বাংলাস্ফিয়ার: ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে শুরু হওয়া ছাত্র-যুব আন্দোলন সোমবার নতুন পর্যায়ে পৌঁছল। টানা ১৭ দিনের আন্দোলন এবং একাধিক দফার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরে ১০ অগস্ট আন্দোলনকারীরা রাঁচিতে ঝাড়খণ্ড বিধানসভা ঘেরাওয়ের ডাক দেন। জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামের আন্দোলনস্থল থেকে বিধানসভার দিকে মিছিল এগোতে শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘাত বাধে। ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের আটকাতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে এবং লাঠিচার্জও করে।

JPSC এবং JSSC-র বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ঝাড়খণ্ডে ক্ষোভ বাড়ছিল। ১৪তম সম্মিলিত সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষার প্রাথমিক ফল প্রকাশের পরে সেই ক্ষোভ আন্দোলনে পরিণত হয়। ১০৩টি শূন্যপদের জন্য ২,২০৪ জনকে মূল পরীক্ষার জন্য বাছাই করা হলেও পরীক্ষা পরিচালনা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসে। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ পরীক্ষার্থী ওই পরীক্ষায় বসেছিলেন।

রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়াম আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেখানেই কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী অনির্দিষ্টকালের অনশনে বসেছেন। দীর্ঘ অনশনের কারণে একাধিক আন্দোলনকারীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। রাহুল ক্রান্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। আন্দোলনের অন্যতম মুখ দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোর শারীরিক অবস্থাও উদ্বেগজনক। তাঁর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা এক সময় ৫৩-তে নেমে যায়।

কিন্তু শারীরিক দুর্বলতাও সোমবার তাঁকে বিধানসভা অভিযান থেকে দূরে রাখতে পারেনি। অ্যাম্বুল্যান্সে করে মিছিলে যোগ দেন দেবেন্দ্র। পরে তাঁকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। সেই ছবি দ্রুত আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, সরকার লিখিত ভাবে তাঁদের মূল দাবিগুলি না মানা পর্যন্ত অনশন এবং আন্দোলন কোনওটাই প্রত্যাহার করা হবে না।

রবিবার পর্যন্ত সরকার আন্দোলনকারীদের বোঝানোর চেষ্টা চালিয়েছিল। রাজ্য সরকারের দাবি, ছাত্রদের উত্থাপিত দাবির প্রায় ৯৮ শতাংশই মেনে নেওয়া হয়েছে। CID-কে ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা, কয়েকটি বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিল করা, TSR Data Processing-এর মাধ্যমে পরিচালিত পরীক্ষাগুলি খতিয়ে দেখা এবং JSSC-CGL সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্তের মতো একাধিক পদক্ষেপের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু আন্দোলনকারীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁদের দাবি, যে ১৩টি পরীক্ষা বাতিল করার দাবি তাঁরা তুলেছেন, সরকার তার মধ্যে মাত্র তিনটির ক্ষেত্রে সম্মত হয়েছে। সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য তদন্তকারী সংস্থা নিয়ে। আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা CBI-কে দিয়ে তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন। রাজ্য সরকার এখনও সেই দাবি মানতে রাজি নয়। ফলে আলোচনার পরেও অচলাবস্থা কাটেনি।

এর মধ্যেই JPSC-র ভিতরেও অস্থিরতার ইঙ্গিত মিলেছে। কমিশনের তিন কর্মরত সদস্য অজিতা ভট্টাচার্য, জামিল আহমেদ এবং অনিমা হাঁসদা রাজ্যপাল সন্তোষ কুমার গঙ্গওয়ারের কাছে তাঁদের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। আন্দোলনের আবহে এই ঘটনা রাজ্য সরকারের উপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।

সোমবার বিধানসভা অভিযানের আগে থেকেই রাঁচিতে নিরাপত্তা আঁটসাঁট করা হয়েছিল। বিধানসভা চত্বরের দিকে যাওয়ার পথে একাধিক স্তরে ব্যারিকেড তৈরি করে পুলিশ। কিন্তু মিছিল সেখানে পৌঁছনোর পরে আন্দোলনকারীদের একাংশ ব্যারিকেড সরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমে জলকামান চালানো হয়। পরে লাঠিচার্জের ঘটনাও ঘটে।

আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্তাপও বেড়েছে। ছাত্রদের দাবির সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে গেলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বাবুলাল মারান্ডি, রাজ্য বিজেপি সভাপতি আদিত্য সাহু-সহ বিজেপির একাধিক নেতাকে পুলিশ আটক করে। বিরোধী বিজেপি গোটা ঘটনায় সরকারের বিরুদ্ধে নিয়োগ ব্যবস্থায় ব্যর্থতা এবং ছাত্রদের কণ্ঠরোধের অভিযোগ তুলেছে।

মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন অবশ্য দাবি করেছেন, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। ছাত্রদের ন্যায়বিচার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। সরকারের বক্তব্য, ইতিমধ্যেই একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তদন্ত এগোচ্ছে।

কিন্তু সোমবারের ঘটনায় স্পষ্ট, শুধু মৌখিক আশ্বাসে আর সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারীরা। এতদিন আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামের অনশন মঞ্চ। এখন সেই আন্দোলন সরাসরি বিধানসভার দরজায় পৌঁছে গিয়েছে।

অনশনরত আন্দোলনকারীদের ক্রমশ অবনতিশীল স্বাস্থ্য, সরকারের সঙ্গে আলোচনার ব্যর্থতা, CBI তদন্ত নিয়ে মতপার্থক্য এবং সোমবারের পুলিশি ব্যবস্থার পরে ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ-বিক্ষোভ এখন রাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সঙ্কটের চেহারা নিচ্ছে।

পরবর্তী প্রশ্ন একটাই—হেমন্ত সোরেন সরকার কি নতুন কোনও লিখিত প্রস্তাব দিয়ে আন্দোলনকারীদের সন্তুষ্ট করতে পারবে, নাকি বিধানসভা অভিযানের পরে আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়বে? সোমবার রাঁচির রাস্তায় জলকামান ও লাঠিচার্জের মধ্যেও যে ভাবে চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের কর্মসূচিতে অনড় থেকেছেন, তাতে আপাতত আন্দোলন দ্রুত থেমে যাওয়ার কোনও লক্ষণ নেই।