দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন মাওবাদী নেতা অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ। বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর থেকে তাঁকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি সিপিআই (মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি-১-এর সম্পাদক। তাঁর সন্ধান দিতে ঝাড়খণ্ড সরকার এক কোটি এবং ওড়িশা সরকার এক কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। দুই রাজ্য মিলিয়ে পুরস্কারের অঙ্ক ছিল দুই কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্রেফতারি এড়িয়ে চলছিলেন আকাশ। নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায় তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ৫৫টি মামলা রয়েছে। ফলে এই গ্রেফতারির সঙ্গে একাধিক রাজ্যের পুরনো নাশকতার তদন্তও জড়িয়ে রয়েছে।

আকাশ ছিলেন মাওবাদী নেতা কিষেণজির ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ২০১১ সালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কিষেণজির মৃত্যুর পরে বাংলায় মাওবাদী সংগঠনের নেতৃত্বে তাঁর গুরুত্ব বাড়ে। পুলিশের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি ঝাড়খণ্ডের দিকে চলে যান। পরে সারান্ডার জঙ্গল হয়ে ওঠে তাঁর অন্যতম আশ্রয়স্থল।

সাম্প্রতিক অভিযানে সেই আশ্রয়ও দুর্বল হয়ে পড়ে। সাংবাদিক বৈঠকে পুলিশ জানিয়েছে, সারান্ডায় নিরাপত্তাবাহিনীর লাগাতার তৎপরতায় মাওবাদীদের সশস্ত্র দল ছত্রভঙ্গ হয়। দলের পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা এগারো-বারোজন সদস্য আলাদা হয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে আসেন। তাঁদের কয়েকজন ঝাড়খণ্ডে ধরা পড়েন; অন্যেরা বাংলায় আশ্রয় খুঁজছিলেন। সেই সূত্রেই চলছিল নজরদারি।

আকাশের সহযোগীদের মধ্যেও আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি বাঁকুড়ায় আত্মসমর্পণ করেন আঞ্চলিক কমিটির সদস্য রামপ্রসাদ মার্ডি, তাঁর স্ত্রী মীতা ওরফে নয়নতারা এবং গৌরী নামে আরেক সদস্য। রামপ্রসাদের মাথায় পনেরো লক্ষ এবং মীতার মাথায় দশ লক্ষ টাকার পুরস্কার ছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, আকাশের কাছ থেকে কয়েকটি পেনড্রাইভ, নগদ টাকা, নথিপত্র এবং চিঠি পাওয়া গিয়েছে। সেগুলি পরীক্ষা করা হচ্ছে। ঝাড়খণ্ড পুলিশকেও গ্রেফতারির খবর দেওয়া হয়েছে; সেখানকার তদন্তকারীরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে আসবেন। সম্প্রতি ধৃত শ্রদ্ধা বিশ্বাসকে জেরা করেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে পুলিশের দাবি। পুরনো মামলাগুলিতে আকাশের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে।

ঝাড়খণ্ডে আকাশের দলের বিরুদ্ধে নিরাপত্তাবাহিনীর উপর একাধিক হামলার অভিযোগ রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পশ্চিম সিংভূমের তুম্বাহাকা এলাকায় সংঘর্ষ ও বিস্ফোরণে কোবরা বাহিনীর নয়জন আহত হন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে জরাইকেলা এলাকায় এক জওয়ান নিহত হন। চলতি বছরের মার্চেও তাঁর দলের সঙ্গে সংঘর্ষে দুই নিরাপত্তাকর্মীর আহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় নির্দিষ্ট দায় ও যোগসূত্র খতিয়ে দেখাই তদন্তের কাজ।

ঝাড়খণ্ড পুলিশের পরিসংখ্যানও অভিযানের সামগ্রিক ব্যাপ্তি বোঝাচ্ছে। তাদের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে অগস্টের মধ্যে রাজ্যে ১১৩ জন মাওবাদীকে গ্রেফতার করা হয়েছে; আত্মসমর্পণ করেছেন ৫০ জন এবং নিহত হয়েছেন ২২ জন। অগস্ট পর্যন্ত পলাতক মাওবাদীর সংখ্যা ছিল ১৮। এই সময়ের মধ্যে শীর্ষ নেতা মিসির বেসরাও গ্রেফতার হয়েছেন। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পটিরাম মাঝি ও লালচাঁদ হেমব্রমের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। একের পর এক এই ঘটনায় চাপ ক্রমশ বেড়েছে সংগঠনের অবশিষ্ট নেতৃত্বের উপর।

গ্রেফতারির পরে এসটিএফকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সমাজমাধ্যমে তিনি জানান, রাজ্যের ভিতরে মাওবাদীদের প্রভাবিত সশস্ত্র বলয় ফের গড়ে উঠতে দেওয়া হবে না। মানুষের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন রক্ষায় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আকাশের গ্রেফতারির গুরুত্ব তাঁর সাংগঠনিক পদ এবং দীর্ঘদিনের আন্তঃরাজ্য যোগাযোগে। তাঁর বাকি সঙ্গীরা কোথায়, অস্ত্র কোথায় রাখা রয়েছে, সেই তথ্য সংগ্রহ করতে চাইছে ঝাড়খণ্ড পুলিশ। ফলে তদন্তের পরবর্তী ধাপে গুরুত্ব পাবে সংগঠনের অবশিষ্ট সদস্য ও অস্ত্রভাণ্ডারের হদিস।