Home DRAFT মাছ-ভাতের পর বাংলা—বাঙালির মন জয়ে বিজেপির নতুন তাস?

মাছ-ভাতের পর বাংলা—বাঙালির মন জয়ে বিজেপির নতুন তাস?

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
22 views 3 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • ১ সেপ্টেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমস্ত প্রশাসনিক যোগাযোগে বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক।
  • ‘মাছ-ভাত’ ইস্যুর পর এবার ভাষা ও বাঙালি পরিচয়কে রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনছে বিজেপি সরকার।
  • বিরোধীদের অভিযোগ, বাংলা ভাষার প্রতি এই ‘নতুন প্রেম’ আসলে রাজনৈতিক প্রয়োজনের ফল।
  • সরকারের দাবি, সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনকে আরও সহজ ও বোধগম্য করে তুলতেই এই সিদ্ধান্ত।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি যে শুধু উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বা আইনশৃঙ্খলার অঙ্কে চলে না, ক্ষমতায় আসার পর তা বুঝতে শুরু করেছে বিজেপি সরকার। এই রাজ্যে রাজনীতি মানে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের আবেগও। তাই নির্বাচনের আগে ‘মাছ-ভাত’কে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করার পর এবার বাংলা ভাষাকেই প্রশাসনের কেন্দ্রে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ঘোষণা করেছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যের সমস্ত সরকারি দফতর, জেলা প্রশাসন, পুরসভা, পঞ্চায়েত এবং সরকারি সংস্থার অভ্যন্তরীণ ও বহির্মুখী যোগাযোগে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে। কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অবশ্য বাংলা ও হিন্দি—দুই ভাষাই ব্যবহার করা হবে।

সরকারের যুক্তি, এতদিন বহু সরকারি নথি, বিজ্ঞপ্তি এবং চিঠিপত্র মূলত ইংরেজিতে প্রকাশিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনিক নির্দেশ অনেক সময় দুর্বোধ্য হয়ে উঠত। বাংলাকে প্রশাসনিক যোগাযোগের কেন্দ্রে আনার লক্ষ্য হল সরকারের কাজকর্মকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যাওয়া।

কিন্তু রাজনীতির অঙ্কে এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য আরও বড়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অন্যতম অভিযোগ ছিল—দলটি বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল নয়। তৃণমূল কংগ্রেসও বিজেপিকে বারবার ‘বহিরাগত রাজনীতি’র প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেছে। সেই ধারণা বদলাতেই বিজেপি এখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করার চেষ্টা করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এর আগে নির্বাচনী প্রচারে ‘মাছ-ভাত’কে ঘিরে বিজেপির রাজনৈতিক বার্তা ছিল স্পষ্ট—বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতিতে কোনও হস্তক্ষেপ করা হবে না। এবার সেই প্রচারের পরবর্তী ধাপ হিসেবে সামনে এসেছে ভাষা। অর্থাৎ, খাবারের পর এবার প্রশাসনিক ভাষায় ‘বাঙালিয়ানা’।

বিজেপির অভ্যন্তরেও এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভিত্তি গড়তে কেবল জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাজনীতি যথেষ্ট নয়। বাঙালির আঞ্চলিক পরিচয়, ভাষাগত গর্ব এবং সাংস্কৃতিক আবেগকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত সেই রাজনৈতিক বার্তাই বহন করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিজেপি একদিকে বাংলা ভাষার প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চাইছে, অন্যদিকে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক অস্ত্রও ভোঁতা করার চেষ্টা করছে। বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরা তৃণমূলের অন্যতম শক্তি। বিজেপির নতুন নীতি সেই রাজনৈতিক একচেটিয়াত্বে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে।

তবে বিরোধীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তৃণমূলের অভিযোগ, বাংলা ভাষার প্রতি সরকারের এই ‘হঠাৎ আগ্রহ’ আসলে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী কৌশল। তাঁদের দাবি, অতীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে হিন্দিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পর এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতেই বাংলা ভাষাকে সামনে আনা হচ্ছে।

কংগ্রেস ও বাম দলগুলির বক্তব্যও একই রকম। তাঁদের মতে, শুধু প্রশাসনিক যোগাযোগে বাংলা ব্যবহারের ঘোষণা করলেই ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা প্রমাণ হয় না। প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা, বিচারব্যবস্থা এবং সরকারি নিয়োগে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাস্তবে কতটা বাড়ে, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।

বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ। সরকারি সফটওয়্যার, নথি তৈরির পদ্ধতি এবং বহু দফতরের কাজ এখনও ইংরেজিনির্ভর। বাংলা ভাষায় দক্ষ কর্মী, অনুবাদ পরিকাঠামো এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া নতুন নীতি কার্যকর করতে সমস্যা হতে পারে বলে মনে করছেন প্রশাসনের একাংশ।

তবু রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট। বিজেপি এখন বোঝাতে চাইছে, তারা শুধু দিল্লির রাজনীতি করা একটি জাতীয় দল নয়; বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক পরিচয়ের সঙ্গেও নিজেদের যুক্ত করতে চায়।

মাছ-ভাতের প্রতীকী বার্তার পর এবার বাংলা ভাষা। অর্থাৎ, বাঙালির মন জয়ের রাজনৈতিক রেসিপিতে বিজেপি এবার যোগ করেছে নতুন উপকরণ—‘বাংলা’।

এই কৌশল বাস্তবে কতটা সফল হয়, তা নির্ভর করবে ঘোষণার বাইরে প্রশাসনে বাংলা ভাষার ব্যবহার কতটা কার্যকর হয় এবং সাধারণ মানুষ সেটিকে কীভাবে গ্রহণ করেন তার উপর। কারণ পশ্চিমবঙ্গে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি আবেগ, পরিচয় এবং রাজনীতিরও শক্তিশালী হাতিয়ার। সেই আবেগকে প্রশাসনিক নীতির সঙ্গে যুক্ত করে বিজেপি যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে চাইছে, তা এখন আর গোপন নয়।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles