টানা ২৪ দিনের ছাত্র-আন্দোলন, অনশন এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত অবস্থান বদল করল ঝাড়খণ্ড সরকার। সোমবার বিশেষ মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ঘোষণা করেন, জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষার ফল এবং তার ভিত্তিতে হওয়া সমস্ত নিয়োগ বাতিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা টিএসআর ডেটা প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেড বা টিডিপিএল-এর নেওয়া সমস্ত পরীক্ষা, প্রকাশিত ফল এবং নিয়োগও বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে রাজ্য সরকারের পরিচালিত বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় ছোট-বড় যত অনিয়ম ও ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে, তারও সামগ্রিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল বা জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষাটি রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরের গ্রুপ বি এবং গ্রুপ সি পদের জন্য নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরে নিয়মিত ও বকেয়া শূন্যপদের জন্য প্রায় ৬ লক্ষ ৪০ হাজার প্রার্থী আবেদন করেন। পরীক্ষাটি প্রথমে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হওয়ার কথা থাকলেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে তা বাতিল করা হয়। পরে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল।

সেই পরীক্ষার ভিত্তিতে ইতিমধ্যে প্রায় ১,৯৭৫ জন কাজে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই প্রায় নয় মাস ধরে চাকরি করছেন। ফলে সরকারের সিদ্ধান্তে আন্দোলনকারীদের একাংশ উৎসবে মেতে উঠলেও নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে চাকরিপ্রাপ্তদের মধ্যে। সোমবার রাতেই চাকরি হারানোর আশঙ্কায় একদল প্রার্থী রাঁচির প্রজেক্ট ভবনের বাইরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের বক্তব্য, পরীক্ষা পরিচালনা বা নিয়োগে অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় কর্তৃপক্ষের; কোনও অপরাধ না করেও বৈধ ভাবে চাকরি পাওয়া কর্মীদের শাস্তি দেওয়া অন্যায়। গভীর রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ চলায় সেখানে নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করে প্রশাসন।

বিশেষ মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে হেমন্ত বলেন, চলতি তদন্তে উঠে আসা তথ্য পর্যালোচনা করেই সিজিএল পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, ওই পরীক্ষার মাধ্যমে নিযুক্ত কয়েকজন প্রার্থী পরে জেপিএসসি নিয়োগে অনিয়মের মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন। পরীক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যুক্ত কয়েকটি সংস্থার ভূমিকাও সন্দেহের বাইরে নয়। প্রাথমিক তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ভুল নয়, এর পিছনে বৃহত্তর কোনও চক্র কাজ করে থাকতে পারে।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ চলতি মাসের গোড়াতেও প্রশাসন জানিয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টের নজরদারিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া চলায় জেএসএসসি-সিজিএল ফল বাতিল করা সম্ভব নয়। আন্দোলনের বিস্তার, অনশনকারীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং রাজনৈতিক চাপ বাড়ার পরে সেই অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ সরে এল সোরেন সরকার।

তবে আন্দোলন এখনও প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। ছাত্রনেতা রবীন্দ্র পাসোয়ান বলেন, “আমরা একটি বড় লড়াই জিতেছি। ২৪ দিন পরে মুখ্যমন্ত্রী আমাদের দাবি শুনেছেন, তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ। কিন্তু সিবিআই তদন্তের নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আমাদের অনশন চলবে।” আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কেবল পরীক্ষা বাতিল করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দুর্নীতির গোটা চক্র, প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা এবং প্রশাসনের ভিতরে তাদের সহযোগীদের চিহ্নিত করতে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।

নিয়োগ ও পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য আইএএস আধিকারিক অমিতাভ কৌশলের নেতৃত্বে একটি কমিটি গড়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, পড়ুয়া এবং অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে এই কমিটি ভবিষ্যতের পরীক্ষা ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ করার প্রস্তাব দেবে। সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়ার জন্য একটি বিশেষ পোর্টালও চালু করা হয়েছে।

সোরেনের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই জোটসঙ্গী কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী তাঁকে চিঠি লিখে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। রাহুল লেখেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার ভারতের গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ এবং তাঁদের দাবিগুলিও ন্যায্য। সরকার কয়েকটি দাবি মেনে নিলেও অনশন চলতে থাকায় মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

চিঠিতে রাহুল আরএসএস ও বিজেপির বিরুদ্ধেও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ছাত্রদের শোষণের হাতিয়ার করে তোলার অভিযোগ করেন। তবে জেএমএম-শাসিত ঝাড়খণ্ডে নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধেই ছাত্রবিক্ষোভ চলায় কংগ্রেস রাজনৈতিক অস্বস্তিতে পড়েছিল। এআইসিসি-র ঝাড়খণ্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা কে রাজু স্বীকার করেছেন, আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ কংগ্রেসকে জেএমএম সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছিলেন। সেই কারণেই রাহুলের চিঠি প্রকাশ্যে আনা হয়—ছাত্রদের বোঝাতে যে কংগ্রেস তাঁদের বিপক্ষে নয়।

সিজিএল বাতিলের সিদ্ধান্ত আপাতত আন্দোলনকারীদের বড় জয়। কিন্তু সিবিআই তদন্তের দাবি এবং চাকরিপ্রাপ্তদের পাল্টা প্রতিবাদ—এই দুই চাপের মধ্যে ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ-বিতর্ক এখনও শেষ হওয়ার বদলে নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করল।