উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী মানচিত্র বদলাচ্ছে। ২০২৪ সালে বিজেপির জমি হারানো প্রশ্ন তুলেছে, দলের রাজনৈতিক আধিপত্য আর কত দিন অটুট থাকবে।

তবে এই নির্বাচনী ধাক্কাগুলিকেই বিজেপির আধিপত্য ক্ষয়ে যাওয়ার প্রমাণ বলে ধরে নেওয়া যায় না। দল এখনও প্রবল শক্তিশালী। তার বিপুল ভোটভিত্তি রয়েছে, মতাদর্শের আবেদনও যথেষ্ট। এখন প্রশ্ন হল, যে শক্তিগুলি বিজেপির আধিপত্য গড়ে তুলেছিল, সেগুলি কি নিজেদের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে শুরু করেছে? উত্তরপ্রদেশেই তার সবচেয়ে স্পষ্ট পরীক্ষা হতে পারে।

উত্তরপ্রদেশ শুধু ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য নয়; বিজেপির ক্ষমতার প্রধান দুর্গও। জাতীয় রাজনীতিতে দলের উত্থানের কেন্দ্রে রয়েছে এই রাজ্য। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এখানকার ৮০টি আসনের মধ্যে ৭১টি জিতেছিল বিজেপি। জাতীয় স্তরে দলের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠেছিল উত্তরপ্রদেশ। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টির শক্তিশালী জোটের মোকাবিলা করেও বিজেপি একাই জিতেছিল ৬২টি আসন। কেন্দ্রে পরপর দু’বার দলের সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পিছনে উত্তরপ্রদেশের এই বিপুল অবদান ছিল নির্ণায়ক।

বিজেপির সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতি এবং হিন্দু-মুসলমান বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে জনসমর্থন সংগঠিত করার প্রধান পরীক্ষাগার এখনও উত্তরপ্রদেশ। ফলে এখানে দলের শক্তি কমলে তার প্রভাব রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পড়বে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফল জোরালো ভাবেই বুঝিয়ে দেয়, উত্তরপ্রদেশে বিজেপি জমি হারিয়েছে। ২০১৯ সালের ৬২টি থেকে দলের আসন নেমে আসে ৩৩টিতে। অন্য দিকে, সমাজবাদী পার্টি জেতে ৩৭টি এবং কংগ্রেস ছ’টি আসন। সবচেয়ে বেশি ক্ষয় দেখা যায় অবধে—একদা অযোধ্যার মন্দির আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র এই অঞ্চলেই। ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অবধের ১৫৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ১০১টিতে। অথচ ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ওই এলাকার মাত্র ৫১টি বিধানসভা কেন্দ্রে দল এগিয়ে ছিল। অর্থাৎ, ২০২২ সালে জেতা আসনের তুলনায় ৫০টি কম।

যে সময়ে এই ফল এসেছিল, তা-ও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তার কিছু দিন আগেই অযোধ্যায় রামমন্দিরের উদ্বোধন হয়েছিল। কয়েক দশক ধরে বিজেপি এবং বৃহত্তর হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী শিবিরকে চালিত করা একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রকল্পের পরিণতি ছিল সেই উদ্বোধন। কিন্তু ভোটের বাক্সে তার যে প্রভাব প্রত্যাশিত ছিল, তা দেখা যায়নি। সবচেয়ে লক্ষণীয়, অযোধ্যা যে ফৈজাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত, বিজেপি সেই আসনেই হেরে যায়। আশপাশের বহু কেন্দ্রেও দলের পরাজয় ঘটে।

এর অর্থ এই নয় যে অযোধ্যা কিংবা তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতি আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসল তাৎপর্য হল, আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রেও তখন শুধু এই রাজনীতির জোরে ভোটে জেতা যাচ্ছিল না। মন্দিরের অনুদান নিয়ে পরবর্তী বিতর্কের প্রেক্ষাপটে, এই অঞ্চলেই বিজেপির ক্ষয় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠার ঘটনা আরও অর্থবহ। ওই বিতর্কের প্রভাব এখনও রাজ্য জুড়ে অনুভূত হচ্ছে। ঘটনাটি দেখিয়েছে, অত্যন্ত শক্তিশালী মতাদর্শগত প্রতীকও সততা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উত্তরপ্রদেশে বিজেপির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটি উপাদানের সমন্বয়ের উপর: সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে জনসমর্থন সংগঠিত করা, একটি স্থায়ী ভোটভিত্তি এবং মন্দির আন্দোলনকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর জোট। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন দেখিয়েছে, এই সমন্বয়েও ভাঙন ধরতে পারে। তার দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য নির্ভর করবে একটি বিষয়ের উপর—এই বিচ্যুতি কি সাময়িক, নাকি ভোটারদের পছন্দ ও প্রত্যাশায় স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা?

২০২৪ সালের ফল আরও একটি ইঙ্গিত দেয়। রাজনীতির কোনও একটি মাত্র বিষয় অন্য সমস্ত বিষয়কে ছাপিয়ে যাক, ভোটাররা তা মেনে নিতে আগের চেয়ে কম রাজি। বিশেষত, যখন অর্থনৈতিক সাফল্যের দাবির সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার মিল থাকে না।

উত্তর ও পূর্ব ভারতের যে রাজ্যগুলির অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনায় দুর্বল, উত্তরপ্রদেশ এখনও তাদেরই একটি। কয়েক দশক ধরেই ছবিটা এমন। রাজ্যের অর্থনীতি বেড়েছে বটে, কিন্তু সেই বৃদ্ধি অন্য রাজ্যের তুলনায় তার অবস্থান মৌলিক ভাবে বদলাতে পারেনি। যথেষ্ট উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি।

বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আর মানুষের বাস্তব অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার ফারাক রাজ্যের শিল্পাঞ্চলগুলিতে বিশেষ ভাবে চোখে পড়ে। কানপুর, ফিরোজাবাদ, ভদোহী ও মোরাদাবাদে আমেরিকার শুল্কনীতি এবং ভারতীয় পণ্যের উপর বাড়তি শুল্কের জেরে রফতানিকারকেরা বড় ধাক্কার মুখে পড়েছেন। বরাত কমেছে, বাজারে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে, কাজ হারানোর আশঙ্কা বেড়েছে। প্রধানত অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকেরাই এই বিপদের মুখে।

কাজের অনিশ্চয়তা এবং নিয়োগ ব্যবস্থার টালমাটাল অবস্থায় তরুণ ভোটারদের হতাশা বিশেষ ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। বছরের গোড়ার দিকে সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা ‘নিট’ ঘিরে প্রতিবাদে তাঁদের অনেকে সক্রিয় ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। উত্তরপ্রদেশে বারবার পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, পরীক্ষা বাতিল হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই সাম্প্রতিক বছরগুলির তুলনায় অনেক বেশি হাড্ডাহাড্ডি হওয়ার সম্ভাবনা। বিজেপি এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু ২০২৪ সালের ফল বিরোধীদের সামনে সুযোগ খুলে দিয়েছে। বিভিন্ন স্তরে এমন কিছু টানাপোড়েনও প্রকাশ্যে এনেছে, আগের নির্বাচনগুলিতে যা প্রায় বোঝাই যায়নি।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘাটতি মেটাতে সরকার এখন জোরকদমে কাজ করছে। স্থানীয় উদ্যোগপতিদের উৎসাহ দেওয়া এবং কর্পোরেট ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের ভাতা দেওয়ার মতো একগুচ্ছ পদক্ষেপে সেই তৎপরতা ধরা পড়ছে।

মহিলাদের জন্যও নতুন প্রকল্প আনার প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘মহিলা উদ্যমী ঋণ যোজনা’। এই প্রকল্পে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত প্রায় এক কোটি মহিলাকে পর্যায়ক্রমে সর্বোচ্চ এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত সুদহীন ঋণ দেওয়ার কথা।

বিরোধীরাও সুযোগ দেখতে পাচ্ছে। সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস—দুই দলই তরুণ ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চাইছে। অখিলেশ যাদব ও রাহুল গান্ধী গুরুত্ব দিচ্ছেন ছাত্রবিক্ষোভ, বেকারত্ব এবং জাতপাতের ক্রমবর্ধমান বিভাজনের উপর। বিশেষ নজরে রয়েছে উচ্চবর্ণের বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক বিরোধ এবং উচ্চবর্ণের সঙ্গে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির দূরত্ব। ২০২৪ সালের মতো দুই দলের সমন্বয় গড়ে উঠলে ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে বিরোধীদের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হতে পারে।

ফলে ২০২৭ সালের নির্বাচন শুধু বিজেপি হারানো আসন পুনরুদ্ধার করতে পারে কি না, তার পরীক্ষা হবে না। যে রাজনৈতিক ছক দলকে লখনউ থেকে নয়াদিল্লি পর্যন্ত ক্ষমতায় পৌঁছে দিয়েছিল, ভোট টানার ক্ষেত্রে তার শক্তি আগের মতোই অটুট রয়েছে কি না, তা-ও বোঝা যাবে। ২০২৪ সালের ফল ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, উত্তরপ্রদেশে সেই ছক আর অভেদ্য নয়। সে বছর যে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গিয়েছিল, তা আরও স্থায়ী রূপ নেবে কি না, নির্ধারণ করবে ২০২৭ সালের নির্বাচন। উত্তরপ্রদেশে যা ঘটবে, তা বদলে দিতে পারে সেই রাজনৈতিক ভারসাম্যও, যার উপর বিজেপির জাতীয় আধিপত্য দাঁড়িয়ে রয়েছে।