ভারতের ‘আঙ্কেলতন্ত্র’: তরুণদের উপর মধ্যবয়সী জ্ঞানদাতাদের শাসন

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের সর্বজনীন চরিত্রগুলির মধ্যে অন্যতম হল 'আঙ্কেল' যিনি সব জানেন, সব বোঝেন এবং সব বিষয়ে মতামত দেন।
- তরুণ প্রজন্মকে অলস, দিশাহীন ও শৃঙ্খলাহীন বলে দাগিয়ে দেওয়া ভারতীয় আঙ্কেলদের অন্যতম প্রিয় কাজ।
- আদালত, সরকার, শিক্ষা ও সমাজ সব ক্ষেত্রেই মধ্যবয়সী পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রভাব স্পষ্ট।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের সর্বজনীন চরিত্রগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘আঙ্কেল’ যিনি সব জানেন, সব বোঝেন এবং সব বিষয়ে মতামত দেন। তরুণ প্রজন্মকে অলস, দিশাহীন ও শৃঙ্খলাহীন বলে দাগিয়ে দেওয়া ভারতীয় আঙ্কেলদের অন্যতম প্রিয় কাজ। আদালত, সরকার, শিক্ষা ও সমাজ সব ক্ষেত্রেই মধ্যবয়সী পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রভাব স্পষ্ট। “ককরোচ জনতা পার্টি”র উত্থান তরুণদের জমে থাকা ক্ষোভের এক ব্যঙ্গাত্মক বিস্ফোরণ। চাকরি, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও ভারতের তরুণরা এখনও বিদ্রোহের বদলে রসিকতাকেই বেছে নিচ্ছে।
“শোনো, আমি তোমাকে বলি…”
আমি তোমাকে বলি, কীভাবে একজন ভারতীয় আঙ্কেলকে চেনা যায়। সবচেয়ে নির্ভুল লক্ষণ হল তাঁর প্রিয় বাক্য — “শোনো, আমি তোমাকে বলি…”। এর পরে অবধারিতভাবে শুরু হয় দেশের প্রকৃত সমস্যাগুলি নিয়ে এক দীর্ঘ বক্তৃতা। কখনও তা পেশা নির্বাচন সম্পর্কে (“সাহিত্য পড়ে শুধু মেয়েরাই”), কখনও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে (“পাঁচটা ভেজানো বাদাম খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে”)।
কিন্তু ভারতীয় আঙ্কেলের আসল পরিচয় অন্যত্র। তিনি তরুণ প্রজন্মকে গভীর অবজ্ঞার চোখে দেখেন। আজকের যুবসমাজ তাঁর কাছে মোবাইল-আসক্ত, নরমপালিশ করা, দায়িত্বজ্ঞানহীন একদল মানুষ। এদের দরকার কঠোর শাসন, শৃঙ্খলা এবং নিয়ন্ত্রণ।
ধর্ম, জাত, ভাষা — সব বিভাজন অতিক্রম করে ভারতীয় আঙ্কেল এক সর্বজনীন সত্তা। মধ্যবয়সে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই যেন তিনি সর্বজ্ঞতার অধিকার লাভ করেন। হোয়াটসঅ্যাপে তিনি নিরলসভাবে ‘আঙ্কেল ধর্ম’ প্রচার করেন। তবে সাধারণ আঙ্কেলের ক্ষমতা সাধারণত নিজের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু যারা দেশ চালান, সেই আঙ্কেলদের ক্ষেত্রে তা নয়। তাঁরা নিজেদের সেকেলে ধারণাগুলি পুরো জাতির উপর চাপিয়ে দেন। ভারত কার্যত আঙ্কেলদের প্রজাতন্ত্র — আঙ্কেলদের দ্বারা, আঙ্কেলদের জন্য, আঙ্কেলদের শাসন।
প্রাপ্তবয়স্কদেরও শিশু ভাবার প্রবণতা
এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় অদ্ভুত সব নীতি। গুজরাটে প্রস্তাব ওঠে, প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের জন্যও বাবা-মায়ের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হোক। গোয়ায় সরকারি কলেজের প্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রছাত্রীদের জন্য ইউনিফর্ম বাধ্যতামূলক। দিল্লিতে একজন নাগরিক ১৮ বছর বয়সে ভোট দিতে পারে, ২১ বছর বয়সে বিয়ে করতে পারে, কিন্তু ২৫ বছর বয়স না হলে বিয়ার খেতে পারে না। রাষ্ট্র যেন বারবার বলছে — “তোমরা বড় হওনি, আমরা জানি তোমাদের জন্য কী ভালো।”
বিচারব্যবস্থাতেও আঙ্কেলতন্ত্র
ভারতের উচ্চ আদালতগুলির বিচারপতিদের মধ্যে ৮৫ শতাংশেরও বেশি মধ্যবয়সী পুরুষ। ফলে আদালতের পর্যবেক্ষণেও মাঝেমধ্যে আঙ্কেলসুলভ উপদেশের ছাপ স্পষ্ট। ২০২৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট তরুণীদের উদ্দেশে বলেছিল, “দুই মিনিটের যৌনসুখ উপভোগ করার বদলে যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।” কর্নাটকের এক বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন, সামাজিক মাধ্যমে প্রবেশাধিকার ১৮ বছর, এমনকি ২১ বছর পর্যন্তও সীমাবদ্ধ করা গেলে “দেশের মঙ্গল” হবে।
আর ১৫ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন — “অনেক তরুণ আরশোলার মতো। তাদের চাকরি নেই, পেশায় কোনও জায়গা নেই।” এই মন্তব্যই পরবর্তী ঝড়ের সূচনা করে।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’র জন্ম
প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের এক দিনের মধ্যেই বোস্টনে পড়াশোনা করা এক ভারতীয় ছাত্র মজা করে একটি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করে — “ককরোচ জনতা পার্টি”। কৌতুক হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। ইনস্টাগ্রামে সংগঠনটির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লক্ষ ছাড়িয়ে যায় যা শাসক বিজেপির অনুসারীর সংখ্যারও দ্বিগুণের বেশি। দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা, তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ ও অবমূল্যায়নের অনুভূতি যেন এক ব্যঙ্গাত্মক প্রতীকে রূপ নেয়।
পরে প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা করেন, তিনি আসলে ভুয়ো আইন ডিগ্রিধারীদের কথা বলছিলেন। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি এটাও যোগ করেন — “যুবসমাজ আমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে।” প্রত্যেক আঙ্কেলই এই বিশ্বাস পোষণ করেন। এবং সেটাই তাঁদের সবচেয়ে বড় ভ্রম।
সমালোচনার মুখে আঙ্কেলদের প্রতিক্রিয়া
একজন আঙ্কেলের কাছে সমালোচনার মোকাবিলার পদ্ধতি খুবই সীমিত। বাড়িতে এর প্রকাশ — “বেশি মুখে মুখে কথা বলো না।” রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও খুব আলাদা নয়। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ জনপ্রিয় হওয়ার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলি “জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ”-এর কথা বলতে শুরু করে। সরকার সংগঠনটির এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, কারণ সেটি নাকি ভারতের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। বিজেপির এক নেতা এটিকে “সীমান্ত-পার থেকে পরিচালিত প্রভাব বিস্তারের অভিযান” বলে অভিহিত করেন। ভারতীয় আঙ্কেলের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন যে তরুণদের নিজস্বমতামত, স্বাধীন চিন্তাভাবনা বা রাজনৈতিক সক্রিয়তা থাকতে পারে।
সমস্যার কারণ নয়, দোষ যুবসমাজের
ভারতের জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। প্রতি বছর প্রায় ৫০ লক্ষ স্নাতক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নিয়মিত বেতনের চাকরি পায়। চাকরি হচ্ছে না কেন, অর্থনীতি এত মানুষকে শোষণ করতে পারছে না কেন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে এত বিশাল ফারাক কেন – এইসব প্রশ্ন নিয়ে আঙ্কেলদের খুব একটা আগ্রহ নেই । এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেয়ে তরুণদের দোষারোপ করা অনেক সহজ।
কয়েক বছর আগে প্রবীণ শিল্পপতি নারায়ণ মূর্তি তরুণদের সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টা কাজ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, বলেছিলেন “ভারতের আরও শক্তিশালী কর্মসংস্কৃতি দরকার।” অন্য এক কর্পোরেট কর্তা আরও এক ধাপ এগিয়ে ৯০ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহের পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল — “বাড়িতে বসে কী করো? আর কতক্ষণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকবে?”
আসলেই কি তরুণরা অলস?
বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতের বহু তরুণ ইতিমধ্যেই সেই ৭০ বা ৯০ ঘণ্টা কাজ করছে। তারা স্কুলে যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, কোচিং ক্লাসে যায়, বাড়ি ফিরে আবার পড়াশোনা করে। মে মাসে ২০ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী মাত্র ১ লক্ষ ৩০ হাজার মেডিকেল আসনের জন্য জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় বসেছিল। নয় দিন পরে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় সেই পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। একই মাসে ১৮ লক্ষ ছাত্রছাত্রী দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার ফল পায়, সেই ফলাফলও ভুলভ্রান্তিতে ভরা ছিল। দুটি ঘটনাই এখন সংসদীয় কমিটির তদন্তের আওতায়। অর্থাৎ, আঙ্কেলদের ব্যর্থতা বিচার করছেন আবার আঙ্কেলেরাই।
তরুণদের ধৈর্যই বিস্ময়কর
একটি সমাজ কল্পনা করুন যেখানে বাবা-মায়ের চাপ আছে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আছে, প্রশাসনিক অদক্ষতা আছে, চাকরির সংকট আছে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা আছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের তরুণরা এখনও কেবল একটি মজার মিম তৈরি করেই ক্ষান্ত দিয়েছে — এটাই আসলে বিস্ময়কর। নেপাল, বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলঙ্কার তরুণরা নিজেদের বয়স্ক শাসকদের বিরুদ্ধে অনেক বেশি কঠোর পথ বেছে নিয়েছিল। ভারতের তরুণরা এখনও হাস্যরসের উপর ভরসা রাখে।
সেই কারণেই ভারতের আঙ্কেলদের জন্য একটি বিনামূল্যের পরামর্শ — আরশোলাদের ইন্টারনেটে একটু আনন্দ করতে দিন। এটা আপনাদের নিজেদের ভালোর জন্যই। আর হ্যাঁ, পাঁচটা ভেজানো বাদাম খেতে ভুলবেন না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



