অলিম্পিক পদকজয়ী ব্যাডমিন্টন তারকা সাইনা নেহওয়াল সম্প্রতি জানিয়েছেন, আর্থ্রাইটিসের কারণে তাঁকে প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলো থেকে সরে আসতে হয়েছে। প্রায় ২৫ বছর ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলাধুলো করার পরে তাঁর এই শারীরিক সমস্যা নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—দীর্ঘদিন ধরে তীব্র অনুশীলন, বারবার লাফানো, দ্রুত দিক পরিবর্তন এবং পুরনো চোট কি কম বয়সেই অস্থিসন্ধির ক্ষয় বা আর্থ্রাইটিস ডেকে আনতে পারে?
সাইনা তাঁর দীর্ঘ ক্রীড়াজীবনের শারীরিক ও মানসিক চাপের কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, ২৫ বছর ধরে কোনও একটি খেলা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর। প্রতিটি দিনই নতুন চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য শরীরের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। সেই কঠিন জীবন থেকে সরে আসার পরে এখন জীবন কিছুটা সহজ মনে হচ্ছে তাঁর।
কম বয়সেই কি আর্থ্রাইটিস হতে পারে খেলোয়াড়দের?
কেআইএমএস হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের প্রধান ও জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জন ডা. সঞ্জীব জৈনের মতে, দীর্ঘদিন প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলো করলে কম বয়সেই আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের অস্থিসন্ধিকে বছরের পর বছর অত্যন্ত বেশি চাপ সহ্য করতে হয়।
যে সব খেলায় ঘন ঘন লাফাতে হয়, আচমকা দিক পরিবর্তন করতে হয় অথবা অস্থিসন্ধির উপর বারবার প্রবল অভিঘাত পড়ে, সেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অস্থিসন্ধির ভিতরে থাকা সুরক্ষাকারী তরুণাস্থি বা কার্টিলেজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আগে গুরুতর চোট লাগলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। লিগামেন্টে আঘাত, মেনিসকাস ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা হাড় ভাঙার মতো ঘটনা অস্থিসন্ধির স্বাভাবিক কার্যপ্রণালী বদলে দিতে পারে। তার ফলে কার্টিলেজের ক্ষয় দ্রুত হতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন খেলাধুলো করলেই যে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের আর্থ্রাইটিস হবে, তা নয়। দীর্ঘ ক্রীড়াজীবনের সঙ্গে পুরনো গুরুতর চোট যুক্ত হলে সাধারণ মানুষের তুলনায় কম বয়সে অস্টিওআর্থ্রাইটিস দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
কোন লক্ষণগুলি উপেক্ষা করা উচিত নয়
আর্থ্রাইটিসের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় খুবই সামান্য হয়। ফলে খেলোয়াড়রা সেগুলিকে সাধারণ ব্যথা বা অনুশীলনের স্বাভাবিক ফল বলে ধরে নিতে পারেন। কিন্তু কয়েকটি লক্ষণের দিকে বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন—
- অস্থিসন্ধিতে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা
- সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে অথবা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পরে জড়তা
- অস্থিসন্ধির চারপাশ ফুলে যাওয়া
- নমনীয়তা কমে যাওয়া
- নড়াচড়ার সময় কটকট বা ঘর্ষণের মতো অনুভূতি
- শরীরচর্চা বা খেলাধুলার সময় বারবার ব্যথা ফিরে আসা
- অনুশীলনের পরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগা
অস্থিসন্ধির ব্যথা কয়েক সপ্তাহ ধরে চললে, বারবার ফিরে এলে, খেলাধুলার ক্ষমতা কমিয়ে দিলে অথবা তার সঙ্গে ফোলা ও অস্থিসন্ধির অস্থিরতা দেখা দিলে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দ্রুত রোগ নির্ণয় করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগের অগ্রগতি ধীর করা এবং অস্থিসন্ধির কার্যক্ষমতা দীর্ঘদিন বজায় রাখা সম্ভব।
আর্থ্রাইটিস হলে কি শরীরচর্চা বন্ধ করতে হবে?
আর্থ্রাইটিস ধরা পড়া মানেই শরীরচর্চা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত পদ্ধতিতে সক্রিয় থাকা অস্থিসন্ধির স্বাস্থ্য বজায় রাখার অন্যতম কার্যকর উপায়।
তবে উচ্চ অভিঘাতযুক্ত শরীরচর্চার পরিবর্তে অস্থিসন্ধির পক্ষে তুলনামূলক নিরাপদ ব্যায়াম বেছে নেওয়া প্রয়োজন। সাঁতার, সাইকেল চালানো, হাঁটা, যোগব্যায়াম এবং বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম উপকারী হতে পারে।
অস্থিসন্ধির চারপাশের পেশি শক্তিশালী হলে সংশ্লিষ্ট অস্থিসন্ধির স্থিতিশীলতা বাড়ে এবং ব্যথা কমাতেও সাহায্য করতে পারে।
এর পাশাপাশি শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ফিজিয়োথেরাপি, উপযুক্ত জুতো ব্যবহার এবং দৈনন্দিন শারীরিক কর্মকাণ্ডের ধরনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরকে সচল রাখা, একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত অস্থিসন্ধির উপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া।
সাইনা নেহওয়ালের অভিজ্ঞতা তাই শুধু একজন ক্রীড়াবিদের অবসরের গল্প নয়। দীর্ঘদিন উচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলো শরীরের উপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং অস্থিসন্ধির ছোটখাটো সতর্কসংকেতকে কেন অবহেলা করা উচিত নয়, তাঁর অভিজ্ঞতা সেই বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ্য তথ্য এবং বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। কোনও নতুন ব্যায়াম, চিকিৎসা বা দৈনন্দিন রুটিন শুরু করার আগে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।