এআইয়ে লাগাম চান গেটস

যা জানা জরুরি
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশে লাগাম টানার পক্ষে সওয়াল করলেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস।
- তাঁর আশঙ্কা, সময় থাকতে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না করলে একসময় এই প্রযুক্তির সুফলকে ছাপিয়ে যেতে পারে মানুষের ক্ষতির সম্ভাবনা।
- কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং শিশুদের মানসিক বিকাশ রক্ষায় সরকারগুলিকে এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশে লাগাম টানার পক্ষে সওয়াল করলেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তাঁর আশঙ্কা, সময় থাকতে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না করলে একসময় এই প্রযুক্তির সুফলকে ছাপিয়ে যেতে পারে মানুষের ক্ষতির সম্ভাবনা। কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং শিশুদের মানসিক বিকাশ রক্ষায় সরকারগুলিকে এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বুধবার প্রকাশিত প্রায় ছয় হাজার শব্দের একটি প্রবন্ধে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন গেটস।
সিএনএন-এর অ্যান্ডারসন কুপারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন তিনি। গেটসের দাবি, তাঁর প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এআই। এর ফলে বৈদ্যুতিন ব্যবস্থায় হামলা, জৈবসন্ত্রাস এবং মনোসামাজিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ কোন মানদণ্ডে এই প্রযুক্তির ক্ষমতা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে এবং বিপদ কমাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার কোনও স্পষ্ট কাঠামো এখনও তৈরি হয়নি।
গেটসের মতে, ব্যক্তিগত কম্পিউটারের বিপ্লবের তুলনায় এআইয়ের অভিঘাত অনেক বেশি গভীর হতে পারে। বিশ্বজুড়ে এর অগ্রগতি ধীর করার কোনও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা থাকলে তিনি সম্ভবত তা সমর্থন করতেন। কিন্তু ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করেন তিনি।
তাঁর আশঙ্কা, আরও শক্তিশালী এআই একসময় মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে এবং পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে, যেখানে প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠবে। বেকারত্ব তীব্র হওয়ার এবং মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ার আগেই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পদক্ষেপ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
যন্ত্রে কর, মানুষে বিনিয়োগ
সমাধানের একটি পথ হিসেবে করব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন গেটস। তাঁর যুক্তি, কোনও কর্মীকে নিয়োগ করলে তাঁর মজুরির সঙ্গে যুক্ত কর দিতে হয় নিয়োগকর্তাকে। কিন্তু যন্ত্র কেনার খরচ ব্যবসায়িক ব্যয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে মানুষকে সরিয়ে যন্ত্র বসানোর আর্থিক উৎসাহ তৈরি হয়।
এআই ও যন্ত্রমানবের ব্যবহারের উপর উপযুক্ত কর বসানো হলে সেই পরিবর্তনের গতি কিছুটা কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। সেই অর্থ কর্মীদের নতুন দক্ষতা শেখানো, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষায় ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ওষুধ ও শিক্ষা সস্তা করার মতো জনকল্যাণমূলক কাজে এআইয়ের ব্যবহার যাতে করের চাপে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন গেটস।
শুধু কর নয়, চাই নজরদারি
এআইকে ঘিরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন তদারকি কাঠামোর প্রয়োজন বলেও মনে করেন গেটস। কর্মসংস্থান, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তাকে আলাদা আলাদা করে দেখলে চলবে না। প্রযুক্তির প্রভাব এক ক্ষেত্র থেকে অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি দেশগুলির পারস্পরিক সহযোগিতার উপর জোর দিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রতিনিধি, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মতামতও থাকা উচিত বলে মনে করেন গেটস।
সুফল যেন শুধু ধনীদের না হয়
এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে অবশ্য সংশয়ী নন গেটস। চিকিৎসা, কৃষি এবং শিক্ষায় এই প্রযুক্তি বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে প্রযুক্তির সুফল নিজে থেকেই সমাজের সব স্তরে পৌঁছে যাবে না।
বিশেষ করে দরিদ্র মানুষ এবং কম আয়ের দেশগুলিকে এআই বিপ্লবের অংশীদার করতে সরকারের সচেতন উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তাঁর মত।
কিছু কাজ শুধু মানুষের
গেটসের আরও একটি প্রস্তাব—কিছু কাজ ভবিষ্যতেও মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখা হোক।
এই প্রসঙ্গে নিজের বাবার জীবনের শেষ পর্বে পরিচর্যার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, অসুস্থ মানুষের অনুভূতি বোঝা, কঠিন সময়ে পাশে থাকা কিংবা মানবিক সঙ্গ দেওয়ার মতো কাজের মূল্য শুধু দক্ষতা বা উৎপাদনশীলতার মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না।
তাই প্রযুক্তি দিয়ে কোনও কাজ করা সম্ভব হলেই তা যন্ত্রের হাতে তুলে দিতে হবে—এমন নয়। প্রকৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যেমন কিছু সম্পদ ব্যবহার না করার সামাজিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তেমনই কিছু ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন গেটস।
চিনের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা
এআই নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চান গেটস। রয়টার্সকে তিনি জানিয়েছেন, বিপজ্জনক এআইয়ের বিকাশে আমেরিকা আগে সীমা নির্ধারণ করলে চিনও সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে। তাঁর প্রতিনিধিরা সম্ভাব্য বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে গেটসের বক্তব্যের মূল কথা, এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তি নির্মাতা সংস্থাগুলির হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না। তবে তাঁর প্রস্তাবগুলি এখনও ব্যক্তিগত নীতিগত মতামত—কোনও আন্তর্জাতিক চুক্তি বা গৃহীত সরকারি নীতি নয়। এগুলি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সরকারের সম্মতি, নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ এবং জনসমক্ষে বিস্তৃত আলোচনা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



