হাইলাইটস:
- বিশ্বের প্রায় ১৮০টি মুদ্রা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দু এখনও মার্কিন ডলার।
- ডলারের আধিপত্য আমেরিকাকে যুদ্ধ না করেও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের শক্তি দেয়।
- রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিলসহ বহু দেশ ডলারের বিকল্প খুঁজছে।
- তবুও ইউরো বা চীনা ইউয়ান এখনও ডলারের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি।
- ইতিহাস বলছে, কোনো আধিপত্যশীল মুদ্রাই চিরস্থায়ী নয়।
বাংলাস্ফিয়ার: দুনিয়ায় প্রায় ১৮০টি স্বীকৃত মুদ্রা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক ঋণ, জ্বালানি কেনাবেচা, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার কিংবা সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে একটি মুদ্রাই প্রায় সর্বত্র রাজত্ব করছে—মার্কিন ডলার।
এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা নয়, বরং আমেরিকার বিশ্বশক্তি হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশ্বের বহু দেশ যখন নিজেদের মুদ্রা নিয়ে লড়াই করছে, তখন ডলার এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ও প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস করে যে তাদের সম্পদ, সঞ্চয় বা রিজার্ভের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আমেরিকাই।
ডলারের এই প্রভাবের ফলে আমেরিকা এমন এক ক্ষমতা অর্জন করেছে যা অনেক সময় সামরিক শক্তির চেয়েও কার্যকর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চাইলে ওয়াশিংটনের হাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় তাদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়া।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করায় ইউরোপীয় ব্যাংকগুলিকে জরিমানা কিংবা আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি—এসবই সম্ভব হয়েছে ডলারের কেন্দ্রীয় অবস্থানের কারণে। অর্থাৎ, একটি দেশের মুদ্রা হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অস্ত্র।
এই আধিপত্য কিন্তু হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, পরিকল্পিত নীতি এবং কয়েক দশকের প্রতিষ্ঠানগত নির্মাণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস ব্যবস্থার মাধ্যমে ডলার আন্তর্জাতিক অর্থনীতির কেন্দ্রস্থলে আসে। পরে স্বর্ণের সঙ্গে ডলারের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হলেও তার প্রভাব কমেনি।
বরং একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে—ইউরোডলার বাজার। এর মাধ্যমে আমেরিকার বাইরে অবস্থিত ব্যাংকগুলোও ডলারে লেনদেন ও ঋণদান শুরু করে। ফলে ডলার কার্যত একটি বৈশ্বিক মুদ্রায় পরিণত হয়। সংকটের সময়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ডলারের জোগান দিয়ে এই ব্যবস্থাকে রক্ষা করেছে।
আরেকটি বড় কারণ হলো মার্কিন সরকারি বন্ড বাজারের গভীরতা ও স্থিতিশীলতা। বিশ্বের কোনো দেশ যদি শত শত বিলিয়ন ডলার নিরাপদে সংরক্ষণ করতে চায়, তাহলে তার সামনে বাস্তবিক অর্থে বিকল্প খুব কম। মার্কিন ট্রেজারি বন্ড এখনও সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে তরল নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
আমেরিকার বিশাল ভোক্তা বাজার এবং তার সামরিক উপস্থিতিও ডলারের শক্তিকে বাড়িয়েছে। বহু দেশ জানে, ডলারে বাণিজ্য করলে শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই নয়, একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক কাঠামোর সুবিধাও পাওয়া যায়।
কিন্তু এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে অসন্তোষও বাড়ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকা ডলারকে ক্রমশ অর্থনৈতিক যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, এমনকি ভারতও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। ব্রিকস জোটের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ, ইউয়ানে তেল কেনাবেচা কিংবা দ্বিপাক্ষিক মুদ্রা বিনিময় চুক্তি—সবই সেই প্রচেষ্টার অংশ।
তবে বাস্তবতা হলো, ডলারের বিকল্প তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন।
ইউরোপের ইউরো রয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন ঋণবাজার এখনও মার্কিন ট্রেজারি বাজারের মতো নয়। রাজনৈতিক ঐক্যের অভাবও বড় বাধা।
অন্যদিকে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হলেও ইউয়ানকে পুরোপুরি মুক্ত করেনি। বিদেশি বিনিয়োগকারী চাইলে অবাধে অর্থ ঢোকাতে বা বের করতে পারেন না। চীনা সরকার পুঁজির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ইউয়ানের ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা সীমিত।
তার ওপর রয়েছে তথাকথিত ‘নেটওয়ার্ক প্রভাব’। সবাই ডলার ব্যবহার করে কারণ সবাই ডলার ব্যবহার করে। একটি মুদ্রার শক্তি শুধু তার দেশের অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে কত মানুষ সেটি ব্যবহার করছে তার ওপরও। একবার কোনো মুদ্রা বৈশ্বিক মানদণ্ড হয়ে গেলে তাকে সরানো অত্যন্ত কঠিন।
তবে ডলারের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। আমেরিকার বিপুল বাজেট ঘাটতি, দ্রুত বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক উদ্বেগ তৈরি করছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আমেরিকা যদি নিজের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা হারায়, তাহলে ডলারের প্রতি আস্থাও ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে পারে।
ইতিহাসও সতর্কবার্তা দেয়। একসময় বিশ্বের প্রধান মুদ্রা ছিল ডাচ গিল্ডার। পরে ব্রিটিশ পাউন্ড সেই স্থান দখল করে। শেষ পর্যন্ত পাউন্ডকে সরিয়ে ডলার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ কোনো মুদ্রার শাসন চিরস্থায়ী নয়।
তবুও বর্তমান বাস্তবতায় ডলারের বিকল্প এখনও দূরের স্বপ্ন। বিশ্বের বহু দেশ আমেরিকার ক্ষমতায় অস্বস্তি বোধ করলেও তারা এমন কোনো বিকল্প গড়ে তুলতে পারেনি যা একই সঙ্গে নিরাপদ, স্বচ্ছ, তরল এবং সর্বজনগ্রাহ্য।
ফলে আপাতত বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ডলারই রয়েছে। কিন্তু সেই আধিপত্য বজায় রাখতে আমেরিকাকে শুধু শক্তিশালী থাকলেই হবে না, দায়িত্বশীলও থাকতে হবে। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা হলো—বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রাও একদিন তার সিংহাসন হারাতে পারে।