রুণাচল প্রদেশের সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা, চিনের সঙ্গে ভারতের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি এবং বিনিয়োগের পথে বাধা—এই তিন বিষয়কে সামনে রেখেই শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা। তিন বছরে দুই নেতার তৃতীয় বৈঠক ঘিরে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রত্যাশা রয়েছে। সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন বা সম্পূর্ণ স্বাভাবিকীকরণের দাবি করার সময় এখনও আসেনি।

সীমান্তের উদ্বেগ এখন বিশেষভাবে অরুণাচলের তাকসিংকে ঘিরে। সরকারি, সামরিক এবং নিরাপত্তা সূত্রের উল্লেখ করে জানিয়েছে, জুলাইয়ে সংক্ষিপ্ত মুখোমুখি অবস্থানের পরে সেখানে দুই দেশের সেনা অগ্রবর্তী অবস্থানে রয়েছে। চিনা বাহিনী উঁচু জায়গায় তাঁবু ফেলেছে; ভারতও টহলদারি বাড়িয়েছে। মোদী সরাসরি এই পরিস্থিতি তুলবেন কি না, বিদেশ মন্ত্রক তা নিশ্চিত করেনি।

এই অস্বস্তির পটভূমি ২০২০ সালের পূর্ব লাদাখের সংঘাত। গলওয়ানের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গভীর সংকটে পড়ে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পূর্ব লাদাখের সংঘাতস্থলগুলি থেকে সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান সরানোর সমঝোতা হয়। কিন্তু একটি অঞ্চলে উত্তেজনা কমার অর্থ গোটা সীমান্তে নিশ্চিন্ত পরিস্থিতি তৈরি হওয়া নয়। অরুণাচলের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই সীমাবদ্ধতাই সামনে এনেছে। সীমান্তে স্থিতি ফেরানো তাই রাজনৈতিক আলোচনার অপরিহার্য অংশ হয়ে রয়েছে।

বৈঠকের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল ২৫ আগস্ট বেজিংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল ও চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের আলোচনা। সীমান্ত প্রশ্নে বিশেষ প্রতিনিধিদের এই পঁচিশতম বৈঠকে সীমান্ত পরিচালনা, আলোচনার কাঠামো এবং সহযোগিতার বিষয়ে কথা হয়। চিনা বিবৃতি অনুযায়ী, ওয়াং সম্পর্ককে বৈশ্বিক ও কৌশলগত তাৎপর্যসম্পন্ন বলেছেন। বেজিংয়ের বক্তব্য, সীমান্ত প্রশ্নকে সামগ্রিক সম্পর্কের উপযুক্ত পরিসরে রেখে আলোচনা চালানো প্রয়োজন।

ওই আলোচনায় দুই পক্ষ ন্যায্য, যুক্তিসংগত এবং উভয়ের গ্রহণযোগ্য সীমান্ত সমাধান খোঁজার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। পরবর্তী বিশেষ প্রতিনিধি বৈঠক ২০২৭ সালে ভারতে হওয়ার কথা। এদিকে সীমান্তে সামরিক প্রতিনিধিদের বৈঠকের স্থান বর্তমান পাঁচটির থেকে বাড়াতেও সম্মতি হয়েছে। এই ব্যবস্থার তাৎপর্য হল, স্থানীয় উত্তেজনা দেখা দিলে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বাড়ানো এবং ভুল বোঝাবুঝি বড় সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি কমানো।

অর্থনীতিতে সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা। বেজিংয়ে ভারতীয় দূতাবাসের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে ফরচুন ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে দ্বিপাক্ষিক পণ্যবাণিজ্য হয়েছে ১৫১.১০ বিলিয়ন ডলার। ভারতের রফতানি ১৯.৪৭ বিলিয়ন ডলার, অথচ আমদানি ১৩১.৬৩ বিলিয়ন। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১২.১৬ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় রফতানি দ্রুত হারে বাড়লেও আমদানির বিশাল ভিত্তির কারণে ব্যবধান অত্যন্ত বড় রয়ে গিয়েছে। বাণিজ্য বাড়ার সুফল তাই সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না।

দুই নেতা আগের আলোচনাতেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ঘাটতি কমানোর প্রয়োজন স্বীকার করেছিলেন। এবারের ব্রিকস সম্মেলন সেই আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। উৎপাদন, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু ভারতের কাছে সাফল্যের মাপকাঠি শুধু মোট লেনদেনের বৃদ্ধি হতে পারে না; চিনের বাজারে ভারতীয় পণ্যের বিক্রি কতটা বাড়ছে, সেটিও সমান জরুরি।

নির্ভরতার গভীরতা বোঝা যায় শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশে। কার্নেগি এনডাওমেন্টের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ওষুধশিল্প, বৈদ্যুতিন যন্ত্রাংশ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং কিছু সারের ক্ষেত্রে চিনের উপর ভারতের নির্ভরতা তুলে ধরা হয়েছে। চিনের রফতানি নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে ভারতীয় উৎপাদনেও চাপ পড়ে। ফলে দিল্লির সামনে একই সঙ্গে দুটি কাজ: প্রয়োজনীয় সরবরাহ সচল রাখা এবং বিকল্প উৎস ও দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো। দ্বিতীয় কাজটির ফল পেতে সময় লাগবে। তাই সম্ভাব্য বিনিয়োগের মূল্যায়নেও শুধু টাকার অঙ্ক যথেষ্ট নয়। বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ, স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশে প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা গড়ে ওঠা জরুরি। আমদানিকৃত যন্ত্রাংশ জুড়ে পণ্য তৈরি করার বাইরে ভারতীয় শিল্প কতটা এগোতে পারছে, সেই প্রশ্নটিও এখানে প্রাসঙ্গিক।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারত ইতিমধ্যে কিছুটা দরজা খুলেছে। রয়টার্সের মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচিত উৎপাদনক্ষেত্রে চিনা বিনিয়োগের নিয়ম সীমিতভাবে শিথিল করা হয়েছে। বৈদ্যুতিন শিল্প, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও সৌরশিল্পের প্রস্তাব দ্রুত বিবেচনার ব্যবস্থা তার অংশ। দেশীয় শিল্পের প্রযুক্তি ও মূলধনের চাহিদা এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে। তবে এই শিথিলতা সর্বক্ষেত্রে অবাধ অনুমতির সমার্থক নয়; নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন এখনও নীতির কেন্দ্রে রয়েছে। সংশোধিত ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের প্রস্তাব ষাট দিনের মধ্যে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সীমিত চিনা মালিকানাসম্পন্ন কিছু বিনিয়োগের স্বয়ংক্রিয় অনুমতির সুযোগ রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য, দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য কিছু কার্যকর পথ খোলা।

বেজিং আবার ভারতে চিনা সংস্থাগুলির প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তুলছে। শাওমির বিরুদ্ধে তদন্তের সুপারিশের পরেও চিন স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন ব্যবসায়িক পরিবেশ চেয়েছে। আন্তঃসীমান্ত নদীর তথ্য বিনিময়ও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। উজানের জলপ্রবাহ এবং বাঁধ পরিচালনা সম্পর্কে সময়মতো তথ্য পাওয়া ভাটির দেশগুলির দুর্যোগ প্রস্তুতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং নিরাপত্তার উদ্বেগ পাশাপাশি রেখেই ভারত চিনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি থাকলে সীমান্ত থেকে বৃহত্তর সেনা প্রত্যাহার কঠিন। আবার ভৌগোলিক প্রতিবেশ এবং শিল্পের নির্ভরতা উপেক্ষা করেও নীতি তৈরি করা যায় না। এই পটভূমিতে বৈঠকের বাস্তব পরীক্ষা হবে ঘোষণার পরে কী পরিবর্তন আসে: সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য হয়, বাজার কতটা খোলে এবং সীমান্তে নতুন সংকট ঠেকানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়।

প্রাক্তন বিদেশসচিব নিরুপমা মেনন রাও বলেছেন, বিচ্ছিন্ন শীর্ষবৈঠকের বদলে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ধারাবাহিক স্থিতিশীলতা দরকার। তাঁর মূল্যায়নে, পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করে মতভেদ সামলানোর কাঠামো তৈরি হতে পারে। দিল্লির বৈঠকের প্রত্যাশাও তাই সীমিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ: প্রতিযোগিতা চলবে, তবে তা যেন বারবার সংঘাতের দিকে না গড়ায়।