হাইলাইটস:

  • স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন ভাষণ দিতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েন গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই।
  • গুগলের ইসরায়েল সরকারের সঙ্গে প্রজেক্ট নিম্বাস চুক্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রতিবাদকারীরা।
  • মার্কিন অভিবাসন দমন অভিযানে গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগও উঠে আসে।
  • পরিবেশগত ক্ষতি, ছাঁটাই এবং এআই-কেন্দ্রিক ব্যবসায়িক নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ স্পষ্ট হয়।
  • বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: স্টেজে উঠেই যদি কাউকে দুয়ো শুনতে হয়, বিদ্রুপের মুখে পড়তে হয়, কিংবা দর্শকদের একাংশ যদি সভাস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যায়, তবে সেটি যে কোনও বক্তার কাছে দুঃস্বপ্নের সমান। বিশেষ করে তিনি যদি পেশাদার রাজনীতিক না হয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী হন, তাহলে সেই ঘটনার তাৎপর্য ব্যক্তিগত অস্বস্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাইয়ের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই কারণেই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি যে বিক্ষোভ, স্লোগান এবং প্রতীকী প্রতিবাদের মুখোমুখি হলেন, তা শুধু একজন কর্পোরেট নেতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়; বরং প্রযুক্তি শিল্পের সামাজিক ভূমিকা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।

অবশ্য শিক্ষাঙ্গনে শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নতুন ঘটনা নয়। অতীতেও বিভিন্ন কর্পোরেট নেতা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ঘিরে যে উদ্বেগ বিশ্বজুড়ে বাড়ছে, তার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে মানবাধিকার, পরিবেশ এবং রাজনৈতিক নীতির প্রশ্ন।

পিচাই তাঁর ভাষণে এআই নিয়ে প্রায় কিছুই বলেননি। কিন্তু উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের হাতে ধরা ব্যানার, ফিলিস্তিনি কেফিয়েহ স্কার্ফ এবং স্লোগানই যেন সেই অনুচ্চারিত বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। গুগলের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল সরকারের সঙ্গে ১.২ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট নিম্বাস চুক্তি, যার মাধ্যমে ক্লাউড ও এআই পরিষেবা সরবরাহ করা হচ্ছে।

এছাড়া মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক দপ্তর (ICE)-এর অভিযানে গুগলের প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশের দাবি, এই প্রযুক্তি অবৈধ অভিবাসী সন্দেহে বহু মানুষের বিরুদ্ধে কঠোর ও কখনও ভুল পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে, গুগলের ডেটা সেন্টারগুলোর পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের মতে, বিপুল বিদ্যুৎ ও জল ব্যবহারের ফলে স্থানীয় পরিবেশের উপর চাপ বাড়ছে।

ফলে পিচাই এমন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন, যেখানে তিনি একদিকে সম্ভাব্য নিয়োগকর্তা, অন্যদিকে প্রতিবাদকারীদের চোখে বিতর্কিত এক কর্পোরেট ব্যবস্থার প্রতীক।

এই ক্ষোভের পেছনে আরেকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। প্রযুক্তি শিল্পে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক ছাঁটাই কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। গুগল নিজেই এআই বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ক্লাউড বিভাগে কর্মী ছাঁটাই করেছে বলে খবর। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের মে মাসে মেটা প্রায় ৮,০০০ কর্মীকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়, যা তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ১০ শতাংশ।

এই প্রেক্ষাপটে স্ট্যানফোর্ডের নতুন স্নাতকদের কাছে ভবিষ্যৎ খুব একটা নিশ্চিন্ত বলে মনে হওয়ার কথা নয়। প্রযুক্তি খাতের চাকরি, যা একসময় নিরাপদ ও আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত হতো, এখন সেখানে এআই-নির্ভর পুনর্গঠন ও কর্মসংস্থান সংকোচনের আশঙ্কা বাড়ছে।

পিচাই তাঁর ভাষণে বারবার “ক্যালিফোর্নিয়ার আশাবাদ”-এর কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু এমন এক সময়ে, যখন প্রযুক্তির অগ্রগতি যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি নৈতিকতা, মানবাধিকার এবং কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগও বাড়াচ্ছে, তখন সেই আশাবাদকে নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করা অনেকের পক্ষেই কঠিন।

স্ট্যানফোর্ডের এই ঘটনা তাই কেবল একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানের বিঘ্ন নয়। এটি একটি বৃহত্তর বার্তা বহন করে—বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি সংস্থাগুলো যত শক্তিশালী হচ্ছে, তাদের প্রতি সামাজিক জবাবদিহির দাবিও তত জোরালো হচ্ছে। আর নতুন প্রজন্ম স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে প্রযুক্তিগত সাফল্যই যথেষ্ট নয়; সেই সাফল্যের নৈতিক মূল্যও তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।