নেপালের একাংশকে বিধ্বংসী বন্যার গ্রাসে চলে যেতে দেখে হতাশ না হয়ে থাকা কঠিন। আরও কঠিন এই কথা জানা যে, নিখোঁজ স্বজনদের কোনও সন্ধান না পেয়ে ভারতের বহু পরিবারের যন্ত্রণা প্রতিটি দিনের সঙ্গে আরও গভীর হচ্ছে।

সমাজমাধ্যম এখন মরিয়া আবেদনে ভরে গিয়েছে। মুম্বই থেকে কলকাতা—বিভিন্ন প্রান্তের পরিবার নিখোঁজ তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, নারী-পুরুষের ছবি ও পরিচয় পোস্ট করে জীবনের সামান্য চিহ্নটুকু খুঁজছেন। বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয় একটি গলতে থাকা হিমবাহ নীচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ার পর। তার অভিঘাতে পাথর ও বরফের এক প্রাণঘাতী স্রোত নেমে আসে ভোটে কোশী নদী ধরে। নদীটি তিব্বত থেকে নেপালে প্রবেশ করেছে।

এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত নিখোঁজ ২৭৫ জন ভারতীয়ের মধ্যে রয়েছেন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক এবং তিব্বতের কৈলাস পর্বতে হিন্দু তীর্থযাত্রায় যাওয়া মানুষ। ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরও ১২৮ জনেরও সন্ধান নেই। তাঁদের মধ্যে সদ্‌গুরুর ঈশা ফাউন্ডেশনের আধ্যাত্মিক দলের বহু সদস্য রয়েছেন। সোমবার পর্যন্ত ১৪৯ জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে।

গৌরী জোশীর পাঁচ আত্মীয় গত সপ্তাহান্ত পর্যন্ত নিখোঁজ ছিলেন। গত কয়েকটি দিন তাঁর কেটেছে বারবার তাঁদের ফোন নম্বরে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টা করে, উদ্ধার অভিযানের খবর দেখে এবং ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে। এখনও পর্যন্ত তিনি যা জানতে পেরেছেন, তা হল—মহারাষ্ট্র থেকে যাওয়া একটি তীর্থযাত্রী দলের সদস্য হিসেবে তাঁর আত্মীয়েরা নেপাল ও তিব্বতের মধ্যবর্তী গিরং সীমান্তে অভিবাসন-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বাসে উঠেছিলেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্যার জল সীমান্ত পারাপারের পথটি ধ্বংস করে দেয়।

জোশী বলেন, “এখন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে। তবু হয়তো কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটবে।”

এই বিপর্যয়ের পরে জলবায়ু পরিবর্তনের সামনে হিমালয় কতটা অরক্ষিত এবং ভারতের পক্ষে তার পরিণতি কী হতে পারে—সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। হিমবাহ ভেঙে পড়া এবং চিরতুষারাবৃত জমি গলে যাওয়ার ফলে আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতের ঝুঁকি বুঝতে আমি কথা বলেছি আইআইটি ভুবনেশ্বরের অধ্যাপক এবং হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার বিশেষজ্ঞ ড. আশিম সত্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি সম্পাদিত ও সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।

হিমালয়জুড়ে জলবায়ু বা হিমবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে?

“হিমমণ্ডলের বিভিন্ন রূপ রয়েছে এবং সেগুলির প্রত্যেকটি আলাদা ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারে। সাধারণ মানুষের ভাষায় বললে, হিমমণ্ডল হল সেই অঞ্চল, যেখানে জল কঠিন অবস্থায় থাকে—যেমন হিমবাহ। হিমবাহ গলে গেলে হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হয়। সেই হ্রদের জলাধার ফেটে গেলে নিম্নবর্তী এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

“হিমমণ্ডলের আর একটি উপাদান হল হিমবাহের বরফ। নেপালে আমরা সেটাই দেখেছি। সেখানে হিমবাহের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। হিমবাহের সামনের অংশটি মূল হিমবাহ থেকে আলাদা হয়ে শেষ পর্যন্ত ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত সৃষ্টি করে।

“তৃতীয় উপাদানটি হল চিরতুষারাবৃত ভূমি বা পারমাফ্রস্ট। হিমালয়জুড়ে এর বিস্তৃতি রয়েছে। কিন্তু এর উপর খুব বেশি নজরদারি হয়নি, কারণ কাজটি অত্যন্ত কঠিন। এই হ্রদ, হিমবাহ ও চিরতুষারাবৃত ভূমি—প্রত্যেকটিই বিপদের উৎস। তবে কোনও কিছু এগুলিকে সক্রিয় না করলে সেগুলি ক্ষতি ঘটাবে না।

“জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলগুলির তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির উপরে উঠে যাবে এবং জমাট ভূমির অবক্ষয় শুরু হবে। তখন ধ্বংসাবশেষকে সচল করার জন্য খুব সামান্য অভিঘাতই যথেষ্ট হবে। ভবিষ্যতে ধ্বংসাবশেষের স্রোত আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে। নজরদারি কেন্দ্র এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ব্যবস্থা না থাকলে এই বিপদের ক্ষেত্রগুলি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তা আমরা জানতে পারব না।

“হিমালয়ের বিস্তার বিপুল হওয়ায় তার প্রতিটি অংশের উপর নজর রাখা কঠিন। বিপজ্জনক অঞ্চলটি ভারতের পর্বতমালার মধ্যে থাকতে পারে, আবার ভারতের বাইরেও থাকতে পারে। কিন্তু সেই এলাকার জলপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছয়। তাই বিষয়টি ভালভাবে পরীক্ষা করা দরকার।”

“বন্যা যে কোনও সময় ঘটতে পারে”—নিজের কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন দেবীঘাটের এক বাসিন্দা। ছবি: আহমের খান/দ্য গার্ডিয়ান।

ভারতের নিম্নবর্তী অঞ্চলগুলির পক্ষে ঝুঁকি কতটা গুরুতর?

“বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই মুহূর্তে একটি বড় ঘাটতি রয়েছে। এখনও পর্যন্ত ঝুঁকির পরিমাণ নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। তবে ভারতের হিমালয় অঞ্চলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে। হিমবাহ-হ্রদের সংখ্যা বাড়ছে, হ্রদগুলির আয়তন ও জলের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং হিমবাহগুলি পিছিয়ে যাচ্ছে। ঝুঁকি অবশ্যই রয়েছে, কারণ যে কোনও সময় বিপর্যয় ঘটতে পারে।”

ভারতের কোন অঞ্চলগুলি সবচেয়ে বেশি বিপন্ন?

“হিমালয় অঞ্চলে বসবাসকারী প্রত্যেকেই বিপদের মধ্যে রয়েছেন। হিমালয়-সংলগ্ন প্রতিটি রাজ্যেই কোনও না কোনও বিপদ রয়েছে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। পূর্ব হিমালয়ে প্রচুর হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে। সেগুলির অনেকটাই ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ বিস্তারে পৌঁছে গিয়েছে। অধিকাংশ পূর্ণাঙ্গ হ্রদ তাদের সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।

“পশ্চিম বা মধ্য হিমালয়ে হ্রদগুলির আরও বড় হওয়ার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে, কারণ সেগুলি এখনও পূর্ণ বিস্তারে পৌঁছয়নি। হিমবাহ যত পিছিয়ে যাবে, হ্রদগুলি ততই বড় হতে থাকবে।

“এই রাজ্যগুলির কোনওটির পরিস্থিতি কখন বদলে যাবে, সে সম্পর্কে আমরা এখনও নিশ্চিত নই। এটি অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন। যথাযথ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ছাড়া এই মুহূর্তে কেউই এর উত্তর দিতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না।”

ভারতের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

“জাতীয় বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এখন সক্রিয় পদক্ষেপ করছে। হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার ঝুঁকি প্রশমন কর্মসূচির অধীনে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

“সম্ভবত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাটি সম্প্রদায়নির্ভর হওয়া উচিত। সেটি মানুষের জন্য এবং মানুষের দ্বারাই পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। শুধু বিজ্ঞানী বা নীতিনির্ধারকেরা সব সময় এই ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ কার্যকর করে তুলতে পারবেন না। স্থানীয় জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে এবং ব্যবস্থাটিকে আরও কার্যকর করতে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলিকে যুক্ত করতে হবে।”

এই ব্যবস্থাগুলি পুরোপুরি চালু করতে কত সময় লাগবে?

“আমার কোনও ধারণা নেই। কারণ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থা নিজের গতিতে কাজ করছে এবং প্রত্যেকের কাজের নিজস্ব ধরন রয়েছে। তবে আমি নিশ্চিত, শীঘ্রই এটি বাস্তবায়িত হবে। আমি কেবল সেই সব এলাকার বিষয়ে মন্তব্য করতে পারি, যেগুলি সম্পর্কে আমি জানি এবং যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে।”

এই ধরনের বিপর্যয় প্রতিরোধ করা কি সম্ভব, না কি কেবল ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমানো যেতে পারে?

“প্রতিরোধ সম্ভব, কিন্তু তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। গণনাগত সক্ষমতা, অর্থ এবং জনবল—সব দিক থেকেই বিপুল সম্পদের প্রয়োজন। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও কমানো সম্ভব। কিন্তু তার জন্য উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপক হস্তক্ষেপ করতে হবে, যা ওই দুর্গম ভূপ্রকৃতিতে অত্যন্ত কঠিন।

“আমরা জানি, পাহাড় বদলে যাচ্ছে এবং বিপদের মাত্রা বাড়ছে। তাই এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ হল নিম্নবর্তী এলাকায় মানুষের এই বিপদের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা যথাসম্ভব কমানো। অর্থাৎ বিপজ্জনক ঘটনাটি নিম্নবর্তী অঞ্চলের কতটা অংশকে প্রভাবিত করতে পারে, তা বুঝতে হবে। তার গতিপথে কোনও বসতি বা পরিকাঠামো থাকলে সেগুলি সরিয়ে দিতে হবে।”