বাংলাস্ফিয়ার: নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর ও তার আশপাশে চলা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র নেতৃত্বাধীন ছাত্র-যুব আন্দোলনকে ঘিরে নজিরবিহীন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি শুরু করেছে দিল্লি পুলিশ। ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর মুখচিহ্ন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, ড্রোন, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি এবং রিয়েল-টাইম ভিডিও বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে রাজধানীর বিক্ষোভস্থল কার্যত একটি ডিজিটাল নজরদারি বলয়ে পরিণত হয়েছে। পুলিশের দাবি, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য অশান্তি রোধ করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষাকারী মহল প্রশ্ন তুলছে, এই ধরনের নজরদারি কি গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, যন্তর মন্তর এবং সংলগ্ন এলাকায় একাধিক ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এই ক্যামেরাগুলি একটি নির্দিষ্ট দিক নয়, চারপাশের সম্পূর্ণ দৃশ্য একসঙ্গে ধারণ করতে সক্ষম। ফলে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর গতিবিধি নজর এড়ানো প্রায় অসম্ভব। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এআই-ভিত্তিক ভিডিও বিশ্লেষণ ব্যবস্থা, যা ভিড়ের মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে, সন্দেহজনক আচরণ চিহ্নিত করতে এবং তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণকক্ষকে সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে।

পুলিশের প্রযুক্তি শাখার আধিকারিকদের বক্তব্য, এই ব্যবস্থা শুধু ভিডিও রেকর্ডিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যামেরায় ধরা পড়া মুখের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তা পূর্ববর্তী তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। কোনও ব্যক্তি যদি অতীতে দাঙ্গা, হিংসা বা অন্য অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকেন এবং তাঁর তথ্য আইনসিদ্ধভাবে ডেটাবেসে থাকে, তবে তাঁকে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। তবে এই ডেটাবেসে কারা রয়েছেন, তথ্য কতদিন সংরক্ষিত হয় এবং কীভাবে তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হয়—এসব বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

নজরদারির পাশাপাশি বিক্ষোভস্থলের উপর ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। আকাশপথ থেকে ভিড়ের ঘনত্ব, মিছিলের গতিপথ এবং সম্ভাব্য উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। পুলিশের দাবি, এর ফলে অতিরিক্ত বাহিনী কোথায় পাঠাতে হবে বা কোন জায়গায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা দ্রুত বোঝা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিষেবা সচল রাখতেও এই তথ্য কাজে লাগানো হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন মোড়, মেট্রো স্টেশন এবং প্রবেশপথে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। ফলে কোন গাড়ি কখন এলাকায় ঢুকছে বা বেরোচ্ছে, তারও তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। আন্দোলনের দিনগুলিতে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি এই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

পুলিশের এক আধিকারিকের বক্তব্য, সাম্প্রতিক সময়ে বৃহৎ জনসমাবেশে সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো, হঠাৎ ভিড়ের দিক পরিবর্তন বা উস্কানিমূলক কার্যকলাপের ঝুঁকি বেড়েছে। তাই শুধু মানবশক্তির ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, এআই কোনও ব্যক্তিকে অপরাধী ঘোষণা করে না; এটি কেবল সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবসময়ই দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকের।

অন্যদিকে, নাগরিক অধিকার কর্মী ও ডিজিটাল গোপনীয়তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এমন নজরদারি ব্যবস্থার অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। তাঁদের মতে, মুখচিহ্ন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি সবসময় নির্ভুল নয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুল শনাক্তকরণের অভিযোগ আন্তর্জাতিক স্তরেও উঠেছে। এর ফলে নিরপরাধ মানুষ অযথা পুলিশের নজরে চলে আসতে পারেন। পাশাপাশি, কোনও ব্যক্তি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিলে তাঁর মুখের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ভবিষ্যতে নাগরিক স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলেও তাঁদের মত।

আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গোপনীয়তার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা, সামঞ্জস্য এবং আইনগত বৈধতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, এ ধরনের ব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতি, স্বাধীন তদারকি এবং তথ্য সংরক্ষণের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা জরুরি।

সিজেপি-র নেতাদের অভিযোগ, আন্দোলন দমন করতেই প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-যুবকদের ভয় দেখানোর জন্য সর্বক্ষণ নজরদারির পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। তবে দিল্লি পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাই একমাত্র উদ্দেশ্য। কোনও বৈধ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বাধা দেওয়ার নির্দেশ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বহু বড় শহরে বড় জনসমাবেশ বা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময় উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যন্তর মন্তরের চলমান আন্দোলন সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।

আন্দোলন যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে ভবিষ্যতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রযুক্তির ভূমিকা আরও বাড়বে। কিন্তু একই সঙ্গে বাড়বে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার দাবি। সিজেপি আন্দোলনকে ঘিরে দিল্লিতে যে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, তা আগামী দিনে দেশের অন্য শহরগুলির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।