গণতন্ত্রের সূচকে জরুরি অবস্থার ছায়া, ১৯৭৫-এর পর সর্বনিম্নে ভারত

যা জানা জরুরি
- সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের গণতন্ত্র সূচকে ভারতের অবস্থান নেমে গিয়েছে ১৯৭৫ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে।
- অর্থাৎ ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থার সময়ের পর ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রকে এত দুর্বল আর কখনও দেখায়নি এই আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
- একই সময়ে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটির উদ্বেগ ভি-ডেমের পর্যবেক্ষণকেই অন্য দিক থেকে সমর্থন…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের গণতন্ত্র সূচকে ভারতের অবস্থান নেমে গিয়েছে ১৯৭৫ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে। অর্থাৎ ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থার সময়ের পর ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রকে এত দুর্বল আর কখনও দেখায়নি এই আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। একই সময়ে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটির উদ্বেগ ভি-ডেমের পর্যবেক্ষণকেই অন্য দিক থেকে সমর্থন করছে।
ভি-ডেম বা ‘ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্র্যাসি’ কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে কি না, তার ভিত্তিতে কোনও দেশকে গণতান্ত্রিক বলে চিহ্নিত করে না। নির্বাচনের সততা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাতন্ত্র্য, বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনের কাজ করার সুযোগ, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সরকারের উপর আইনসভা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ—এই সমস্ত দিক পর্যালোচনা করে সূচক তৈরি করা হয়।
ভি-ডেমের ২০২৬ সালের গণতন্ত্র প্রতিবেদন ভারতকে আবারও ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। দেশে নিয়মিত নির্বাচন হয়, বহু দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং ভোটারদের অংশগ্রহণও বিপুল। কিন্তু ভি-ডেমের মতে, শুধু নির্বাচন থাকলেই পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি কতটা সমান, নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থা কতটা স্বাধীন, বিরোধী মত প্রকাশে কতটা বাধা রয়েছে এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠানগুলি কতটা কার্যকর—সেগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে ভারতের গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্র চিহ্নিত হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের স্বশাসন, বিচারবিভাগীয় জবাবদিহি, নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রশাসন, সংবাদমাধ্যমে সরকারের সমালোচনার সুযোগ, সাংবাদিকদের হয়রানি থেকে সুরক্ষা এবং নাগরিক সংগঠনের স্বাধীনতা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি অবনতির ইঙ্গিত রয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে ভি-ডেম বলছে ‘অটোক্র্যাটাইজেশন’ বা ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা।
সূচকটির ঐতিহাসিক তুলনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থায় মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়েছিল, বিরোধী নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং সংবাদমাধ্যমের উপর সরাসরি সেন্সরশিপ চাপানো হয়েছিল। বর্তমান ভারতে সেই ধরনের ঘোষিত জরুরি অবস্থা নেই। অথচ ভি-ডেমের হিসাবে নির্বাচনী গণতন্ত্রের মান সেই সময়ের কাছাকাছি নেমেছে। এর অর্থ সরাসরি জরুরি অবস্থার পুনরাবৃত্তি নয়; বরং নির্বাচিত সরকারের অধীনেই প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার অভিযোগ।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক এই মূল্যায়নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নিবিড় সংশোধনের পরে কয়েকটি রাজ্যে বিপুলসংখ্যক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে। অভিযোগ ওঠে, সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসী, পরিযায়ী শ্রমিক, দরিদ্র এবং প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে অক্ষম মানুষের উপর এর প্রভাব তুলনামূলক ভাবে বেশি পড়েছে। ভোটাধিকার প্রয়োগের আগে নাগরিককেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণের ভার বহন করতে হওয়ায় প্রক্রিয়াটি বৈষম্যমূলক হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
রাষ্ট্রপুঞ্জের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি ভারতের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী, তফসিলি জাতি ও উপজাতি এবং অ-নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। রোহিঙ্গা, বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম, পরিযায়ী ও আশ্রয়প্রার্থীদের লক্ষ্য করে পরিচয় যাচাই, আটক এবং বহিষ্কারের অভিযোগও কমিটির পর্যবেক্ষণে এসেছে। কমিটি বৈষম্যহীনতা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। তাই ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক বর্জনের অভিযোগকে নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ কমিয়ে দেয়।
অবশ্য ভি-ডেমের মূল্যায়ন নিয়ে ভারত সরকার বরাবরই আপত্তি জানিয়েছে। সরকারের বক্তব্য, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ধারণাভিত্তিক সূচক ভারতের বিপুল ভোটার অংশগ্রহণ, নিয়মিত ক্ষমতার পরিবর্তন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং প্রাণবন্ত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার যথাযথ প্রতিফলন ঘটায় না। ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্যও বৈধ ভোটারকে বাদ দেওয়া নয়, মৃত, স্থানান্তরিত বা নকল নাম সরানো।
কিন্তু মূল প্রশ্ন উদ্দেশ্য নয়, পরিণাম। একটি বৈধ ভোটও যদি পর্যাপ্ত শুনানি ও প্রতিকারের সুযোগ ছাড়া বাদ পড়ে, তা গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই আঘাত করে। ভি-ডেমের সূচক ও রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্বেগ একত্রে যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে তা হল—নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের অবাধে ভোট দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তাই গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



