হরমুজে থমকে জাহাজ, চিন্তায় ভারত

যা জানা জরুরি
- হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় ড্রোন হামলায় দু’টি বাণিজ্যিক জাহাজ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) হামলার কথা নিশ্চিত করলেও জাহাজ দু’টির পরিচয় প্রকাশ করেনি।
- বিভিন্ন প্রতিবেদনে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, হামলার শিকার জাহাজ দু’টি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা অ্যাডনকের ট্যাঙ্কার হতে পারে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় ড্রোন হামলায় দু’টি বাণিজ্যিক জাহাজ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) হামলার কথা নিশ্চিত করলেও জাহাজ দু’টির পরিচয় প্রকাশ করেনি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, হামলার শিকার জাহাজ দু’টি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা অ্যাডনকের ট্যাঙ্কার হতে পারে।
এই ঘটনার পর শুক্রবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণপথে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের উপরও। কাতার থেকে ভারতের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতে ইতিমধ্যেই ধাক্কা লেগেছে।
ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা করেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিদেশ মন্ত্রক। তাদের অভিযোগ, এই হামলা রাষ্ট্রপুঞ্জ স্বীকৃত নৌচলাচলের স্বাধীনতার নীতির ‘নির্লজ্জ লঙ্ঘন’। আবু ধাবির দাবি, ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস হরমুজ প্রণালীকে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং অন্য দেশকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
আমিরশাহির বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে নিশানা করা এবং হরমুজকে অর্থনৈতিক জবরদস্তির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাদের মতে, এই তৎপরতা শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য নয়, গোটা বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্যও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করছে। বৃহস্পতিবার মাত্র ন’টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছিল, বুধবার সংখ্যাটি ছিল পাঁচ। অগস্টে এই পথে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২টি জাহাজ চলাচল করেছে। কিন্তু শুক্রবার সকালে কোনও জাহাজকেই প্রণালী পার হতে দেখা যায়নি। অবশ্য নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু জাহাজ স্বয়ংক্রিয় পরিচয়জ্ঞাপক ব্যবস্থা বন্ধ রেখে চলাচল করে থাকতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে পতনের মাত্রা আরও স্পষ্ট। ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন ১৩০টিরও বেশি জাহাজ হরমুজ পার হত। এখন সেই চলাচল প্রায় শূন্যে নেমে আসায় তেল, গ্যাস এবং আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থা বড় অনিশ্চয়তার মুখে।
জুনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর ইরান ফের জাহাজে হামলা শুরু করেছে। তেহরানের অভিযোগ, অনুমতি না নিয়েই বেশ কিছু জাহাজ হরমুজ ব্যবহার করছে। ইরানের দাবি, তাদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না। সেই শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের উপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা।
অন্য দিকে, আমেরিকাও চাপ বাড়ানোর বার্তা দিয়েছে। পানামা সফরের সময় মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ জানান, প্রয়োজন হলে মার্কিন নৌবাহিনী দীর্ঘ সময় উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করতে এবং ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ বজায় রাখতে সক্ষম। নিয়মিত ভাবে যুদ্ধজাহাজ ও নৌসেনা বদলে এই উপস্থিতি দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্টও ইরানের অর্থনীতির উপর আরও কঠোর চাপ তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর দাবি, আগামী সপ্তাহেই নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করা হতে পারে। ইরানকে অর্থনৈতিক ভাবে বিচ্ছিন্ন করতে নজিরবিহীন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একাধিক বার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করার হুমকি দিয়েছেন। তবে চলতি সপ্তাহে তাঁর বক্তব্যে কিছুটা বদল দেখা গেছে। সরাসরি সামরিক অভিযান বাড়ানোর বদলে আপাতত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক চাপের উপর বেশি জোর দেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
ভারতের জন্য বিপদ কোথায়?
হরমুজের অচলাবস্থা ভারতের কাছে বিশেষ উদ্বেগের কারণ। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ ইতিমধ্যেই ব্যাহত হয়েছে। পেট্রোনেট এলএনজি জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত চালানগুলি কবে ভারতে পৌঁছবে, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। কাতার ‘ফোর্স ম্যাজর’ ঘোষণা করায় এখনও পর্যন্ত ৫৬টি এলএনজি চালান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঘাটতি সামাল দিতে আমেরিকা, ওমান, নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলার মতো বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে ভারত। কিন্তু দূরের দেশ থেকে দ্রুত এলএনজি কিনতে গেলে বাড়বে পরিবহণ ও আমদানি খরচ। তার প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার শিল্প, নগর গ্যাস এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে।
হরমুজে অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হলে শুধু অপরিশোধিত তেলের দামই নয়, ভারতের পেট্রল-ডিজেল, রান্নার গ্যাস এবং পরিবহণ খরচেও চাপ বাড়তে পারে। ফলে দু’টি জাহাজে ড্রোন হামলা আপাতদৃষ্টিতে সীমিত ঘটনা হলেও তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভারতের জ্বালানি বাজারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



