হাইলাইটস:

  • দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে ‘প্রয়োজনভিত্তিক’ সরকারি অনুদানের ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
  • প্রশ্ন উঠছে, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উৎসবের জন্য করদাতার অর্থ ব্যয় করা আদৌ কতটা যুক্তিযুক্ত।
  • অনুদানের পক্ষে যেমন অর্থনৈতিক ও সামাজিক যুক্তি রয়েছে, তেমনই রয়েছে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও আর্থিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন।
  • বিতর্কের কেন্দ্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন: সরকার কি উৎসবের পৃষ্ঠপোষক, নাকি জনসেবার রক্ষক?

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একটি বৃহৎ সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান, পর্যটন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্পী ও কারিগরদের জীবিকা এই উৎসবকে ঘিরে আবর্তিত হয়। ফলে দুর্গাপুজোকে ঘিরে সরকারি ভূমিকা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী যখন ইঙ্গিত দিলেন যে পুজো কমিটিগুলিকে “প্রয়োজনভিত্তিক” সরকারি সহায়তা বা অনুদান দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, তখন পুরনো বিতর্ক আবার নতুন করে সামনে চলে এসেছে।

প্রশ্নটি সরল, কিন্তু তার উত্তর জটিল।

সরকার আদৌ কেন পুজো কমিটিকে অনুদান দেবে?

আরও স্পষ্ট করে বললে, একজন করদাতার পকেট থেকে সংগৃহীত অর্থ কি কোনও ধর্মীয় বা আধা-ধর্মীয় উৎসবের জন্য ব্যয় হওয়া উচিত?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগের চেয়ে নীতির দিকে তাকাতে হয়।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান কাজ কী? শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, পরিকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। নাগরিকরা কর দেন এই কারণেই যে রাষ্ট্র তাদের জন্য প্রয়োজনীয় জনসেবা সরবরাহ করবে।

সেই অর্থ যদি সরাসরি কোনও উৎসব কমিটিকে দেওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটি কি রাষ্ট্রের মূল দায়িত্বের মধ্যে পড়ে?

পুজো কমিটির অনুদানের সমর্থকেরা অবশ্য ভিন্ন যুক্তি দেন। তাঁদের বক্তব্য, দুর্গাপুজো এখন কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক শিল্প। কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এই উৎসবকে ঘিরে সৃষ্টি হয়। প্রতিমাশিল্পী, আলোকসজ্জা কর্মী, বাঁশ-তাঁবুর শ্রমিক, পরিবহণ কর্মী, খাবারের দোকানদার—অসংখ্য মানুষ এই সময়ে আয় করেন। ফলে সরকারি অনুদানকে তারা এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখতে চান।

এই যুক্তি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। কিন্তু পাল্টা প্রশ্নও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

যদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই অনুদানের একমাত্র মানদণ্ড হয়, তাহলে বইমেলা, নাট্যদল, লোকসংস্কৃতি উৎসব, ছোট প্রকাশনা, বিজ্ঞান মেলা, ক্রীড়া ক্লাব কিংবা গ্রামীণ হস্তশিল্প মেলাগুলিও কি সমপরিমাণ সহায়তা পাওয়ার অধিকারী নয়?

রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক প্রভাবের যুক্তিতে অনুদান দেয়, তাহলে সেই নীতি সর্বজনীন হওয়া উচিত। শুধুমাত্র রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান বা ভোট-প্রভাবিত ক্ষেত্রগুলির জন্য আলাদা ব্যবস্থা হলে তা বৈষম্যের অভিযোগ ডেকে আনবে।

এখানেই আসে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার প্রশ্ন।

ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণাকে স্বীকৃতি দেয়। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মবিরোধিতা নয়, বরং রাষ্ট্রের সমদূরত্ব। রাষ্ট্র কোনও ধর্মকে বিশেষ সুবিধা দেবে না, আবার কোনও ধর্মকে বঞ্চিতও করবে না।

বাস্তবে অবশ্য বহু সরকার বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, তীর্থযাত্রা বা উৎসবের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা দিয়েছে। ফলে বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। কিন্তু একটি ভুল দীর্ঘদিন ধরে চলেছে বলেই তা সঠিক হয়ে যায় না।

দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হল জবাবদিহির অভাব।

সরকারি অর্থ মানেই জনতার অর্থ। সেই অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হল, তার হিসাব থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ পুজো কমিটির ক্ষেত্রে সেই স্বচ্ছতা কতটা আছে?

অনুদান পাওয়া কমিটিগুলির আর্থিক নিরীক্ষা কি বাধ্যতামূলক? তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব কি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত? কতগুলি কমিটি সত্যিই আর্থিক সংকটে এবং কতগুলি ইতিমধ্যেই বড় কর্পোরেট স্পনসরশিপ পাচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর সাধারণ মানুষ খুব কমই পান। ফলে সরকারি অনুদান অনেক সময় সাংস্কৃতিক সহায়তার চেয়ে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চেহারা পায়।

এখানেই বিতর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি রয়েছে।

রাজনীতিবিদরা জানেন, দুর্গাপুজো পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক জীবনের কেন্দ্রে রয়েছে। হাজার হাজার পুজো কমিটি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। ফলে অনুদান কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলারও একটি উপায় হয়ে উঠতে পারে।

এই আশঙ্কা নতুন নয়। অতীতেও বিরোধীরা অভিযোগ করেছে যে অনুদান ব্যবস্থা উৎসবের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর “প্রয়োজনভিত্তিক” শব্দটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

যদি সত্যিই প্রয়োজনভিত্তিক ব্যবস্থা হয়, তাহলে প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে ‘প্রয়োজন’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে। গ্রামের ছোট পুজো, যাদের আর্থিক সংস্থান সীমিত, তারা কি অগ্রাধিকার পাবে? নাকি শহরের বড় ও প্রচারমুখী পুজোগুলিও একইভাবে সরকারি সহায়তা পাবে?

এই মানদণ্ড কে ঠিক করবে? সরকারি আধিকারিক? স্থানীয় প্রশাসন? নাকি রাজনৈতিক বিবেচনা?

স্বচ্ছ মানদণ্ড ছাড়া ‘প্রয়োজন’ শব্দটি সহজেই বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে।

আরও একটি বৃহত্তর প্রশ্ন রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ এখনও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পৌর পরিষেবা, রাস্তা, পানীয় জল এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ, গ্রামীণ সড়ক মেরামত কিংবা নগর পরিষেবার উন্নতির জন্য অর্থের প্রয়োজন সবসময়ই থাকে।

সেই পরিস্থিতিতে করদাতারা স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইবেন—সরকারের সীমিত সম্পদের অগ্রাধিকার কী? একটি উৎসব কমিটির অনুদান, নাকি একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উন্নয়ন? একটি আলোকসজ্জা প্রকল্প, নাকি একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ? এগুলি আবেগের নয়, নীতিনির্ধারণের প্রশ্ন।

দুর্গাপুজো অবশ্যই বাঙালির গর্ব। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক উৎসব। কিন্তু কোনও উৎসবের গুরুত্ব যতই বড় হোক, রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকদের আছে। কারণ গণতন্ত্রে সরকার কোনও রাজনৈতিক দলের নয়; সরকার করদাতার। আর করদাতার অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, যুক্তি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিই হওয়া উচিত শেষ কথা।

সুতরাং মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে একটি মৌলিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। প্রশ্নটি দুর্গাপুজোর পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। প্রশ্নটি হল রাষ্ট্রের চরিত্র কী হবে।

সরকার কি উৎসবের আয়োজক হবে, নাকি জনসেবার অভিভাবক?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে করদাতার অর্থ কোন পথে প্রবাহিত হবে। আর সেই উত্তর শুধু পুজো কমিটির নয়, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার বিষয়।