বাংলাস্ফিয়ার: নালসার ইউনিভার্সিটি অব ল’-এর প্রায় ৪৫০ জন পড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, আসন্ন সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত যেন পুনর্বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন বর্ষের পড়ুয়াদের পাশাপাশি সদ্য পাঠক্রম শেষ করা এলএলবি এবং এলএলএম-এর পড়ুয়ারাও এই আবেদনে শামিল হয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, নিবন্ধক এবং অধ্যাপকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে পড়ুয়ারা তাঁদের আপত্তির কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। গত মাসে নিট আন্দোলনের সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদনের প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক মন্তব্যের কথা তাঁরা উল্লেখ করেছেন।

সমাবর্তন নিয়েই অনিশ্চয়তা

পড়ুয়াদের এই প্রবল বিরোধিতার জেরে এ বছর বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানই বাতিল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সমাবর্তন না-করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে প্রথম প্রতিবাদপত্রটি পাঠানো হয়েছিল ২৩ জুলাই। সদ্য পাঠক্রম শেষ করা এলএলবি ব্যাচের ৭০ জন পড়ুয়া তাতে স্বাক্ষর করেছিলেন। এর পরেই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে অন্য বর্ষগুলির মধ্যেও। ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে ২০২৭, ২০২৮, ২০২৯, ২০৩০ এবং ২০৩১ সালের ব্যাচের প্রায় ৩৮০ জন পড়ুয়া প্রথম চিঠিটির বক্তব্যের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তাঁরা আলাদা আলাদা ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে নিজেদের চিঠিও পাঠান।

এই আপত্তির সূত্রপাত হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট দিল্লিতে ২০ জুলাই ছাত্র-বিক্ষোভ দমনের সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা শুরু করতে অস্বীকার করে। আদালতে এক আইনজীবী জানান, পুলিশের নির্মমতার অভিযোগের সমর্থনে ভিডিয়ো প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি মৌখিক ভাবে সেই ভিডিয়োগুলি দেখতে অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এ ভাবে আদালতের সময় ‘নষ্ট’ করা উচিত নয়।

এই মন্তব্যের ঠিক পরের দিন, ২৩ জুলাই, নালসারের পড়ুয়ারা তাঁদের প্রথম চিঠিটি লেখেন।

চিঠিতে তাঁরা বলেন, তাঁদের উদ্বেগের কারণ হল প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চের সেই সিদ্ধান্ত, যেখানে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের ‘নৃশংস’ পদক্ষেপ সংক্রান্ত আবেদনটি জরুরি ভিত্তিতে শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করতে অস্বীকার করা হয়েছিল।

পড়ুয়ারা লেখেন, সমাবর্তন এমন একটি মুহূর্ত, যখন বিশ্ববিদ্যালয় যে মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, তার প্রকাশ হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের মধ্যেও। সেই মূল্যবোধের মধ্যে রয়েছে সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ এবং মানুষের অভিযোগ ও ক্ষোভকে যুক্তিনিষ্ঠ ভাবে বিবেচনা করা।

চিঠিতে পড়ুয়ারা বলেন, যে বিশিষ্ট ব্যক্তির সাম্প্রতিক প্রকাশ্য আচরণ প্রতিবাদরত নাগরিকদের উপর পুলিশের নির্মমতার গুরুতর অভিযোগকে উপেক্ষা করার মতো বলে তাঁদের কাছে মনে হয়েছে, তাঁর হাত থেকে ডিগ্রি গ্রহণ করা নালসারে পড়াশোনার সময় তাঁদের যে মূল্যবোধ শেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে স্বচ্ছন্দে মেলে না।

তাই তাঁদের আবেদন—এ বছরের সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয় যেন গুরুত্ব দিয়ে পুনর্বিবেচনা করে।

একের পর এক ব্যাচের সমর্থন

প্রথম চিঠিটির পরের কয়েক দিনের মধ্যেই নালসারের বিভিন্ন বর্ষের পড়ুয়ারা একই ধরনের বক্তব্য জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পৃথক চিঠি পাঠাতে শুরু করেন।

২০২৯ সালে পাঠক্রম শেষ করার কথা যে ব্যাচের, তাদের চিঠিতে বলা হয়, বিদায়ী ব্যাচ যে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে, তার সঙ্গে তারাও একমত। তাদের মতে, এই প্রশ্নটি শুধু একটি বিদায়ী ব্যাচের ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আপত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আরও বড় একটি প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে—নালসার যে সাংবিধানিক আদর্শকে ধারণ করার কথা বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে সেই আদর্শ কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে।

নালসারের ২০২৮ সালের ব্যাচের পড়ুয়ারা তাঁদের চিঠিতে আরও কড়া ভাষায় আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, আসন্ন সমাবর্তনে বর্তমান প্রধান বিচারপতির উপস্থিতির তাঁরা ‘তীব্র বিরোধিতা’ করছেন।

আরও সরাসরি ভাষা ব্যবহার করেছেন ২০৩০ সালের ব্যাচের পড়ুয়ারা। তাঁদের চিঠিতে প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক মন্তব্যটি উল্লেখ করে লেখা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন—‘দয়া করে আমাদের সময় নষ্ট করবেন না। এই ভিডিয়োগুলি দেখার সময় আমাদের নেই।’

তবে পড়ুয়াদের আপত্তি শুধু এই একটি মন্তব্যকে ঘিরে নয়। তাঁদের চিঠিতে প্রধান বিচারপতির অতীতের আর একটি মন্তব্যের প্রসঙ্গও তোলা হয়েছে। পড়ুয়াদের দাবি, এর আগে তিনি যুবসমাজের একাংশ সম্পর্কে ‘ব্যবস্থাকে আক্রমণকারী পরজীবী ও আরশোলা’ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন।

২০৩০ ব্যাচের চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ বিচারপতির পদে থাকা কোনও ব্যক্তির কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ ভারতের সংবিধান যে মূল্যবোধের কথা বলে, তার প্রতিফলন ঘটায় না। একই সঙ্গে নালসার তার প্রতিষ্ঠার পর থেকে যে আদর্শ ও মূল্যবোধ বহন করে এসেছে, তার সঙ্গেও এই ধরনের আচরণ সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে পড়ুয়ারা মনে করেন।

প্রধান বিচারপতির ব্যাখ্যাও রয়েছে

তবে ওই আগের মন্তব্যটি নিয়ে প্রধান বিচারপতি পরে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সংবাদমাধ্যমের একাংশ তাঁকে ‘ভুল ভাবে উদ্ধৃত’ করেছে।

প্রধান বিচারপতির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাঁর সমালোচনা সামগ্রিক ভাবে দেশের যুবসমাজ বা তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ করে ছিল না। তাঁর বক্তব্য ছিল কেবল তাঁদের সম্পর্কে, যাঁরা ‘জাল বা ভুয়ো ডিগ্রি’ ব্যবহার করে বিভিন্ন পেশায় ঢুকেছেন।

অর্থাৎ, নালসারের পড়ুয়ারা যে পুরনো মন্তব্যটির উল্লেখ করে আপত্তি তুলেছেন, সেটির ব্যাখ্যা নিয়ে প্রধান বিচারপতির নিজের বক্তব্যও রয়েছে এবং তিনি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন।

টিসের সমাবর্তনেও তৈরি হয়েছিল বিতর্ক

এই বিতর্কের মধ্যেই আরও একটি ঘটনার দিকে নজর পড়েছে। টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস বা টিস-এর ২ আগস্টের সমাবর্তন অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানেও প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের উপস্থিত থাকার কথা ছিল।

এ বার নালসারেও প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে পড়ুয়াদের আপত্তির কারণে সমাবর্তনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রবীণ শিক্ষক জানিয়েছেন, গোটা বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রাখছে। প্রকাশ্যে বিশেষ কিছু বলা হচ্ছে না।

ওই শিক্ষকের কথায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে এমন আলোচনাও চলছে যে এ বারের সমাবর্তন অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ ভাবে বাতিল করে দেওয়া হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে পরিস্থিতি যাতে আরও অস্বস্তিকর না হয়ে ওঠে, সে জন্যই কর্তৃপক্ষ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক ভাবে এখনও সমাবর্তন বাতিলের কথা ঘোষণা করেনি।

ফলে আপাতত প্রশ্নটি খোলাই থাকছে—প্রায় ৪৫০ জন পড়ুয়ার সম্মিলিত আপত্তির পরে নালসার কি প্রধান অতিথি বদলাবে, না কি এ বছরের সমাবর্তন অনুষ্ঠানই বাতিল করে দেবে?