প্রাক্তন স্টাসি অফিসার, পর্ন অভিনেতা, নব্য নাৎসি—এএফডির নতুন বিধায়কদের অতীত ঘিরে বিতর্ক

যা জানা জরুরি
- জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে ঐতিহাসিক জয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই নিজেদের নবনির্বাচিত কয়েক জন বিধায়কের অতীত নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে অলটারনেটিভ ফ্যুর ডয়েচলান্ড বা এএফডি।
- তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পূর্ব জার্মানির কুখ্যাত গুপ্তপুলিশ স্টাসির এক প্রাক্তন অফিসার এবং এক প্রাক্তন পর্নোগ্রাফি চলচ্চিত্রের অভিনেতা।
- বৃহস্পতিবার রাজ্যের রাজধানী মাগডেবুর্গে দলের মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ড নবনির্বাচিত বিধায়কদের সংবাদমাধ্যমের সামনে হাজির করেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে ঐতিহাসিক জয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই নিজেদের নবনির্বাচিত কয়েক জন বিধায়কের অতীত নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে অলটারনেটিভ ফ্যুর ডয়েচলান্ড বা এএফডি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পূর্ব জার্মানির কুখ্যাত গুপ্তপুলিশ স্টাসির এক প্রাক্তন অফিসার এবং এক প্রাক্তন পর্নোগ্রাফি চলচ্চিত্রের অভিনেতা।
বৃহস্পতিবার রাজ্যের রাজধানী মাগডেবুর্গে দলের মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ড নবনির্বাচিত বিধায়কদের সংবাদমাধ্যমের সামনে হাজির করেন। সেই উপলক্ষে সামনে আসে তাঁদের কয়েক জনের বিতর্কিত অতীত—অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার ইতিহাস, স্টাসির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং অতি দক্ষিণপন্থী বিভিন্ন চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ।
জার্মান সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, স্যাক্সনি-আনহাল্টের বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করতে চলা এএফডির ৩৯ জন বিধায়কের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁর বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি জাল করার অভিযোগ উঠেছে। রয়েছেন পূর্ব জার্মানির গুপ্তপুলিশ স্টাসির এক প্রাক্তন অফিসারও। আরও কয়েক জন নব্য নাৎসি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ফৌজদারি তদন্তের মুখোমুখি।
দুই বিধায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা নিষিদ্ধ দক্ষিণপন্থী উগ্রবাদী সংগঠন ‘আর্টগেমাইনশাফট’-এর কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। নব্য পৌত্তলিক এই গোষ্ঠী জাতীয়তাবাদী ও ইহুদিবিদ্বেষী ভাবধারা অনুসরণ করে। সরকারি কৌঁসুলির দফতর জানিয়েছে, ওই দু’জনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কমবয়সি বিধায়কের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। দু’জনেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রাক্তন পর্ন অভিনেতা একটি হোটেল থেকে বিপুল পরিমাণ বিছানার চাদর ও অন্যান্য সামগ্রী চুরির অপরাধে দণ্ডিত হয়েছিলেন। স্থানীয় একটি সংবাদপত্রে তাঁর পর্ন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে তিনি তা আদালতে চ্যালেঞ্জ করেন। কিন্তু আদালত নিশ্চিত করে যে, তিনি ওই ধরনের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
জার্মান সংবাদপত্র ‘ডি সাইট’ জানিয়েছে, স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষার শংসাপত্র জাল করার বিষয়টি ধরা পড়ার পরে তাঁকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তবে ওই বিধায়কের দাবি, আইনি লড়াইয়ের পরে তাঁকে ফের ভর্তি নেওয়া হয়।
অন্য দিকে, নিজের নির্বাচনী এলাকা থেকে সরাসরি জয়ী ৭৮ বছর বয়সি প্রাক্তন স্টাসি অফিসার স্বীকার করেছেন যে, তিনি কমিউনিস্ট শাসিত পূর্ব জার্মানির রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রকে কাজ করতেন। তাঁর কাজ মূলত ছিল সেই সব পূর্ব জার্মান নাগরিককে নিয়ে, যাঁরা স্থায়ী ভাবে দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইতেন।
পূর্ব জার্মানির স্বৈরশাসনের নিপীড়িতদের হয়ে কাজ করা সংগঠনগুলি তাঁর বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার সমালোচনা করেছে।
জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম জেডডিএফের একটি অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে, এএফডির নবনির্বাচিত কয়েক জন বিধায়কের সঙ্গে দক্ষিণপন্থী উগ্রবাদী সংগঠনের যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের কয়েক জন আগের বিধানসভাতেও দলের প্রতিনিধি ছিলেন। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ ‘হোমল্যান্ড-লয়াল জার্মান ইয়ুথ’ বা এইচডিজে-র সদস্য ছিলেন। সংগঠনটি পরে নিষিদ্ধ হয়। তাঁদের এক জন এক সময়ে ওই সংগঠনের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন। অন্য দিকে, এএফডির পরিষদীয় দলের এক উপদেষ্টার লেখা একটি জীবনীকে ‘নাৎসিবাদের বন্দনা’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
নতুন বিধায়কদের মধ্যে কয়েক জনের ক্রেমলিনপন্থী যোগাযোগও রয়েছে। আবার কেউ কেউ ওয়াশিংটনে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ বা মাগা আন্দোলনের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছেন।
বিধায়কদের এই বিতর্কিত অতীত, বিশেষত ফৌজদারি তদন্তের মুখে থাকা দুই প্রতিনিধিকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জিগমুন্ড তাঁদের ঠাট্টার ছলে ‘দুষ্টু লোক’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, “আমরা তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করব। তার পরে আলোচনা করব।”
সুগন্ধির প্রাক্তন বিক্রেতা জিগমুন্ড বৃহস্পতিবার সর্বসম্মত ভাবে ফের এএফডির পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন।
তবে নতুন পরিষদীয় দলকে পরিচয় করানোর অনুষ্ঠানেই তিনি নিজেও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। জার্মানিতে অস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে তিনি দলের পরিকল্পিত ব্যাপক বহিষ্কার অভিযানের যোগসূত্র টানেন।
রাজ্যে একটি ইজরায়েলি অস্ত্র সংস্থার কারখানা খোলার পরিকল্পনা নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জিগমুন্ড বলেন, “আমরা অস্ত্র উৎপাদনের নিঃশর্ত বিরোধিতা করি না। কারণ ভবিষ্যতে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো ও বহিষ্কার অভিযান চালাতে অবশ্যই আমাদের উপযুক্ত সরঞ্জামের প্রয়োজন হবে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আমাদের নিজেদের অস্থিরতা এবং জাতীয় প্রতিরক্ষার স্বার্থেও এর প্রয়োজন রয়েছে।”
তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে সরব হন রাজনৈতিক বিরোধীরা। স্যাক্সনি-আনহাল্টে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা এসপিডির পরিষদীয় নেত্রী কাটিয়া পেলে বলেন, “রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে হিংসা” ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়ে জিগমুন্ড আসলে একটি “রাজনৈতিক হুমকি” দিয়েছেন।
তাঁর কথায়, “এর মধ্যে দিয়ে এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার কুৎসিত মুখ প্রকাশ পেল, যার ভাষা ও চিন্তাভাবনা আবারও সর্বগ্রাসী শাসনের নমুনাগুলির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।”
এএফডি রাজ্যে সরকার গড়তে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে অন্য দলের সমমনস্ক কয়েক জন বিধায়ক দলত্যাগ করে তাদের দিকে আসেন কি না, অথবা কোনও একটি দল তাদের সমর্থন করতে রাজি হয় কি না, তার উপরে। সরকার গড়তে পারলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিতে ক্ষমতায় আসা প্রথম অতি দক্ষিণপন্থী দল হবে এএফডি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এএফডি ৪৭ শতাংশ আসন পেয়েছে। রাজ্যের মোট ৮৩টি আসনের মধ্যে তাদের দখলে অর্ধেকের সামান্য কম। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে তারা তিনটি আসন দূরে। এখনও পর্যন্ত মূলধারার দলগুলি এএফডির সঙ্গে জোটে যেতে অস্বীকার করেছে।
গত রবিবারের নির্বাচনে এএফডির জয়ের প্রতিবাদে এই সপ্তাহান্তে জার্মানির ২০টিরও বেশি শহরে বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যেই আগামী ২০ সেপ্টেম্বর বার্লিন এবং মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে আরও দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচন। সেখানেও এএফডি ভাল ফল করতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



