থাইল্যান্ডের ননথাবুরি প্রদেশের একটি বৌদ্ধ মন্দির। শত শত মানুষ জড়ো হয়েছেন ১২ বছরের নাফাত চাইমারের শেষকৃত্যে। শিক্ষক, সহপাঠী, অভিভাবক থেকে দেশের উপপ্রধানমন্ত্রী—সকলেই এসেছেন ছোট্ট মেয়েটিকে শেষ বিদায় জানাতে। কফিনের সামনে বসে শোকে ভেঙে পড়েছেন নাফাতের বাবা-মা।
এর মধ্যেই হঠাৎ বদলে গেল দৃশ্য।
এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে নাফাতের বাবা-মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। চোখে জল, মাথা নত। থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়াই’ ভঙ্গিতে বারবার ক্ষমা চাইতে লাগলেন তিনি। লোকটি নিথি ইয়িমরুয়াং—সেই ১৪ বছরের কিশোরের বাবা, যে স্কুলে বন্দুক হামলা চালিয়ে নাফাত-সহ বহু মানুষকে হত্যা করেছিল।
নাফাতের বাবা পংথন চাইমার তাঁর হাত ধরে তাঁকে মাটি থেকে তুলে দাঁড় করান। কিন্তু অপরাধবোধে নিথির মাথা তখনও নত। পংথন তাঁর ক্ষমাপ্রার্থনা গ্রহণ করেন।
শোকের এই মুহূর্তে নাফাতের বাবা-মা তাঁকে জানান, তাঁরাও বুঝতে পারছেন—তিনিও ভয়াবহ যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। কারণ এই ঘটনায় শুধু একটি পরিবারই সন্তান হারায়নি।
প্যাচাট ইয়িমরুয়াং প্রথমে নিজের দাদু ও দিদাকে গুলি করে হত্যা করে। তার পর ব্যাংককের উত্তর-পশ্চিমে ডেবসিরিন ননথাবুরি স্কুলে গিয়ে আরও ছ’জনকে হত্যা করে এবং ৩০ জনের বেশি মানুষকে আহত করে। শেষে নিজেকেও গুলি করে ওই কিশোর।
‘আমিও তো সব হারিয়েছি’
শেষকৃত্যের আগে নিথি বলেন, এই ঘটনায় তাঁর মধ্যে একসঙ্গে অপরাধবোধ, শোক এবং অসহায়তা কাজ করছে।
‘‘আমিও আমার সন্তানকে হারিয়েছি, আমার বাবা-মাকেও হারিয়েছি। আর ওই ছোট্ট মেয়েটির বাবা আমার প্রতি যে দয়া ও সহমর্মিতা দেখালেন, তাতে আমার অপরাধবোধ আরও বেড়ে গেল।’’
ছেলে কেন এমন ভয়াবহ কাজ করল, তার উত্তর এখনও খুঁজে পাননি তিনি। কিন্তু সন্তানের হাতে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের ভার নিয়েই এখন তাঁকে বাঁচতে হবে।
সোমবার শেষকৃত্যের প্রার্থনা শুরু হওয়ার আগেই ননথাবুরির ওয়াট লাট প্লা দুক মন্দির ছেড়ে চলে যান নিথি।
প্যাচাট হামলায় তার দাদুর বন্দুক ব্যবহার করেছিল। মাত্র দু’বছর বয়সে তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর দাদু-দিদার কাছেই বড় হচ্ছিল সে।
তবে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি নিথি। প্রতি সপ্তাহান্তে দেখা করতেন, এমনকি অতিরিক্ত পড়াশোনার জন্য ছেলেকে টিউশনেও নিয়ে যেতেন।
‘‘আমার কাছে ও-ই ছিল এক নম্বর,’’ বলেন নিথি। ‘‘কিন্তু ও খুব চুপচাপ ছিল। নিজের মধ্যে থাকত, বেশি কথা বলত না। শেষের দিকে আরও বেশি চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল।’’
স্কুল কেমন চলছে, পড়াশোনা কেমন হচ্ছে—বাবার প্রশ্নে প্রায় সব সময়ই একই উত্তর আসত, ‘মোটামুটি’।
নিথির গলায় তখন একরাশ আক্ষেপ, ‘‘কিন্তু এখন আর কোনও দিন ওকে কিছু জিজ্ঞাসা করার সুযোগ নেই।’’
শোকে স্তব্ধ থাইল্যান্ড
স্কুলে এই হত্যাকাণ্ডে স্তম্ভিত গোটা দেশ। রাজা থেকে প্রধানমন্ত্রী—দেশের সর্বোচ্চ স্তর থেকেও এসেছে শোকবার্তা।
ননথাবুরির মন্দিরে নাফাতের কফিনের পাশে রাখা হয়েছিল রাজা মহা বজিরালংকর্নের পাঠানো হলুদ ফুলের মালা। রানি সুথিদার তরফে পাঠানো হয়েছিল বেগুনি ও গোলাপি ফুলের শ্রদ্ধার্ঘ্য। প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল-সহ মন্ত্রিসভার আরও কয়েক জন সদস্যও ফুল পাঠান।
রবিবার রাজপ্রাসাদের তরফে জানানো হয়, হামলায় নিহত ও আহতদের এবং তাঁদের পরিবারকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় আনা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা হবে রাজপরিবারের তত্ত্বাবধানে। নিহতদের শেষকৃত্য ও দাহের খরচেও দেওয়া হবে রাজকীয় সহায়তা।
‘ওর স্বপ্নগুলোই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে’
সোমবার মন্দিরের প্রার্থনাকক্ষ মানুষের ভিড়ে উপচে পড়ে। উপপ্রধানমন্ত্রী, শিক্ষক, সহপাঠী, অভিভাবক—শত শত মানুষ এসেছিলেন নাফাতকে শেষ বিদায় জানাতে।
মন্দিরের বাইরে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল ফুলের মালা ও চেয়ার। ভিতরে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মন্ত্রপাঠ, শোকাহত মানুষের ধূপ জ্বালানো—সব মিলিয়ে ভারী হয়ে উঠেছিল পরিবেশ।
এক পাশে রাখা নাফাতের ছবিগুলো যেন অন্য এক গল্প বলছিল। কোথাও ছোট্টবেলার নাফাত, কোথাও আত্মবিশ্বাসী কিশোরী। কোথাও গিটার হাতে, কোথাও মঞ্চে অনুষ্ঠান করছে সে।
মাত্র তিন মাস আগে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী হিসেবে ওই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল নাফাত।
বাবা পংথন বলেন, ‘‘ওর যে জিনিসটা আমার আর ওর মায়ের সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে, তা হল ওর স্বপ্নগুলো।’’
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার পরই নাচের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল নাফাত। থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের প্রতিযোগিতাতেও নাম দিয়েছিল। অগস্টের শেষ দিকে চিয়ারলিডিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার।
‘‘ও এত কিছু করত, আবার সবই সামলাতে পারত,’’ বলেন পংথন। ‘‘নিজেকে প্রকাশ করতে খুব ভালবাসত।’’
টিকা নিতে গিয়েই সামনে বন্দুক
স্কুলে গুলি চলার খবর পাওয়ার পর মেয়েকে বারবার ফোন করেছিলেন নাফাতের বাবা-মা। কিন্তু কোনও সাড়া মেলেনি।
পরে এক পুলিশকর্মী ফোন করে জানান, গুরুতর আহত অবস্থায় নাফাতকে ফ্রানাংক্লাও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত শনিবার মৃত্যু হয় ১২ বছরের মেয়েটির। হামলাকারী-সহ নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় নয়।
নাফাতের এক শিক্ষক জানান, যে ভবনে হামলা হয়েছিল, সেখানে সেদিন নাফাতের থাকার কথা ছিল না। অন্য কয়েক জন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে টিকা নিতে গিয়েছিল সে। টিকা নেওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময়ই গুলিবিদ্ধ হয় নাফাত।
শিক্ষকের স্মৃতিতে সে ছিল প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এবং চারপাশের সবাইকে আনন্দে মাতিয়ে রাখা এক ছাত্রী।
এত বড় বিপর্যয়ের পরেও অবশ্য স্কুল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করতে চাননি নাফাতের বাবা।
‘‘সহজ ভাবে বললে, এমন ঘটনা যে কোনও জায়গায় ঘটতে পারে। পৃথিবীর যে কোনও জায়গায়,’’ তাঁর মন্তব্য।
আর সেই উপলব্ধির মধ্যেই ননথাবুরির মন্দিরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল দুই পরিবারের শোক।
এক পরিবার হারিয়েছে ১২ বছরের মেয়েকে। অন্য পরিবার হারিয়েছে একই সঙ্গে সন্তান এবং বাবা-মাকে।
মাঝখানে পড়ে রইল এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড—যার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটির উত্তর, ‘কেন?’, এখনও অজানা।