গ্যাংটক: দক্ষিণ সিকিমের সমরডুং এলাকায় নির্মীয়মাণ তিস্তা স্টেজ-৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পাঁচ দিন পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২২। বৃহস্পতিবার আরও কয়েকটি দেহ উদ্ধার করেছে উদ্ধারকারী দল। এখনও অন্তত তিনজন শ্রমিক নিখোঁজ। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিতদের উদ্ধারের সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
সোমবার সুড়ঙ্গের ভিতরে জমে থাকা মিথেন গ্যাসে বিস্ফোরণ ঘটে। তার জেরে সুড়ঙ্গের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে এবং বহু শ্রমিক ভিতরে আটকে যান। শুরু থেকেই উদ্ধারকাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিষাক্ত গ্যাস, ঘন কাদা, ধ্বংসস্তূপ এবং অক্সিজেনের ঘাটতি।
বৃহস্পতিবার উদ্ধারকারী দল আরও কয়েকটি দেহ বাইরে আনতে সক্ষম হয়। প্রশাসন জানিয়েছে, মৃতদের অধিকাংশের পরিচয় নিশ্চিত করার কাজ চলছে। কয়েকটি দেহের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হওয়ায় শনাক্তকরণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে একযোগে কাজ করছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফ, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সেনাবাহিনী, কয়লা ইন্ডিয়ার বিশেষ উদ্ধারকারী দল এবং প্রকল্প কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলীরা। সুড়ঙ্গের ভিতরে প্রবেশকারী প্রত্যেক উদ্ধারকর্মীকে বিশেষ শ্বাসযন্ত্র, গ্যাস শনাক্তকারী যন্ত্র এবং সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এক উদ্ধারকারী জানান, সুড়ঙ্গের ভিতরের পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। ঘন কাদা, তীব্র তাপ, অন্ধকার এবং মিথেন ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। অনেক জায়গায় মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় ধ্বংসস্তূপ সরানোও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা গেলেও নতুন করে ধস নামার আশঙ্কায় কিছু অংশে হাতেই কাজ করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিস্ফোরণের পর সুড়ঙ্গের ভিতরে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যাওয়া এবং বিষাক্ত গ্যাসের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন। তবু নিখোঁজদের সন্ধানে সম্ভাবনার শেষ সীমা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
উদ্ধার শিবিরের বাইরে উদ্বেগে অপেক্ষা করছেন নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, প্রত্যেককে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত অভিযান বন্ধ করা যাবে না। পরিবারের একাংশের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় উদ্ধারকাজ আরও দ্রুত শুরু হলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। প্রশাসন অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রাজ্য সরকার জানিয়েছে, মৃতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। আহতদের চিকিৎসার সমস্ত খরচও সরকার বহন করবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে মিথেন গ্যাসের সংস্পর্শে বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে মনে করা হলেও, তদন্তে একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। সুড়ঙ্গের ভিতরে গ্যাস পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, নিরাপত্তা বিধি মেনে কাজ চলছিল কি না এবং নির্মাণ সংস্থার কোনও গাফিলতি ছিল কি না—সবই তদন্তের আওতায় থাকবে।
প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের জটিল ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণে দীর্ঘ সুড়ঙ্গে গ্যাস জমে যাওয়া এবং ধসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। তাই উন্নত বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
সিকিমের এই দুর্ঘটনা ফের দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলিতে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একের পর এক সুড়ঙ্গ দুর্ঘটনার পরও ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপত্তা মহড়া এবং গ্যাস শনাক্তকরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ কাটেনি।
উদ্ধারকারী বাহিনী জানিয়েছে, নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধানে অভিযান আপাতত অব্যাহত থাকবে। তবে প্রতিটি ঘণ্টা পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা কমছে। তাই একদিকে চলছে শেষ আশার লড়াই, অন্যদিকে ধীরে ধীরে উদ্ধার অভিযান নিখোঁজদের সন্ধান এবং এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।