বাংলাস্ফিয়ার: ১৯২৫ সালের ৯ অগস্ট। লখনউয়ের অদূরে কাকোরি স্টেশনের কাছে একটি ট্রেন থামিয়ে ব্রিটিশ সরকারের কোষাগারের টাকা নিয়ে পালিয়ে যান কয়েক জন তরুণ বিপ্লবী। ইতিহাসে ঘটনাটি দীর্ঘদিন ‘কাকোরি ট্রেন ডাকাতি’ বা ‘কাকোরি ষড়যন্ত্র’ নামে পরিচিত থাকলেও বিপ্লবীদের কাছে এটি নিছক ডাকাতি ছিল না। তাঁদের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের অর্থ দখল করে বিপ্লবী আন্দোলনের তহবিল তৈরি করা এবং একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসনকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানানো। ঘটনার ১০১ বছর পরে ফিরে দেখা যাক কাকোরি অভিযানের সম্পূর্ণ ইতিহাস।

অসহযোগ আন্দোলনের প্রত্যাহার এবং সশস্ত্র বিপ্লবের পথে তরুণেরা

১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁর আহ্বান ছিল—ব্রিটিশ সরকার ও ভারতে ব্রিটিশ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে এমন সমস্ত কর্মকাণ্ড বর্জন করতে হবে। সত্যাগ্রহ এবং অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বশাসন অর্জনের স্বপ্ন দেখেছিলেন গান্ধী।

কিন্তু ১৯২২ সালে উত্তরপ্রদেশের চৌরি চৌরায় পরিস্থিতি নাটকীয় ভাবে বদলে যায়। পুলিশের গুলিতে তিন প্রতিবাদকারীর মৃত্যুর পরে উত্তেজিত জনতা একটি থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে ২২ জন পুলিশকর্মীর মৃত্যু হয়।

জওহরলাল নেহরু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, এই ঘটনার পরেই অসহযোগ আন্দোলনের ‘আকস্মিক’ সমাপ্তি ঘটে। কংগ্রেসের ভিতরে প্রবল মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও গান্ধী আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।

এই সিদ্ধান্তে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন একদল তরুণ বিপ্লবী। তাঁদের মনে হয়েছিল, শুধুমাত্র অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান সম্ভব নয়। সেই রাজনৈতিক হতাশা থেকেই গড়ে ওঠে হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন বা এইচআরএ।

রামপ্রসাদ বিসমিল এবং আশফাকউল্লা খান ছিলেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। দু’জনেই কবিতা লিখতেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন শচীন্দ্রনাথ বক্সী এবং শ্রমিক নেতা যোগেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তী সময়ে চন্দ্রশেখর আজাদ এবং ভগৎ সিংহের মতো বিপ্লবীরাও এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।

১৯২৫ সালের ১ জানুয়ারি এইচআরএ তাদের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। নাম ছিল ‘ক্রান্তিকারী’।

ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, বিপ্লবী দলের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লক্ষ্য হল সংগঠিত সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব ইন্ডিয়া’ নামে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।

বিপ্লবীরা নিজেদের ‘সন্ত্রাসবাদী বা নৈরাজ্যবাদী’ বলে মনে করতেন না। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সন্ত্রাস সৃষ্টি করাই তাঁদের উদ্দেশ্য নয়। তবে প্রয়োজন হলে প্রতিশোধ বা রাজনৈতিক প্রতিরোধের কার্যকর অস্ত্র হিসেবে হিংসাত্মক পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে।

তাঁদের কল্পিত প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। বিশেষ করে এমন সমস্ত ব্যবস্থার অবসান ঘটানোর কথা বলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে ‘মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ’ সম্ভব হয়।

কী ঘটেছিল কাকোরিতে?

১৯২৫ সালের অগস্টে কাকোরি ট্রেন অভিযান ছিল এইচআরএ-র প্রথম বড় মাপের সশস্ত্র অভিযান।

আট নম্বর ডাউন ট্রেনটি শাহজাহানপুর থেকে লখনউ যেত। সেই ট্রেনে ব্রিটিশ সরকারের রাজস্বের টাকা ভর্তি থলি নিয়ে যাওয়া হত। লখনউয়ে সরকারি কোষাগারে সেই টাকা জমা পড়ার কথা ছিল।

বিপ্লবীদের পরিকল্পনা ছিল সেই অর্থ দখল করা। তাঁদের যুক্তি ছিল, টাকা ভারতীয়দের কাছ থেকেই আদায় করা হয়েছে, অতএব তার প্রকৃত মালিক ভারতের মানুষ। সেই অর্থ দিয়ে বিপ্লবী সংগঠনের কাজ চালানোর পাশাপাশি তাঁরা দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং আন্দোলনের দিকে।

১৯২৫ সালের ৯ অগস্ট ট্রেনটি লখনউ থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কাকোরি স্টেশন অতিক্রম করার সময় এইচআরএ সদস্য রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী শিকল টেনে ট্রেনটি থামিয়ে দেন। তিনি আগে থেকেই যাত্রী সেজে ট্রেনে উঠে বসেছিলেন।

এর পরে রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান-সহ প্রায় দশ জন বিপ্লবী অভিযানে অংশ নেন। তাঁরা ট্রেনের রক্ষীকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সরকারি কোষাগারের অর্থভর্তি থলিগুলি দখল করেন। প্রায় ৪,৬০০ টাকা নিয়ে তাঁরা লখনউয়ের দিকে পালিয়ে যান।

কিন্তু অভিযানের সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটে যায়, যা বিপ্লবীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে ধাক্কা দেয়। একটি মাউজার পিস্তল থেকে আচমকা গুলি বেরিয়ে আহমদ আলি নামে এক যাত্রীর মৃত্যু হয়। তিনি পেশায় আইনজীবী ছিলেন।

সাধারণ যাত্রীদের ক্ষতি না করার পরিকল্পনা ছিল বিপ্লবীদের। ফলে ওই মৃত্যু তাঁদের পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যকে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

ব্রিটিশ সরকারের ভয়াবহ দমন অভিযান

কাকোরির ঘটনা ব্রিটিশ প্রশাসনকে প্রবল ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। এইচআরএ-র সদস্য এবং সন্দেহভাজন সহযোগীদের খুঁজে বার করতে পুলিশ সর্বশক্তি প্রয়োগ করে।

১৯২৫ সালের অক্টোবরে গ্রেফতার হন রামপ্রসাদ বিসমিল। অভিযোগ, সংগঠনেরই দু’জন সদস্যের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তাঁর অবস্থান জানতে পারে পুলিশ।

আশফাকউল্লা খান প্রথমে পালিয়ে নেপালে চলে যান। পরে বর্তমান ঝাড়খণ্ডের ডালটনগঞ্জে আশ্রয় নেন। প্রায় এক বছর পরে তিনিও গ্রেফতার হন।

ব্রিটিশ সরকার মোট প্রায় ৪০ জনকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘ বিচারের পরে চার বিপ্লবীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়—রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান, রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী এবং ঠাকুর রোশন সিংহ। অন্য অনেককে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এইচআরএ-র প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে চন্দ্রশেখর আজাদই ছিলেন অন্যতম, যাঁকে ব্রিটিশ পুলিশ তখন গ্রেফতার করতে পারেনি।

কাকোরির পরে কী হল এইচআরএ-র?

কাকোরি মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এক বছর পরে, ১৯২৮ সালে এইচআরএ-র নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পঞ্জাব, বিহার এবং বাংলায় সক্রিয় বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলিত হয়ে সংগঠনটি হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন বা এইচএসআরএ-তে রূপান্তরিত হয়।

নতুন সংগঠন ক্রমশ আরও স্পষ্ট ভাবে সমাজতান্ত্রিক এবং মার্কসবাদী আদর্শের দিকে এগোয়। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি হয়। তাদের বক্তব্যে শ্রমজীবী মানুষের নেতৃত্বে গণবিপ্লব এবং সর্বহারার শাসন প্রতিষ্ঠার ধারণা ক্রমশ গুরুত্ব পেতে থাকে।

১৯২০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিটিশবিরোধী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে এই সংগঠনের ভূমিকা ছিল। সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, তার পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ পুলিশ আধিকারিক জে পি সন্ডার্সকে হত্যা এবং ভাইসরয় আরউইনের ট্রেনে বোমা হামলার মতো ঘটনা সেই বিপ্লবী ধারারই অংশ।

তবে ১৯৩০-এর দশকের মধ্যে সংগঠনের শক্তি ক্রমশ ক্ষয় হতে থাকে। বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হন অথবা কারাবন্দি হন। শেষ পর্যন্ত সংগঠনটি বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীতে ভেঙে যায়।

মাত্র ৪,৬০০ টাকার জন্য এত কঠোর শাস্তি কেন?

কাকোরি অভিযানে লুঠ হওয়া অর্থের পরিমাণ খুব বেশি ছিল না। সেই কারণেই ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং বিশেষ করে চার জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে অত্যন্ত কঠোর বলে মনে হয়েছিল।

কিন্তু কাকোরির গুরুত্ব টাকার অঙ্কে ছিল না। তার আসল তাৎপর্য ছিল রাজনৈতিক এবং প্রতীকী।

ব্রিটিশ শাসনে সরকারি কোষাগারের জন্য নিয়ে যাওয়া অর্থকে পরিকল্পিত ভাবে লক্ষ্য করে এমন অভিযান কার্যত নজিরবিহীন ছিল। বিপ্লবীরা সাধারণ যাত্রীদের সম্পত্তি লুঠ করেননি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল শুধু ব্রিটিশ সরকারের টাকা।

অর্থাৎ বার্তাটি ছিল পরিষ্কার—বিপ্লবীরা ব্রিটিশ সরকারের রাজস্বকেও ঔপনিবেশিক শোষণের সম্পদ হিসেবে দেখছেন এবং সেই সম্পদের উপর ব্রিটিশ রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অধিকার তাঁরা মানছেন না।

এই কারণেই ব্রিটিশ প্রশাসন ঘটনাটিকে সাধারণ ডাকাতি হিসেবে দেখেনি। তাদের আশঙ্কা ছিল, কাকোরির দৃষ্টান্ত অন্য তরুণ বিপ্লবীদেরও একই ধরনের অভিযানে উৎসাহিত করতে পারে।

ফলে কাকোরি মামলায় কঠোরতম শাস্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার শুধু কয়েক জন বিপ্লবীকে দমন করতে চায়নি; গোটা দেশের কাছে একটি সতর্কবার্তাও পৌঁছে দিতে চেয়েছিল।

কিন্তু ইতিহাসে তার ফল হয়েছিল অনেকটাই উল্টো। রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান, রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী এবং রোশন সিংহের ফাঁসি তাঁদের স্বাধীনতা আন্দোলনের শহিদে পরিণত করে। আর কাকোরি হয়ে ওঠে এমন এক ঘটনার নাম, যেখানে কয়েক হাজার টাকা দখলের চেয়ে অনেক বড় ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করার দুঃসাহস।