হাইলাইটস:
- প্রচণ্ড গরমে মানসিক রোগের উপসর্গ অনেক বেশি তীব্র হয়ে ওঠে।
- অ্যান্টিসাইকোটিক, অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ও লিথিয়ামের মতো ওষুধ শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
- ফ্রান্সে গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের সময় মানসিক জরুরি বিভাগের রোগী বেড়েছে ৭ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত।
- গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে আত্মহত্যার হার গড়ে ১.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
- বিশেষজ্ঞদের দাবি, তাপপ্রবাহ মোকাবিলার সরকারি পরিকল্পনায় মানসিক স্বাস্থ্যকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্যারিস: প্রচণ্ড গরম শুধু শারীরিক কষ্টই বাড়ায় না, মানসিক রোগে ভোগা মানুষের জন্য তা হয়ে উঠতে পারে এক নীরব বিপর্যয়। উদ্বেগ, অবসাদ, মানসিক বিভ্রান্তি, এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও বেড়ে যেতে পারে—এমনই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন ফ্রান্সের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।প্যারিসের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় আসা ৪৪ বছরের ম্যাথিউ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানান, অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ খাওয়ার পর থেকে গরম সহ্য করার ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। তাপপ্রবাহের সময় তাঁর মনে হয় যেন শ্বাস নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন নেই। সূর্যের আলোও অসহ্য লাগে।
স্বেচ্ছাসেবীরা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড গরমে অনেক মানসিক রোগী ঘর থেকেই বেরোতে চান না। আবার সংবাদমাধ্যমে তাপপ্রবাহের খবরের ধারাবাহিক প্রচারও তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক অবসাদ গভীরতর হয়। একসময় উদ্বেগ ও অবসাদে ভোগা, বর্তমানে সুস্থ হয়ে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করা মেরিয়েম বলেন, গরমের সময় তাঁর অসুস্থতা বহুগুণ বেড়ে যেত। সামান্য নড়াচড়াতেই মনে হত শরীরের ওপর ভারী বোঝা চাপানো হয়েছে। নেতিবাচক চিন্তা, চরম উদাসীনতা এবং গভীর হতাশা তখন দৈনন্দিন সঙ্গী হয়ে উঠত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মানসিক রোগের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এই সময়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অ্যান্টিসাইকোটিক, অবসাদরোধী ও উদ্বেগনাশক ওষুধ অনেক ক্ষেত্রে সূর্যালোকের প্রতি অতিসংবেদনশীলতা তৈরি করে। আবার দ্বিমেরু মানসিক ব্যাধির চিকিৎসায় ব্যবহৃত লিথিয়াম শরীরে পানিশূন্যতা বাড়লে রক্তে অতিরিক্ত জমে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে পর্যাপ্ত পানি পান এবং ঠান্ডা পরিবেশে থাকা এই রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিমেরু মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ক্যামিল কলম্ব জানান, গরমের সময় লিথিয়ামের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হাত কাঁপা ও স্মৃতিশক্তির সমস্যা বেড়ে যায়। তবুও তিনি নিজেকে একঘরে না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করেন, কারণ দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা আবার নতুন করে অসুস্থতা ডেকে আনতে পারে।
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের তাপপ্রবাহের সময় মনোরোগ সংক্রান্ত জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মনোবিকারের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৭ শতাংশ এবং স্মৃতিভ্রংশজনিত সমস্যায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মারিন আকাউই বলেন, তাপপ্রবাহ অনেক সময় আগে থেকেই থাকা মানসিক দুর্বলতাকে বিস্ফোরণের পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিশেষ করে দারিদ্র্য, একাকিত্ব বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে গরম যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই তাপপ্রবাহ শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর মানসিক বিপর্যয়ের ঢেউ দেখা যায়।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গবেষণায়। দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত ২০২৩ সালের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গড় দৈনিক তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে আত্মহত্যার হার গড়ে ১.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের দাবি, তাপপ্রবাহ মোকাবিলার সরকারি কর্মসূচিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। শুধু তাপঘাত বা পানিশূন্যতা নয়, উদ্বেগ, অবসাদ ও মানসিক সংকটে থাকা মানুষদের জন্যও বিশেষ সহায়তা ও পরামর্শব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।