ন্দির-মণ্ডল রাজনীতির উত্থানের আগে কংগ্রেসের সমর্থনের ভিত্তি ছিল ‘দুই প্রান্তের জোট’—‘উচ্চবর্ণ’, মুসলিম এবং দলিত। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে দল শেষ পর্যন্ত সেই পুরনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতিকে পুরোপুরি গ্রহণ করেছে।

গত মাসে পুণেতে পড়ুয়াদের উদ্দেশে ভাষণে মনুস্মৃতিকে আক্রমণ করেছিলেন রাহুল গান্ধী। এর পরে হলদোয়ানির ঘটনায় এফআইআর দায়েরের দাবিতে সরব হয় কংগ্রেস। তেলঙ্গানাতেও ভারত রাষ্ট্র সমিতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে দল। কংগ্রেসের অভিযোগ, সিদ্দিপেট জেলায় বিআরএস নেতা কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের বাগানবাড়ির কাছে দলের দলিত কর্মীরা প্রতিবাদ মিছিল করার পরে সেখানে ‘শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠান করেছে বিআরএস।

মনুস্মৃতির বিরুদ্ধে এই অবস্থান মূলত দলিতদের কাছে, কখনও নারীদের কাছেও, একটি রাজনৈতিক আবেদন। তবে একে ‘উচ্চবর্ণের’ প্রতি পরোক্ষ আক্রমণ হিসেবেও দেখা হয়। বিদ্যায়তনিক আলোচনায় যাকে ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়ন’ বলা হয়, এই বক্তব্য সেই ধারণাকেই সামনে আনে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বিধি এবং তফসিলি জাতি ও জনজাতির উপর অত্যাচার প্রতিরোধ আইনের মতো ব্যবস্থাগুলির লক্ষ্যও এই ধরনের নিপীড়ন মোকাবিলা করা।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৬ সালের বিধি আসলে দেশব্যাপী বৈষম্যবিরোধী নিয়মাবলি। ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, জাতপাত, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য বন্ধ করাই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু ‘উচ্চবর্ণের’ ছাত্রগোষ্ঠীগুলি এর বিরোধিতা করেছে। তাদের বক্তব্য, এই বিধি তাদের বিরুদ্ধেই বৈষম্যের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট বিধিগুলির কার্যকারিতা স্থগিত রেখেছে। সরকার বর্তমানে সেগুলি পর্যালোচনা করছে।

তাত্ত্বিক অর্থে ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ বলতে এমন একটি ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে জন্মের ভিত্তিতে সামাজিক উঁচুনিচু নির্ধারিত হয় এবং ‘উচ্চবর্ণকে’ ঐতিহাসিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত বলে মনে করা হয়। সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতিকে দেখা হয় এই ব্যবস্থার প্রতিপক্ষ হিসেবে।

প্রশ্ন হল, একসময়ে কংগ্রেসের সমর্থক এবং ১৯৯০ সাল নাগাদ বিজেপির দিকে সরে যাওয়া ‘উচ্চবর্ণের’ মধ্যে যখন অস্বস্তি বাড়ছে, তখন রাহুল গান্ধী কেন দলিত-বহুজনের পরিচয়ভিত্তিক বিষয়গুলিকেই সামনে আনছেন? কেন তিনি শুধু কর্মসংস্থান ও পরীক্ষায় স্বচ্ছতার মতো সমস্ত জাতের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রশ্নে কথা বলছেন না? সাধারণ শ্রেণিভুক্ত ভোটারদের মধ্যে বিজেপির সমর্থন কমছে কি না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা না করেই কেন এই অবস্থান নিচ্ছেন?

কংগ্রেসের এক প্রবীণ নেতা বলেন, গান্ধী বিষয়টিকে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখছেন না। তাঁর কাছে এটি মূল্যবোধ হিসেবে সাম্যের একটি মৌলিক প্রশ্ন। হলদোয়ানির কথিত ঘটনার পরে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে মল্লিকার্জুন খাড়গে জানান, ওই ঘটনায় তিনি গভীরভাবে আহত হয়েছেন। দলের বহু নেতার নীরবতা এবং প্রকাশ্যে পাশে না দাঁড়ানোও তাঁকে আঘাত করেছে। ওই প্রবীণ নেতার কথায়, “দল যদি এই বিষয়ে শক্ত অবস্থানই না নেয়, তা হলে একজন দলিতকে সভাপতি করে রাখার অর্থ কী?”

তাঁর মতে, বিষয়টিকে ‘উচ্চবর্ণ বনাম দলিত’ হিসেবে দেখা ভুল। তিনি বলেন, “সমতাভিত্তিক সমাজের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে রাহুলজি অভূতপূর্ব কিছু করছেন না।” তাঁর সংযোজন, স্বাধীনতার আগে ও পরে কংগ্রেসের নেতারা সমাজ সংস্কারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের অনেকেই ছিলেন ‘উচ্চবর্ণের’ মানুষ।

কংগ্রেসের আর এক নেতা বলেন, গান্ধীর ব্যক্তিত্বই এমন যে কিছু মূল্যবোধের প্রশ্নে তিনি কোনও আপস করেন না। তাঁর কথায়, “তিনি নিজেকে সামাজিক ন্যায়ের যোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। গত তিন বছর ধরে তিনি ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন, সামাজিক ন্যায়ের পথেই কংগ্রেসকে চলতে হবে।”

রাহুলের ছাপ

সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে কংগ্রেসের সওয়াল জোরালো হয়ে ওঠে ২০২৩ সালের কর্নাটক বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে। ওই বছরের ১৬ এপ্রিল কোলারের জনসভায় গান্ধী দাবি করেন, সংরক্ষণের ৫০ শতাংশ ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম করতে হবে এবং ২০১১ সালের জাতিভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

এর পর থেকে তিনি জাতগণনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে শুরু করেন। তাঁর ভাষায়, এটি সমাজের একটি ‘এক্স-রে’, যা সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন। তার আগে, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রায়পুরে কংগ্রেসের ৮৫তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে দল প্রথমবার সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন নিয়ে একটি সর্বাঙ্গীণ প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল।

রাজনীতির এই নতুন অভিমুখ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বজায় রয়েছে। সমস্ত সামাজিক গোষ্ঠীকে এক ছাতার তলায় রাখার কংগ্রেসের পুরনো কাঠামো থেকে এটি একটি বিচ্ছেদ। উত্তর ভারতের রাজনীতিতে ১৯৯০ সাল নাগাদ মণ্ডল ও মন্দিরের প্রভাব বিস্তারের আগে, কংগ্রেসের রমরমার দিনে, তার আধিপত্যের ভিত্তি ছিল এমন এক সামাজিক সমীকরণ, যাকে গবেষক পল ব্রাস বলেছিলেন ‘দুই প্রান্তের জোট’।

‘উচ্চবর্ণ’—বিশেষত ব্রাহ্মণ—মুসলিম এবং দলিতদের সমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে কংগ্রেস একের পর এক নির্বাচনে জয়ী হত। কৃষিজীবী ও কারিগর জাতিগোষ্ঠীগুলির স্বার্থকে দল সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। এই গোষ্ঠীগুলিই পরে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসি হিসেবে পরিচিত হয়। ষাটের দশক থেকে কংগ্রেস-বিরোধিতার অংশ হিসেবে তাদের নিজস্ব রাজনীতির উত্থান ঘটে।

২০২৩ সালের এই পরিবর্তন তাই ‘পুরনো কংগ্রেস’ থেকে সরে আসার পরিচায়ক। এর উপর রাহুল গান্ধীর স্বতন্ত্র ছাপ রয়েছে।

কংগ্রেসের এক নেতা বলেন, কিছু মূল্যবোধে অবিচল থাকার পাশাপাশি এই পরিবর্তনের মধ্যে নির্বাচনী হিসাবও রয়েছে। একে ভোটের ব্যাপারে উদাসীনতা বলে দেখা উচিত নয়।

তাঁর কথায়, “দল বহু বছর ধরেই বুঝে এসেছে, উচ্চবর্ণ বিজেপির মূল ভোটভিত্তি। তাঁদের বাবা-মা কিংবা দাদু-ঠাকুমা কংগ্রেসের ভোটার হয়ে থাকলেও তাঁরা কংগ্রেসকে বেছে নেবেন না। রাহুলজির নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের প্রতি দলিত, আদিবাসী এবং মুসলিমরা তুলনায় বেশি গ্রহণশীল। আমরা বিজেপির কাছ থেকে ওবিসিদের একটি অংশকেও সরিয়ে এনে নিজেদের সামাজিক জোট গড়ে তুলতে চাই।”

আর এক কংগ্রেস নেতা বলেন, যাদব ও জাঠদের মতো প্রভাবশালী ওবিসি জাতিগোষ্ঠীগুলি স্বাভাবিকভাবেই বিজেপিবিরোধী। আঞ্চলিক দলগুলি জমি হারাচ্ছে বলে যখন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তখন এই গোষ্ঠীগুলির সমর্থন আদায়ের সুযোগ রয়েছে কংগ্রেসের সামনে।

কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সম্পাদক চন্দন যাদব বলেন, “বিজেপি সরকার যখন সংবিধানকে দুর্বল করছে, তখন রাহুলজি সংবিধানকে রক্ষা করছেন। তাই এই সমস্ত বক্তব্য ও পদক্ষেপকে সংবিধান রক্ষার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে—তা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নই হোক, কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো।”