রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ, ১৯৩৭-এর সিদ্ধান্ত: ‘বন্দে মাতরম্’ নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থানের ইতিহাস

যা জানা জরুরি
- ভারতের জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ‘বন্দে মাতরম্’ কেবল একটি গান নয়—এটি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মন্ত্র, স্বদেশি আন্দোলনের প্রাণধ্বনি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগের প্রতীক।
- অথচ এই গানটির কোন অংশ জাতীয় অনুষ্ঠানে গাওয়া হবে, তা নিয়ে প্রায় নয় দশক ধরে বিতর্ক চলছে।
- সেই বিতর্ক নতুন করে উস্কে দিয়েছে কংগ্রেস কার্যসমিতির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারতের জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ‘বন্দে মাতরম্’ কেবল একটি গান নয়—এটি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মন্ত্র, স্বদেশি আন্দোলনের প্রাণধ্বনি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগের প্রতীক। অথচ এই গানটির কোন অংশ জাতীয় অনুষ্ঠানে গাওয়া হবে, তা নিয়ে প্রায় নয় দশক ধরে বিতর্ক চলছে। সেই বিতর্ক নতুন করে উস্কে দিয়েছে কংগ্রেস কার্যসমিতির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। দলটি জানিয়েছে, নিজেদের অনুষ্ঠানে তারা ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুই স্তবকই গাইবে—ঠিক যেমনটি স্থির হয়েছিল ১৯৩৭ সালে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই অবস্থানকে ‘জাতীয়তাবিরোধী’ এবং ‘তোষণের রাজনীতি’ বলে আক্রমণ করেছেন। কংগ্রেসের পাল্টা দাবি, ১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্তটি কোনও সম্প্রদায়ের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ ছিল না; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শ, গানটির সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট এবং একটি বহু ধর্মের দেশের ঐক্য রক্ষার প্রয়োজন বিবেচনা করেই তা গ্রহণ করা হয়েছিল।
বঙ্কিমচন্দ্রের গান কীভাবে জাতীয় মন্ত্র হয়ে উঠল
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বন্দে মাতরম্’ রচনা করেছিলেন উনিশ শতকের সত্তরের দশকে। পরে ১৮৮২ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এ গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে লেখা উপন্যাসটিতে মাতৃভূমিকে দেবীরূপে কল্পনা করা হয়েছিল।
গানের প্রথম দুই স্তবকে মাতৃভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা রয়েছে—সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা, শীতল এবং মধুরভাষিণী এক দেশমাতার বন্দনা। এখানে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় দেবদেবীর উল্লেখ নেই। কিন্তু পরবর্তী স্তবকগুলিতে মাতৃভূমিকে দুর্গা, কমলা বা লক্ষ্মী এবং বাণী বা সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্ন করে দেখা হয়েছে। ‘আনন্দমঠ’-এর কাহিনি ও চরিত্রগুলির ধর্মীয় পটভূমিও পরবর্তী কালে বিতর্কের একটি কারণ হয়ে ওঠে।
১৮৯৬ সালে কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ গানটি পরিবেশন করেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় ‘বন্দে মাতরম্’ বাঙালি এবং পরে সমগ্র ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান স্লোগানে পরিণত হয়। ব্রিটিশ প্রশাসন গানটি ও তার স্লোগানকে বিপজ্জনক বিদ্রোহী প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করে। বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দিয়ে কারাবরণ করেন, এমনকি ফাঁসির মঞ্চেও ওঠেন।
আপত্তির সূচনা
গানটির প্রথমাংশ নিয়ে সাধারণভাবে আপত্তি না থাকলেও পরবর্তী স্তবকগুলিতে মাতৃভূমিকে হিন্দু দেবীরূপে উপস্থাপনের বিষয়ে মুসলিম নেতাদের একাংশ প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী মুসলমানদের পক্ষে কোনও দেশ বা ভূমিকে দেবীরূপে উপাসনা করা সম্ভব নয়।
বিশেষত ‘আনন্দমঠ’-এর কাহিনিতে মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে সন্ন্যাসীদের লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট আপত্তিকে আরও তীব্র করে। কংগ্রেসের বিভিন্ন অধিবেশন এবং প্রাদেশিক আইনসভার কার্যক্রমে গানটি পরিবেশন করা হলে মুসলিম লীগের সদস্যদের একাংশ প্রতিবাদ জানান।
১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেস বিপুল সাফল্য পেয়ে একাধিক প্রদেশে সরকার গঠন করেছিল। ফলে দলটির সামনে তখন একটি বড় প্রশ্ন—স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রতীককে সম্মান জানানোর পাশাপাশি কীভাবে সমস্ত ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষকে জাতীয় আন্দোলনের মধ্যে রাখা যায়।
সুভাষ, নেহরু ও রবীন্দ্রনাথের পত্রালাপ
বিতর্কের মীমাংসায় কংগ্রেস নেতারা রবীন্দ্রনাথের মতামত চেয়েছিলেন। ‘বন্দে মাতরম্’-এর সঙ্গে কবির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কংগ্রেস অধিবেশনে তিনিই প্রথম গানটি গেয়েছিলেন এবং তার সুরারোপের ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
১৯৩৭ সালের অক্টোবরে সুভাষচন্দ্র বসু রবীন্দ্রনাথের কাছে গানটি সম্পর্কে মতামত চান। একই সময়ে সুভাষচন্দ্র এবং জওহরলাল নেহরুর মধ্যেও চিঠি চালাচালি হয়। নেহরু ২০ অক্টোবর সুভাষকে জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা করবেন। গানটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট বুঝতে তিনি ‘আনন্দমঠ’-এর ইংরেজি অনুবাদও পড়ছিলেন।
নেহরুর অবস্থান ছিল সূক্ষ্ম। তাঁর মতে, আপত্তির একটি অংশ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দ্বারা তৈরি হলেও তার মধ্যে কিছু বাস্তব ভিত্তিও ছিল। প্রকৃত ধর্মীয় আপত্তি থাকলে তা বিবেচনা করা উচিত—কিন্তু সাম্প্রদায়িক চাপের কাছে মাথা নত করা উচিত নয়।
২৬ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ নেহরুকে তাঁর মতামত জানান। কবির বক্তব্যের সারকথা ছিল, গানের প্রথম দুই স্তবক মাতৃভূমির সৌন্দর্যের বন্দনা এবং তাতে এমন কিছু নেই যা একেশ্বরবাদী ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করতে পারে। কিন্তু পরবর্তী অংশে দেবী দুর্গা-সহ হিন্দু দেবীমূর্তির উল্লেখ থাকায় অন্য ধর্মাবলম্বীদের সেই অংশ গাইতে বাধ্য করা সঙ্গত নয়। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ গানটি বর্জনের কথা বলেননি; বরং সর্বজনগ্রাহ্য অংশটিকে জাতীয় ব্যবহারের জন্য গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই পত্রালাপের নথিগুলিই ১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্তের মূল প্রেক্ষাপট তুলে ধরে।
কী স্থির করেছিল কংগ্রেস কার্যসমিতি
১৯৩৭ সালের ২৯ অক্টোবর কংগ্রেস কার্যসমিতি সিদ্ধান্ত নেয়, জাতীয় সমাবেশে ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুই স্তবক গাওয়া হবে। সেখানে গানটির স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐতিহাসিক ভূমিকা স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছিল। একই সঙ্গে বলা হয়, পরবর্তী স্তবকগুলির ধর্মীয় বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তির কারণে সেগুলিকে সর্বজনীন জাতীয় সংগীতের অংশ করা ঠিক হবে না।
কোনও ব্যক্তির বিবেকগত আপত্তি থাকলে তাঁকে গান গাইতে বাধ্য না করা এবং প্রয়োজনে অন্য কোনও নির্বিরোধী দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনের সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, আচার্য নরেন্দ্র দেব প্রমুখের ভূমিকা ছিল। রবীন্দ্রনাথের মতামত সেই সিদ্ধান্তে গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলে ঐতিহাসিকেরা উল্লেখ করেছেন।
স্বাধীন ভারতের স্বীকৃতি
স্বাধীনতার পরে জাতীয় সংগীত নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত ‘জনগণমন’ জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদের সভাপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ ঘোষণা করেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে গানটি ‘জনগণমন’-এর সমান সম্মান ও মর্যাদা পাবে।
তবে সংবিধানে ‘জাতীয় গান’ কথাটি আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। রাজেন্দ্র প্রসাদের ঘোষণার ভিত্তিতেই ‘বন্দে মাতরম্’ জাতীয় গানের মর্যাদা পেয়ে এসেছে। সাধারণভাবে স্বীকৃত অংশ বলতে প্রথম দুই স্তবককেই বোঝানো হয়েছে।
বর্তমান বিতর্ক কোথায়
কংগ্রেস কার্যসমিতি সম্প্রতি জানিয়েছে, দলের অনুষ্ঠানে ১৯৩৭ সালের রীতিই অনুসরণ করা হবে। বিজেপির অভিযোগ, কংগ্রেস জাতীয় গানকে খণ্ডিত করে মুসলিম লীগের আপত্তির কাছে নতি স্বীকার করেছিল এবং এখন সেই ‘তোষণের রাজনীতি’ ফিরিয়ে আনছে। অমিত শাহ সিদ্ধান্তটিকে জাতীয়তাবিরোধী বলে আক্রমণ করেছেন।
কংগ্রেসের পাল্টা বক্তব্য, ১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্তকে বর্তমান রাজনীতির চোখ দিয়ে বিচার করলে ইতিহাস বিকৃত হয়। এটি শুধু নেহরুর সিদ্ধান্ত ছিল না; সুভাষচন্দ্র, আজাদ এবং রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ ও মতবিনিময়ের ভিত্তিতে গৃহীত একটি সম্মিলিত অবস্থান। সম্প্রতি দলটি সেই সময়ের একাধিক চিঠি ও নথিও প্রকাশ্যে এনেছে।
অতএব বিতর্কটি ‘বন্দে মাতরম্’-কে সম্মান করা বা না-করার সরল দ্বন্দ্ব নয়। মূল প্রশ্ন হল—একটি ঐতিহাসিক সাহিত্যকর্মের সম্পূর্ণ ধর্মীয়-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কি জাতীয় অনুষ্ঠানে বাধ্যতামূলক হবে, না কি তার সর্বজনগ্রাহ্য অংশটিই দেশের বহুত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হবে? ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিল। আর সেই পথের অন্যতম প্রধান দিশারি ছিলেন ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম ঐতিহাসিক পরিবেশক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



