ছেলেকে বকায় শিক্ষককে বেল্ট দিয়ে মারধরের অভিযোগ, গ্রেফতার বাবা

যা জানা জরুরি
- গোপালনগর: বিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলা করায় ছেলেকে বকাবকি করেছিলেন শিক্ষক।
- তার জেরে স্কুলে ঢুকে কোমরের বেল্ট খুলে ওই শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ উঠল এক অভিভাবকের বিরুদ্ধে।
- সহকর্মীকে বাঁচাতে গিয়ে আক্রান্ত হন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকও।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গোপালনগর: বিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলা করায় ছেলেকে বকাবকি করেছিলেন শিক্ষক। তার জেরে স্কুলে ঢুকে কোমরের বেল্ট খুলে ওই শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ উঠল এক অভিভাবকের বিরুদ্ধে। সহকর্মীকে বাঁচাতে গিয়ে আক্রান্ত হন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকও। উত্তর ২৪ পরগনার গোপালনগর হরিপদ ইনস্টিটিউশনের এই ঘটনায় অভিযুক্ত দেবব্রত দাসকে মঙ্গলবার গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁর ছেলে ওই বিদ্যালয়ের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। অভিযুক্ত অবশ্য শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সোমবার বিদ্যালয়ে একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের নাম নথিভুক্তির কাজ চলছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময় কয়েকজন ছাত্র চিৎকার ও হইচই করতে থাকে। বাংলার শিক্ষক অরুণ দাস ওই কাজের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, বার বার শান্ত হতে বলা সত্ত্বেও ছাত্ররা কথা শুনছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি কয়েকজনকে বকাবকি করেন। এর পরেই এক ছাত্র বাড়িতে বিষয়টি জানায়।
শিক্ষকদের অভিযোগ, কিছুক্ষণের মধ্যে বিদ্যালয়ে পৌঁছন ওই ছাত্রের বাবা দেবব্রত। প্রধান শিক্ষকের ঘরে ঢুকে তিনি অরুণবাবুর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। ছেলেকে কেন বকাবকি করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অভিযোগ, কথা কাটাকাটির মধ্যেই আচমকা কোমর থেকে বেল্ট খুলে শিক্ষককে আঘাত করতে শুরু করেন তিনি। এমন ঘটনায় উপস্থিত শিক্ষকরাও প্রথমে হতবাক হয়ে যান।
অরুণবাবুকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সমরেশচন্দ্র মণ্ডল। অভিযোগ, বাধা দিতে গেলে তাঁর গায়েও বেল্টের আঘাত লাগে। স্কুলের অন্য শিক্ষকেরা হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সামাল দেন। বিদ্যালয়ের নজরদারি ক্যামেরায় ঘটনাটি ধরা পড়ে। সেই দৃশ্য পরে প্রকাশ্যে আসে।
ঘটনার প্রতিবাদে কালো ব্যাজ পরে গোপালনগর থানায় যান শিক্ষকরা। অভিযুক্ত অভিভাবকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পাশাপাশি নজরদারি ক্যামেরার দৃশ্যও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তাঁদের বক্তব্য, বিদ্যালয়ের ভিতরে কাজ করতে গিয়ে এমন আক্রমণের মুখে পড়তে হলে স্বাভাবিক ভাবে পাঠদান চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। শুধু আক্রান্ত শিক্ষক নন, সহকর্মীরাও নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন।
অরুণবাবুর বক্তব্য, ছাত্রদের অশোভন আচরণ থামাতেই তিনি শাসন করেছিলেন। কিন্তু তার পর একজন অভিভাবক স্কুলে এসে এ ভাবে আক্রমণ করবেন, তা ভাবতে পারেননি। নিজের কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। সমরেশবাবুও জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ে ন্যূনতম শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রয়োজন। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আক্রান্ত হতে হলে শিক্ষকদের পক্ষে কাজ করা দুরূহ।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশের কাছে ঘটনার বিচার এবং দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে আতঙ্কের কথা। কোনও ছাত্রের আচরণ নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকের মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু আলোচনার জন্য বিদ্যালয়ে এসে শারীরিক আক্রমণের অভিযোগ গোটা শিক্ষার পরিবেশকেই অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।
অন্য দিকে, মঙ্গলবার পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার সময় দেবব্রত সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, তিনি শিক্ষককে মারেননি; নিজের ছেলেকে শাসন করতে এবং মারতে গিয়েছিলেন। তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে শিক্ষকদের অভিযোগের স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। ফলে অভিযুক্তের দাবি, অভিযোগকারীদের বক্তব্য এবং ক্যামেরায় ধরা পড়া ঘটনাক্রম—সব মিলিয়েই প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ জরুরি।
সমরেশবাবু জানিয়েছেন, অরুণবাবু এখনও ঘটনার অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেননি। শারীরিক আঘাতের চেয়েও মানসিক ধাক্কা বেশি বলে তাঁর বক্তব্য। সহকর্মীরা আক্রান্ত শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অভিযুক্ত গ্রেফতার হলেও বিদ্যালয়ের ভিতরে শিক্ষকরা কতটা নিরাপদ, সেই উদ্বেগ মেটেনি। পড়ুয়াদের সামনে এমন ঘটনার প্রভাব এবং ভবিষ্যতে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার প্রশ্নও তাই সামনে থাকছে। আপাতত শিক্ষকদের অভিযোগ ও জমা দেওয়া দৃশ্যই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে পুলিশের কাছে রয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



