বাংলাস্ফিয়ার: বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক ডাক্তারি পড়ুয়ার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন, মারধর এবং জোর করে আটকে রাখার অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেন বাংলার ক্রিকেটার তথা দিল্লি ক্যাপিটালসের উইকেটরক্ষক-ব্যাটার অভিষেক পোড়েল। কলকাতা হাই কোর্ট পুলিশকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার প্রায় এক মাস পরে সোমবার গভীর রাতে দমদম থানা এলাকার ইমামি সিটি আবাসন থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে হুগলি গ্রামীণ জেলা পুলিশ। মঙ্গলবার চুঁচুড়া আদালত তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ করে তিন দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে।
হুগলি গ্রামীণের পুলিশ সুপার কুনওয়ার ভূষণ সিংহ জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ অনুসারেই অভিষেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা এখন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং তাঁর বৈদ্যুতিন যন্ত্রগুলি পরীক্ষা করবেন। এই মামলায় অভিযুক্ত ক্রিকেটারের এক বন্ধুকেও এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে আদালতে জানিয়েছে রাজ্য। অভিযোগের সত্যতা অবশ্য এখনও বিচারাধীন এবং অভিষেক সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগকারিণী কর্ণাটকের বাসিন্দা ও ডাক্তারির ছাত্রী। গত ২৩ জুন তিনি হুগলির মগরা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর দাবি, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অভিষেকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। ক্রমে সেই পরিচয় প্রেমের সম্পর্কে পরিণত হয়। তাঁদের সম্পর্ক প্রায় সাড়ে তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল এবং বিয়ের বিষয়ে দুই পরিবারের মধ্যেও আলোচনা হয়েছিল বলে ওই তরুণীর দাবি।
অভিযোগপত্রে তরুণী জানিয়েছেন, বাবা-মা বাড়িতে না থাকার সুযোগে অভিষেক তাঁকে হুগলির একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর সম্মতি ছাড়া শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয় বলে অভিযোগ। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েই অভিষেক তাঁর সঙ্গে বারবার শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, কিন্তু পরে সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসেন—এমন অভিযোগও করেছেন ওই ছাত্রী।
অভিযোগকারিণীর দাবি, গত ২ এপ্রিল দিল্লিতে তাঁকে একটি জায়গায় বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাঁকে খাবার দেওয়া হয়নি এবং গুরুতর মারধর করা হয়েছিল বলে তাঁর অভিযোগ। নির্যাতনের ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অবিলম্বে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। পরে অভিষেকের এক সহযোগীর সামাজিক মাধ্যমের পরিচয় এবং অন্য কয়েকটি টেলিফোন নম্বর ব্যবহার করে তাঁকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে জানানো হয়েছে।
তরুণীর আরও গুরুতর অভিযোগ, অভিষেক একাধিকবার তাঁর অনুমতি ছাড়াই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি তুলেছিলেন। সেগুলি ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাঁকে চাপ দেওয়া হয়েছিল বলেও কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই কারণেই মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে কলকাতা হাই কোর্ট অভিযুক্তের মুঠোফোন, কম্পিউটার-সহ সমস্ত বৈদ্যুতিন যন্ত্র দ্রুত বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল। আদালতের মতে, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মগরা থানায় অভিযোগ দায়েরের পরেও পুলিশ যথেষ্ট দ্রুত ব্যবস্থা নেয়নি—এই অভিযোগ তুলে গত ১৪ জুলাই কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন ওই তরুণী। আদালত পুলিশকে অভিষেককে গ্রেপ্তার এবং তাঁর বৈদ্যুতিন যন্ত্র বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়। তার পরেও প্রায় এক মাস কেটে যাওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত সোমবার রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মঙ্গলবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে মামলাটির শুনানির সময় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তদন্তের অগ্রগতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পেশ করা হয়। অভিষেক ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে পুলিশকে সময় দেওয়া প্রয়োজন—এই যুক্তিতে শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন জানায় রাজ্য। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে মামলার পরবর্তী শুনানি ১৪ সেপ্টেম্বর ধার্য করেছে। গ্রেপ্তার না-হওয়া দ্বিতীয় অভিযুক্তের সন্ধানেও তল্লাশি চলছে।
অভিষেকের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬৯ নম্বর ধারা-সহ একাধিক ধারায় এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা হয়েছে। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণামূলক উপায়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ৬৯ নম্বর ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। পাশাপাশি মারধর, বেআইনিভাবে আটকে রাখা, ভয় দেখানো এবং অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত দৃশ্য ধারণের অভিযোগগুলিও তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
বাংলার হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে রান করে পরিচিতি পান উইকেটরক্ষক-ব্যাটার অভিষেক। ২০২৩ সালে ঋষভ পন্থের পরিবর্ত খেলোয়াড় হিসেবে দিল্লি ক্যাপিটালসে যোগ দেন তিনি। প্রথম মরসুমে মাত্র চারটি ম্যাচ খেললেও পরে তাঁকে দলে রেখে দেয় দিল্লির দলটি। তবে মাঠের বাইরের এই গুরুতর মামলা এখন তাঁর ক্রিকেটজীবনকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলি প্রমাণিত বলে গণ্য করা যাবে না; শেষ পর্যন্ত আদালতই তাঁর দায় নির্ধারণ করবে।