বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার সরকারি আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে নতুন করে তদন্তের ঘোষণা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার তিনি জানান, নিহত চিকিৎসকের মায়ের অনুরোধেই রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিহতের মা রত্না দেবনাথ বর্তমানে বিজেপির বিধায়ক।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “রত্না দেবনাথ আমাকে চিঠি দিয়ে নতুন করে তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। মুখ্যসচিব এবং বিশেষজ্ঞদের একটি দলের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পরে আমি বিশেষ কমিশন আইন, ১৯৫২-এর অধীনে নতুন তদন্তের কথা ঘোষণা করছি।”

শুভেন্দু একই সঙ্গে অভিযোগ করেন, আর জি করের ঘটনায় পুলিশ তার দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। নিহত চিকিৎসকের দেহ সৎকারের ক্ষেত্রে যে সমস্ত গাফিলতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, তা নিয়েও পৃথক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সেই তদন্তে যাঁদের দায়ী বলে চিহ্নিত করা হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

এ দিকে, ঘটনার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রবিবার পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সরকারি হাসপাতালে দু’মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ২০২৪ সালে আর জি করের ঘটনার প্রতিবাদে যে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম প্রধান সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ জুনিয়র ডক্টর্স ফ্রন্ট উত্তর কলকাতার চিৎপুরে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য একটি চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করে।

সেখানে অংশ নেওয়া এক চিকিৎসক বলেন, “কর্তব্যরত অবস্থায় যে চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছিল, তাঁর জন্য ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েই আমরা এই চিকিৎসা শিবির করছি।”

পরে জুনিয়র ডক্টর্স ফ্রন্ট নিহত চিকিৎসকের স্মরণে কলেজ স্ট্রিট থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত একটি মিছিল করে। তাঁদের দাবি, এই অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে হবে এবং বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তবেই প্রকৃত ন্যায়বিচার সম্ভব।

এর এক দিন আগেই রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শরদ্বৎ মুখোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, আর জি করের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা নিয়ে স্বাস্থ্য দফতরও পৃথক তদন্ত শুরু করবে।

মুখোপাধ্যায় জানান, ঘটনার রাতে হাসপাতালে উপস্থিত প্রত্যেককে স্বাস্থ্য দফতরের তদন্তে ডেকে পাঠানো হবে। তদন্তকারীরা নিহত চিকিৎসকের শিক্ষক এবং অধ্যাপকদের সঙ্গেও কথা বলবেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “তদন্তের প্রয়োজনে যদি দফতর মনে করে প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও ডেকে পাঠানো দরকার, তা হলে সেই সিদ্ধান্তও কার্যকর করা হবে।”

তিনি আরও জানান, তদন্তে হাসপাতালের তৎকালীন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ঠিক কোথায় কোথায় ঘাটতি বা ফাঁক ছিল, তা বিস্তারিত ভাবে খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি, ঘটনার পরে সেই সমস্ত ত্রুটি বা দুর্বলতা কী ভাবে এবং কতটা সংশোধন করা হয়েছে, তা-ও তদন্তের আওতায় থাকবে।

অন্য দিকে, আর জি করের ঘটনার পরে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন ‘অভয়া মঞ্চ’-এর সদস্য আসফাকুল্লা নাইয়া বলেন, “রাজ্য সরকার নীরবতা পালন করছে, আমরা তাকে স্বাগত জানাচ্ছি। কিন্তু আর জি করের ধর্ষণ ও খুনের তদন্তও যদি নীরব করে দেওয়া হয়, তা হলে আমরা তা মেনে নেব না। আজ পর্যন্ত আমরা ঠিক জানি না, সেই রাতে কী ঘটেছিল। আমরা যথাযথ ন্যায়বিচার চাই।”

দু’বছর পরেও আর জি করের ঘটনা ঘিরে তাই প্রশ্ন এবং ন্যায়বিচারের দাবি বহাল রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত নতুন তদন্তের পাশাপাশি স্বাস্থ্য দফতরের পৃথক অনুসন্ধান এখন ঘটনার বিভিন্ন দিক—পুলিশের ভূমিকা, হাসপাতালের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং ঘটনার রাতের পরিস্থিতি নতুন করে খতিয়ে দেখবে।