বাংলাস্ফিয়ার: ঘুমোও। শরীরচর্চা করো। ভাল খাবার খাও। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে পুরনো পরামর্শগুলির অন্যতম এটি। এত বার কথাগুলি বলা হয়েছে যে প্রায় আপ্তবাক্যে পরিণত হয়েছে। আমরা সকলেই জানি এগুলি মেনে চলা উচিত—যদিও সব সময় মেনে চলি না। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি, আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ আলাদা এই তিনটি অভ্যাস কী ভাবে আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীরের উপর প্রায় একই রকম উপকারী প্রভাব ফেলে?
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা এগুলিকে তিনটি আলাদা ব্যবস্থাপত্র হিসেবেই দেখেছি। ঘুম আমাদের পুনরুজ্জীবিত করে, শরীরচর্চা আমাদের শক্তিশালী করে আর খাবার আমাদের জ্বালানি জোগায়। কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা আরও চমকপ্রদ একটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে—মূলত এই তিনটি কাজই একই জৈবিক ব্যবস্থাকে সুস্থ ও সচল রাখতে সাহায্য করে।
বদলেছে স্বাস্থ্যবিধির পরামর্শ নয়, বদলেছে তার নেপথ্যের জীববিদ্যা সম্পর্কে আমাদের ধারণা। বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্ক নিয়ে যত বেশি গবেষণা করছেন, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে আমাদের চিন্তাশক্তির জন্য বিপুল পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন। শরীরের মোট ওজনের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ মস্তিষ্কের হলেও বিশ্রামের সময় শরীর যে শক্তি ব্যবহার করে, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই খরচ করে মস্তিষ্ক।
আমরা যখন কোনও স্মৃতি মনে করি, কোনও সিদ্ধান্ত নিই কিংবা হঠাৎ কোনও নতুন ভাবনা মাথায় আসে—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার জন্য শক্তি খরচ হয়। অর্থাৎ চিন্তা করাটাই বিপুল শক্তিনির্ভর একটি কাজ।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এত শক্তি আসে কোথা থেকে?
তার উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে ২০০ কোটি বছরেরও বেশি আগের পৃথিবীতে। তখন একটি আদিম কোষ একটি ব্যাকটেরিয়াকে নিজের ভিতরে টেনে নিয়েছিল। সাধারণ ভাবে সেটির হজম হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বরং ব্যাকটেরিয়াটি কোষের ভিতরেই থেকে যায় এবং আশ্রয়দাতা কোষটির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সহাবস্থান গড়ে তোলে।
ক্রমে সেই সম্পর্ক জীবনের বিবর্তনের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিগুলির একটিতে পরিণত হয়। ব্যাকটেরিয়াটি খাদ্যে সঞ্চিত রাসায়নিক শক্তিকে ধরে তা এটিপি নামের অণুতে রূপান্তর করতে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠে। এই এটিপিই আমাদের শরীরের প্রায় প্রতিটি জৈবিক প্রক্রিয়ার শক্তির উৎস। অন্য দিকে আশ্রয়দাতা কোষটি ব্যাকটেরিয়াটিকে নিরাপত্তা দিয়েছিল। এই সহাবস্থানই শেষ পর্যন্ত জটিল প্রাণের বিকাশ সম্ভব করে তোলে।
সেই প্রাচীন অংশীদারি আজও আমাদের শরীরের ভিতরে চলছে। ওই ব্যাকটেরিয়ার উত্তরসূরিই হল মাইটোকন্ড্রিয়া। মানুষের শরীরের প্রায় প্রতিটি কোষে মাইটোকন্ড্রিয়া রয়েছে। ব্যতিক্রম পরিণত লোহিত রক্তকণিকা। হিমোগ্লোবিনের জন্য বেশি জায়গা তৈরি করতে এবং অক্সিজেন পরিবহণ আরও কার্যকর করতে লোহিত রক্তকণিকা মাইটোকন্ড্রিয়া বাদ দেয়।
দীর্ঘদিন জীববিদ্যার পাঠ্যবইয়ে মাইটোকন্ড্রিয়াকে বলা হয়েছে কোষের ‘শক্তিকেন্দ্র’। গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ভরযোগ্য, কিন্তু খুব একটা আকর্ষণীয় নয়। মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে সমস্ত আলো কেড়ে নিয়েছিল স্নায়ুকোষ বা নিউরন।
এখন সেই ধারণা বদলাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন, নিউরন আমাদের চিন্তা, কল্পনা ও আবেগ তৈরি করতে পারে একমাত্র তখনই, যখন মাইটোকন্ড্রিয়া অবিরাম জ্বালানিকে প্রয়োজনীয় শক্তিতে রূপান্তর করে চলে। অর্থাৎ বুদ্ধিমত্তা শুধু মস্তিষ্কের স্নায়ুসংযোগের উপর নির্ভর করে না। সেই স্নায়ুতন্ত্রের ভিতর দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন শক্তিপ্রবাহও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলছে, সুস্থ মাইটোকন্ড্রিয়া অঙ্ক করার দক্ষতা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের গতি থেকে শুরু করে কর্মস্মৃতি, সুস্থ মস্তিষ্ক নিয়ে বার্ধক্যে পৌঁছনো এবং মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা—বুদ্ধিবৃত্তির নানা দিকের সঙ্গে যুক্ত। ফলে মাইটোকন্ড্রিয়াকে আর নিছক নিষ্ক্রিয় শক্তিভাণ্ডার হিসেবে দেখা হচ্ছে না। শেখা, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং সারা জীবন মস্তিষ্ককে কর্মক্ষম রাখার প্রক্রিয়ায় তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেই ঘুম, শরীরচর্চা এবং ভাল খাবারের পুরনো পরামর্শের গভীর অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শরীরচর্চা শুধু পেশি বাড়ায় না। এটি মস্তিষ্কের শেখা ও স্মৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিপোক্যাম্পাসেরও বিকাশ ঘটায়। পাশাপাশি মাইটোকন্ড্রিয়ার সংখ্যা বাড়াতে এবং সেগুলিকে আরও দক্ষ করে তুলতে সাহায্য করে। আমরা ভাবি শরীরচর্চার মাধ্যমে শুধু শরীরকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। বাস্তবে আমরা মস্তিষ্ককে সচল রাখা সেই কোটি কোটি বছরের পুরনো শক্তিব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করছি।
ঘুমের কাজ আবার অন্য রকম। আমরা অচেতন অবস্থায় থাকলেও মস্তিষ্ক মোটেই নিষ্ক্রিয় থাকে না। ঘুমের সময় স্মৃতি সুসংহত হয়। ক্ষয়ে যাওয়া কোষীয় উপাদান—মাইটোকন্ড্রিয়াও যার মধ্যে রয়েছে—মেরামত হয় অথবা বদলে ফেলা হয়। ফলে ঘুমকে শুধু বিশ্রাম হিসেবে না দেখে মাইটোকন্ড্রিয়ার ‘রক্ষণাবেক্ষণের পালা’ হিসেবেও ভাবা যেতে পারে। পরের দিন নতুন করে শেখা, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং কল্পনা করার জন্য মস্তিষ্ককে প্রস্তুত করে এই প্রক্রিয়া।
তার পরে আসে খাবার। মাইটোকন্ড্রিয়ার বিস্ময়কর রাসায়নিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভাবেই আমাদের খাওয়া খাবারের উপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির গুণমান গুরুত্বপূর্ণ। অতি অল্প প্রক্রিয়াজাত খাবারসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস মাইটোকন্ড্রিয়াকে দক্ষতার সঙ্গে শক্তি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপাদান জোগায়। বিপরীতে, যে ধরনের খাদ্যাভ্যাসে এই ব্যবস্থার উপর ক্রমাগত অতিরিক্ত চাপ পড়ে, তা সময়ের সঙ্গে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়াকেও কম দক্ষ করে তুলতে পারে।
এই ভাবে দেখলে ঘুম, শরীরচর্চা ও খাদ্যাভ্যাস আর তিনটি বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যবিধি থাকে না। এগুলি হয়ে ওঠে আমাদের শরীরে বহন করে চলা একই প্রাচীন জৈবিক উত্তরাধিকারের যত্ন নেওয়ার তিনটি আলাদা উপায়।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল, এর প্রভাব শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীরা এখন মাইটোকন্ড্রিয়ার কর্মক্ষমতার সঙ্গে মানসিক প্রতিকূলতা সামলানোর ক্ষমতা, মেজাজ, ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, এমনকি আমাদের সামাজিক জীবনেরও সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ মন ও শরীরকে আলাদা করে দেখেছে—যেন আমাদের চিন্তা শরীরের ঊর্ধ্বে কোনও স্বাধীন অস্তিত্ব। বাস্তব ছবিটি সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের চিন্তা তৈরি হয় জীবন্ত কোষ ও কলা থেকে। আর বেঁচে থাকা, চিন্তা করা এবং অনুভব করার জন্য সেই কোষগুলিকে প্রতিনিয়ত শক্তি সংগ্রহ, রূপান্তর ও ব্যবহার করতে হয়।
মাইটোকন্ড্রিয়া নিয়ে গবেষণাকারী মনোজীববিজ্ঞানী মার্টিন পিকার্ডের বক্তব্য, আমরা নিজেদের ‘আণবিক যন্ত্র’ হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। তার বদলে নিজেদের শক্তির নিরন্তর প্রবাহ ও রূপান্তরের একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া হিসেবে ভাবা সম্ভবত বেশি অর্থবহ।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি স্মৃতি এবং প্রতিটি অনুভূতির পিছনেই রয়েছে কোটি কোটি কোষের ভিতরে অবিরাম শক্তির রূপান্তর।
আর সেই কারণেই সুস্থ থাকার বহু পুরনো তিনটি পরামর্শ—ভাল ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার—আসলে একই জৈবিক ব্যবস্থাকে সুস্থ রাখার তিনটি পথ।