিনতাইয়ের ক্ষেত্রেও তা পাঠানো হতে পারে।

ফলে প্রথম দিকে বিমান ছিনতাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক ছিল। তবে এই সংকেত নিজে থেকে ককপিটে ঠিক কী ঘটেছে বা ঘটনার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা প্রমাণ করে না।

জর্ডনে ঢুকে আবার ঘুরল

সকাল ৮টা ৩৩ মিনিট নাগাদ বিমানটির উচ্চতা প্রায় ১৫ হাজার ফুটের আশপাশে নেমে আসে বলে ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য। এর পরও উচ্চতা ও গতির তারতম্য চলতে থাকে।

বিমানটি পশ্চিম দিকে ঘুরে কিছু সময়ের জন্য জর্ডনের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ে। তার পর প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে আবার সৌদি আরবের দিকে ফিরে আসে।

ততক্ষণে গন্তব্য বদলে গিয়েছে। তেল আভিভ নয়, লক্ষ্য তাবুক—বিমানটিকে যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদে নামানোর চেষ্টা চলছে।

দরজাই হল বড় বাধা

সকাল ৮টা ৪৪ মিনিটে তাবুক বিমানবন্দর বিপৎসংকেত পাওয়ার কথা জানায়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এই সময়টির উল্লেখ রয়েছে।

আহত ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা খুলে দিতে পারায় যাত্রীরা ভিতরে ঢোকার সুযোগ পান। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য সাধারণত যে দরজাটি বন্ধ থাকে, সেই দরজাই তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

দরজা খোলার পর বিমানে থাকা অন্য কর্মীরা ককপিটে ঢুকে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ পান।

শেষে তাবুকে

সকাল ৯টা ৫৮ মিনিট নাগাদ তাবুকে বিমানটির নিরাপদ অবতরণের তথ্য পাওয়া যায়। এয়ারন্যাভ রাডার এবং ফ্লাইটরাডার২৪—দুই উৎসের শেষ পাওয়া সংকেতও সেই সময়ের কাছাকাছি।

তাবুকের কাছে পৌঁছনোর সময় ট্রান্সপন্ডারের সংকেত ফের ‘৭৭০০’ হয়। ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, বিমানে থাকা সংস্থার কর্তব্যরত কর্মীরাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে বিমানটি অবতরণ করান।

যাত্রী ও কর্মীদের সরিয়ে আনতে পরে দুটি বিকল্প বিমান পাঠানো হয়।

ক্যাপ্টেন কে?

আহত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছর মুম্বইয়ের বাসিন্দা। হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, অস্ত্রোপচারের পর তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল।

প্রায় ১১ বছর স্পাইসজেটে কাজ করার পর ২০২২ সালের জুনে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন তিনি। প্রকাশ্য পেশাগত তথ্য অনুযায়ী, বোয়িং ৭৩৭ চালানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। স্পাইসজেটে অন্য পাইলটদের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের দায়িত্বও সামলেছেন।

তাঁর পেশাগত পরিচিতি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বোয়িং মডেলগুলিতে তাঁর মোট উড়ান-অভিজ্ঞতা ছিল প্রায় ৯,৭৫০ ঘণ্টা।

ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও আহত অবস্থায় ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার জন্য তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।

উত্তর এখনও বাকি

তবে মাঝআকাশে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হল, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনও মেলেনি।

ফ্লাইদুবাই ককপিটে সংঘর্ষের ঘটনা স্বীকার করলেও আগাম কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর বিষয়ে সতর্ক করেছে। তদন্ত চলাকালীন ইজরায়েলগামী এবং ইজরায়েল থেকে আসা উড়ান সাময়িক বন্ধ রাখার কথাও জানিয়েছে সংস্থা।

প্রকাশ্য উড়ানতথ্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিমানটি ভয়াবহ ওঠানামার মধ্যে পড়েছিল। কিন্তু ককপিটের ভিতরে সংঘর্ষের সম্পূর্ণ ঘটনাক্রম, তার কারণ এবং অভিযুক্ত সহকারী পাইলটের উদ্দেশ্য জানতে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles