Home খবর বিজেপির গড়ে ধাক্কা, বিধানসভায় প্রশান্ত

বিজেপির গড়ে ধাক্কা, বিধানসভায় প্রশান্ত

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
14 views 4 minutes read
A+A-
Reset

ব্যাঙ্কিপুরে ১৯ হাজারের ব্যবধানে জন সুরাজের জয়, তৃতীয় আরজেডি—বিহারে কি খুলছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের দরজা?

পাটনার ব্যাঙ্কিপুরে যা ঘটল, তা নিছক একটি উপনির্বাচনের ফল নয়। বিজেপির দীর্ঘদিনের ‘নিরাপদ দুর্গে’ ধস নামিয়ে বিধানসভায় পা রাখলেন জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর। ৬৪,১৫১ ভোট পেয়ে বিজেপির নীরজ কুমার সিনহাকে ১৯,৩২৪ ভোটে হারিয়েছেন তিনি। নীরজ পেয়েছেন ৪৪,৮২৭ ভোট। আরজেডির রেখা কুমারী গুপ্তা থেমেছেন মাত্র ১৪,২৭৩ ভোটে।

ফলাফল তাই একদিকে বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা, অন্যদিকে প্রশান্ত কিশোরের জন্য রাজনৈতিক স্বীকৃতির বড় পরীক্ষা পাস। আরজেডির তৃতীয় স্থানে নেমে যাওয়া আরও একটি বার্তা দিচ্ছে—বিহারের রাজনীতি হয়তো ধীরে ধীরে চেনা দ্বিমেরু ছক ছাড়িয়ে নতুন সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে।

দুর্গে ফাটল

ব্যাঙ্কিপুর বহু বছর ধরেই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। ২০০৮ সালের সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর থেকে এই আসনে বিজেপি কখনও হারেনি। গত কয়েকটি নির্বাচনে দলটির ভোটও ছিল ৬০ শতাংশের বেশি।

পাটনা শহরের মধ্যবিত্ত, উচ্চবর্ণ, ব্যবসায়ী এবং শিক্ষিত ভোটারদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির পাশে থেকেছেন। ফলে এমন একটি আসনে প্রশান্ত কিশোরের জয় স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি তাৎপর্য বহন করছে।

এই ফল কি বিজেপির শহুরে ভোটব্যাঙ্কে ফাটলের ইঙ্গিত? আপাতত নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু প্রশ্নটা যে জোরালো হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

‘কৌশলবিদ’ থেকে বিধায়ক

প্রশান্ত কিশোরের জন্য এই জয় নিছক নির্বাচনী সাফল্য নয়, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যাত্রারও বড় বাঁক।

একসময় ভোটের কৌশল সাজানোই ছিল তাঁর পরিচয়। পরে নিজেই রাজনৈতিক দল গড়ে মাঠে নামেন। তখন বিরোধীদের প্রশ্ন ছিল—ভোটের অঙ্ক বোঝা আর নিজে ভোটে জেতা কি এক জিনিস?

ব্যাঙ্কিপুরের ফল সেই প্রশ্নের আপাতত জবাব দিয়ে দিল।

প্রথমবার বিধানসভায় প্রবেশ করতে চলেছেন প্রশান্ত কিশোর। ফলে জন সুরাজও আর শুধুমাত্র বিকল্প রাজনীতির প্রচারমঞ্চ নয়; এবার বিহার বিধানসভায় তাদের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব তৈরি হল।

ফল ঘোষণার পর প্রশান্ত কিশোরও জয়ের কৃতিত্ব নিজের মধ্যে আটকে রাখেননি। তাঁর বক্তব্য, এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জয় নয়, ব্যাঙ্কিপুরের মানুষের জয়। ভোট দিয়েছেন বা দেননি—সবাইয়ের প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

বিজেপির ধাক্কা কেন?

একটি কারণ দিয়ে এই ফল ব্যাখ্যা করা কঠিন। একাধিক ফ্যাক্টর একসঙ্গে কাজ করেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

প্রথমত, বিজেপি নিজেদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্কের পুরোটা ধরে রাখতে পারেনি। শহুরে শিক্ষিত ভোটারদের একাংশ এবার পরিবর্তনের পক্ষে গিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, প্রশান্ত কিশোরের দীর্ঘদিনের জনসংযোগও বড় ভূমিকা নিয়েছে। বিহারের গ্রাম থেকে শহর—বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে জন সুরাজের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। সেই প্রচারের রাজনৈতিক লাভ ব্যাঙ্কিপুরেও মিলেছে।

তৃতীয়ত, প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং শাসনব্যবস্থার সংস্কারের মতো ইস্যুকে সামনে রেখে নিজেকে প্রচলিত রাজনৈতিক শিবিরের বাইরে একটি বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রশান্ত কিশোর।

চতুর্থত, উপনির্বাচনে ভোটারদের স্বাভাবিক অনীহাও বিজেপির জন্য সমস্যা হয়ে থাকতে পারে। সেই তুলনায় জন সুরাজের কর্মীরা ভোটারদের বুথমুখী করতে বেশি সক্রিয় ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে।

আরজেডিরও স্বস্তি নেই

বিজেপির হার মানেই যে আরজেডির লাভ—ব্যাঙ্কিপুরের ফল সেই পুরনো সমীকরণেও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

প্রধান বিরোধী দল হয়েও মাত্র ১৪,২৭৩ ভোট নিয়ে তৃতীয় স্থানে শেষ করেছে আরজেডি। অর্থাৎ বিজেপির ভোট ক্ষয় হলেও তার বড় অংশ সরাসরি আরজেডির ঘরে যায়নি।

বরং সেই জায়গায় উঠে এসেছে জন সুরাজ।

ফলে বিহারের রাজনীতিতে বিজেপি বনাম আরজেডির চেনা দ্বিমুখী লড়াইয়ের বাইরে তৃতীয় শক্তির সম্ভাবনা আরও জোরালো হল।

ভোটের অঙ্কে নতুন হিসাব?

উপনির্বাচনের ফলকে সরাসরি সাধারণ নির্বাচনের পূর্বাভাস বলা ঠিক হবে না। স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থী, প্রচারের ধরন এবং ভোটদানের হার—সবই এখানে আলাদা প্রভাব ফেলে।

তবু ব্যাঙ্কিপুরের ফলকে একেবারে হালকা করে দেখারও সুযোগ নেই।

বিজেপির জন্য বার্তাটা স্পষ্ট—শহুরে মধ্যবিত্ত ভোটারদের সমর্থন চিরস্থায়ী ধরে নেওয়ার সময় হয়তো শেষ। অন্যদিকে প্রশান্ত কিশোরের জন্য এই জয় তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার বড় পরীক্ষা পাস করার মতো।

এতদিন তিনি ছিলেন ভোটের ‘কিংমেকার’। এবার নিজেই ভোটের ময়দানে জিতে বিধানসভায়।

সামনে কঠিন পরীক্ষা

জয় যত বড়, দায়িত্বও ততটাই বড়।

প্রশান্ত কিশোরের সামনে এখন প্রধানত দুটি চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, বিধায়ক হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করে ব্যাঙ্কিপুরের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। দ্বিতীয়ত, এই জয়কে কাজে লাগিয়ে জন সুরাজের সংগঠনকে বিহারের অন্য প্রান্তেও ছড়িয়ে দেওয়া।

বিজেপির সামনেও কম কঠিন পরীক্ষা নেই। ব্যাঙ্কিপুরের হারকে নিছক উপনির্বাচনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হতে পারে। দলের শহুরে ভোটারদের মধ্যে কোথায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, কোন ইস্যুতে ভোট সরে গেল—তার খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ জরুরি।

ব্যাঙ্কিপুরের বার্তা

একটি আসনের ফল কখনও কখনও তার চেয়েও বড় গল্প বলে।

ব্যাঙ্কিপুরে বিজেপির দীর্ঘদিনের দখল ভেঙে প্রশান্ত কিশোরের জয় অন্তত সেই গল্পটাই বলছে—বিহারের রাজনৈতিক মাঠে নতুন খেলোয়াড়ের জন্য জায়গা তৈরি হয়েছে।

বিজেপির দুর্গে ফাটল ধরেছে, আরজেডি সেই ফাটল দিয়ে ঢুকতে পারেনি। বরং মাঝখান থেকে উঠে এসেছে জন সুরাজ।

এখন আসল প্রশ্ন একটাই—ব্যাঙ্কিপুর কি কেবল ব্যতিক্রম, নাকি বিহারের রাজনীতিতে সত্যিই নতুন সমীকরণের শুরু?

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles