হাইলাইটস:
- তারাতলা গুদাম ধস মামলায় গ্রেপ্তার প্রাক্তন ওএসডি কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
- কলকাতা পুরসভার প্রশাসনে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
- প্রাক্তন মেয়র ও পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
- নির্মাণ অনুমোদন ও পুর প্রশাসনের বিভিন্ন কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
- গুদাম ধসের তদন্তে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
- অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন; আদালতে কোনও অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
বাংলাস্ফিয়ার: তারাতলা গুদাম ধসের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক নতুন নাম। সেই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি হলেন কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র তথা রাজ্যের প্রাক্তন পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক বা ওএসডি হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। প্রশাসনিক মহলে ‘কালী’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন কালিচরণ। গুদাম ধস মামলায় তাঁর গ্রেপ্তারের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—কে এই কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেন তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ?
কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় পেশায় একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। দীর্ঘদিন কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সরকারি নথিপত্র, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশাসনিক সমন্বয়, পুর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং মেয়রের দপ্তরের সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের যোগাযোগ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতেন তিনি। এই কারণেই পুর প্রশাসনের অন্দরে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ফিরহাদ হাকিম কলকাতা পুরসভার মেয়র এবং পরে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক হিসেবে কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত অন্যতম আস্থাভাজন প্রশাসনিক মুখে পরিণত হন। ওএসডি পদে থেকে তিনি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন না, কিন্তু প্রশাসনিক সমন্বয়, নথি প্রক্রিয়াকরণ, বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়।
তারাতলায় নির্মীয়মাণ বহুতল গুদাম ভেঙে পড়ার পর তদন্তে নির্মাণের নকশা, অনুমোদন, নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই তদন্তেই কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সামনে আসে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, নির্মাণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় কোনও অনিয়ম বা প্রশাসনিক গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সেই সূত্রেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন এবং আদালতে কোনও অভিযোগ এখনও প্রমাণিত হয়নি।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, পূর্বতন পুর প্রশাসনের সময় নির্মাণ অনুমোদনকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির একটি চক্র গড়ে উঠেছিল। বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি ‘কালী’ নাম উল্লেখ করে কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গও তোলেন। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয় এবং আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলা উচিত।
প্রশাসনিক মহলের মতে, কলকাতা পুরসভার মতো বৃহৎ সংস্থায় ওএসডি পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা, নথিপত্র দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের মতো দায়িত্ব পালন করেন এই পদাধিকারীরা। ফলে এই পদে থাকা ব্যক্তির প্রশাসনিক গুরুত্ব অনেকটাই বেশি।
কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রকাশ্যে খুব বেশি তথ্য নেই। তিনি সবসময়ই জনসমক্ষে কম এসেছেন এবং মূলত প্রশাসনিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। ফলে তাঁর পরিচিতি রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং একজন প্রভাবশালী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেই।
এখন তারাতলা গুদাম ধস মামলার তদন্ত কোন দিকে এগোয়, প্রশাসনিক দায় কতটা নির্ধারিত হয় এবং আদালতে তদন্তকারী সংস্থা কী প্রমাণ পেশ করতে পারে, তার উপরই নির্ভর করবে কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভবিষ্যৎ। আপাতত তিনি তদন্তের কেন্দ্রীয় চরিত্রদের অন্যতম, কিন্তু আইনের চোখে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দোষী বলা যায় না।