ফোন, সমাজমাধ্যম ও গেম নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে ব্যবহার করলে শিশু ও তরুণদের অবসাদ বা উদ্বেগ, নিজেকে আঘাত করা, ঘুমের সমস্যা এবং নিঃসঙ্গতায় ভোগার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এ নিয়ে এ যাবৎ বৃহত্তম গবেষণা-পর্যালোচনায় এমনই তথ্য উঠে এসেছে। ২৫ বছরের কম বয়সি ৯০ লক্ষেরও বেশি মানুষের তথ্য এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সোমবার ল্যানসেট গোষ্ঠীর চিকিৎসাবিজ্ঞান পত্রিকা ‘ইক্লিনিক্যালমেডিসিন’-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে আগের ১২১টি গবেষণা-পর্যালোচনার ফল একত্র করা হয়েছে। ১৩ জন জনস্বাস্থ্য গবেষকের লেখা এই বিশ্লেষণই ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত তিনটি গবেষণাপত্রের ধারাবাহিকের মূল ভিত্তি।

গবেষকেরা স্বীকার করেছেন, পর্দার ব্যবহারই যে এই ক্ষতির কারণ, তা এই তথ্য দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। তবে তাঁদের যুক্তি, বিভিন্ন গবেষণায় একই ধরনের সম্পর্ক এত ধারাবাহিক ভাবে উঠে এসেছে এবং এত বেশি শিশু-তরুণ ডিজিটাল পরিবেশের সংস্পর্শে রয়েছে যে, চূড়ান্ত প্রমাণের অপেক্ষা না করেই সরকারের পদক্ষেপ করা উচিত।

গবেষণা-ধারাবাহিকের চেয়ার এবং জেনিভার ‘ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনস ফর হেলথ ল্যাব’-এর ইলোনা কিকবুশ বলেন, “সরকারগুলি প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে নিজেদের নিয়ম নিজেরাই লেখার সুযোগ দিয়েছে। তার ফলে এমন ব্যবসায়িক মডেল তৈরি হয়েছে, যার লক্ষ্য মানুষের মনোযোগ আটকে রাখা এবং তথ্য সংগ্রহ করা। স্বাস্থ্যের বিষয়টি সেখানে পরে ভাবা হয়।”

কী পাওয়া গিয়েছে

পর্যালোচনায় ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে ‘সমস্যাজনক ব্যবহার’ বলতে বোঝানো হয়েছে ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, সারাক্ষণ তা নিয়ে মগ্ন থাকা এবং ক্ষতি হচ্ছে বুঝেও ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া। তুলনামূলক কম ব্যবহারকারী বা এমন প্রবণতাহীনদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গিয়েছে, সমস্যাজনক ব্যবহারকারীদের মধ্যে:

  • আচরণগত সমস্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক অনুভূতির সম্ভাবনা ৩.৩ গুণ;
  • অবসাদ, উদ্বেগ বা অন্য সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা এবং নিঃসঙ্গতার সম্ভাবনা ২.৩ গুণ;
  • নিজেকে আঘাত করা বা আত্মহত্যার চিন্তা, ঘুমের সমস্যা এবং শারীরিক ভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার সম্ভাবনা ২.২ গুণ;
  • মদ্যপান, ধূমপান, মাদক গ্রহণ বা অন্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সম্ভাবনা ১.৭৫ গুণ।

এই তরুণদের মধ্যে জীবনের মান খারাপ বলে জানানোর প্রবণতাও বেশি ছিল।

শুধু সমাজমাধ্যমে কতটা সময় বা কত ঘন ঘন কাটানো হচ্ছে, সেই হিসাবে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে ফল কিছুটা আলাদা। সে ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহারের সঙ্গে সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যার সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ এবং মদ্যপানের সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ বেশি হওয়ার সম্পর্ক মিলেছে। খাদ্যগ্রহণজনিত মানসিক ব্যাধির সঙ্গে সম্পর্ক তুলনায় দুর্বল। নিজেকে আঘাত করা, ঘুম বা সামগ্রিক ভালো থাকার সঙ্গে পরিসংখ্যানগত ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কোনও সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

গবেষকেরা বিভিন্ন ধরনের পর্দা ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যের নানা পরিণতির মধ্যে মোট ৩১৬টি সম্পর্ক পরীক্ষা করেছেন। তার চার ভাগের তিন ভাগেরও বেশি ক্ষতির দিকেই ইঙ্গিত করেছে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ক্ষেত্রে সমাজমাধ্যম ব্যবহার ও অবসাদের সম্পর্ক অনেক বেশি জোরালো। বিশেষ করে সক্রিয় অংশগ্রহণ না করে শুধু অন্যদের পোস্ট বা ভিডিয়ো দেখে স্ক্রল করে যাওয়ার সঙ্গে মেয়েদের মন খারাপ থাকা এবং ঘুমের অবনতির যোগ পাওয়া গিয়েছে। কমবয়সি কিশোর-কিশোরীদের তুলনায় ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণহীন ডিজিটাল ব্যবহার ও খারাপ মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক বেশি শক্তিশালী ছিল।

দশ বছর পর্যন্ত বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগের দিক রয়েছে:

  • পাঁচ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে বেশি সময় পর্দার সামনে কাটালে আবেগ ও আচরণগত সমস্যা বেশি দেখা গিয়েছে।
  • পাঁচ থেকে দশ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে ফোন বা ট্যাবলেট ব্যবহারে প্রতি অতিরিক্ত এক ঘণ্টার সঙ্গে প্রায় ১১ মিনিট কম ঘুমের সম্পর্ক মিলেছে।
  • কল্পনানির্ভর কনটেন্ট দেখার সঙ্গে শেখার ক্ষমতা ও মনোযোগ দুর্বল হওয়ার যোগ পাওয়া গিয়েছে।

কিছু সুফলও

পর্দা ব্যবহারের কিছু ইতিবাচক দিকও গবেষণায় উঠে এসেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সি যে শিশুরা শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখেছে, বিশেষ করে বাবা বা মায়ের সঙ্গে বসে, তাদের ভাষার বিকাশ ভালো হয়েছে। শরীর নড়াচড়া করতে হয়, এমন সক্রিয় ভিডিয়ো গেমের সঙ্গে ভালো থাকা ও বেশি শারীরিক ব্যায়ামের সম্পর্ক মিলেছে।

নিজের শরীরকে ইতিবাচক ভাবে গ্রহণে উৎসাহ দেয়, এমন কনটেন্টের সঙ্গেও ভালো থাকার যোগ রয়েছে। উল্টো দিকে, আদর্শ ‘নিখুঁত’ শরীরের ছবি এবং ফিটনেসের নামে সেই আদর্শ অনুসরণের চাপ তৈরি করা ‘ফিটস্পিরেশন’ কনটেন্টের সঙ্গে ভালো থাকার অবনতির সম্পর্ক মিলেছে। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে পরিমিত ব্যবহার এবং অন্যদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের উদ্দেশ্যে ব্যবহার ভালো থাকা ও সহায়তা পাওয়ার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

গবেষকেরা লিখেছেন, “জনস্বাস্থ্যের মূল প্রশ্ন শুধু ‘কতটা’ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নয়; ‘কী, কী ভাবে এবং কার সঙ্গে’ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও।”

ভারতের ছবি

ভারতের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলির তথ্যে বড় ঘাটতি রয়েছে। মোট প্রমাণের পাঁচ শতাংশেরও কম এসেছে এই দেশগুলি থেকে, যদিও সেখানে তরুণদের পর্দা ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। পর্যালোচনার ফল মূলত উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার শিশুদের তথ্যনির্ভর।

সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সিদের প্রতি চার জনের তিন জন ফোনে সমাজমাধ্যম ব্যবহার করে। পড়াশোনা বা সঙ্গ পাওয়ার জন্য তরুণদের জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও গবেষণায় তার প্রায় কোনও প্রতিফলন নেই বলে ধারাবাহিকে জানানো হয়েছে।

ভারতে শিশুদের সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে একাধিক আইনে—২০২১ সালের তথ্যপ্রযুক্তি বিধি, পকসো এবং ২০২৩ সালের ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন। এগুলির কিছু বিধান শিশুদের ক্ষেত্রে সংস্থাগুলির উপর বাড়তি দায়িত্ব চাপায়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিধান এখনও কার্যকর হয়নি। যেমন ১৮ বছরের কম বয়সিদের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের আগে যাচাইযোগ্য অভিভাবকীয় সম্মতির শর্ত, কারণ তথ্য সুরক্ষা আইনটি এখনও সম্পূর্ণ ভাবে চালু হয়নি।

ডিজিটাল ব্যবস্থার শাসন নিয়ে লেখা গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ভারতে আইন প্রয়োগ সর্বত্র সমান নয়। শিশুদের প্রয়োজন ও সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে পণ্য বা পরিষেবার নকশা তৈরি এবং সামগ্রিক ব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলায় সংস্থাগুলির বাধ্যবাধকতাও অন্য কিছু দেশের তুলনায় কম বিকশিত। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং একাধিক রাজ্য সরকারও ১৬ বছরের কম বয়সিদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারে সীমা আরোপের কথা ভাবছে, গবেষণায় সেই পরিকল্পনারও উল্লেখ রয়েছে।

সোনিপতের ওপি জিন্দল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দল স্কুল অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের সলমন ফিতরাত খান পর্যালোচনার অন্যতম সহলেখক এবং ধারাবাহিকের তরুণ উপদেষ্টা দলের সদস্য। তিনি বলেন, “আমাদের প্রজন্ম এবং পরের প্রজন্মগুলির জন্য পদক্ষেপ করতে সরকারের ‘নিখুঁত’ প্রমাণের অপেক্ষা করা উচিত নয়। ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।”

সম্ভাব্য ক্ষতির বৈশ্বিক হিসাব

ধারাবাহিকের একটি সহযোগী গবেষণাপত্রে বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ‘ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনস ফর হেলথ ল্যাব’-এর লুইস হলির নেতৃত্বে তৈরি ওই গবেষণাপত্রে বিনোদনের জন্য দৈনিক দু’ঘণ্টা পর্দা ব্যবহারের প্রচলিত নির্দেশিকাকে ভিত্তি ধরা হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ২৫ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে অবসাদের প্রায় ২০ শতাংশ এবং স্থূলতার প্রায় ১৫ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে ওই সময়সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। ৫৭টি দেশের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুদের মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ওই সীমার মধ্যে থাকে।

এই হিসাবে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর অবসাদের কারণে প্রায় ২৮ লক্ষ বছর এবং স্থূলতার কারণে প্রায় ২ লক্ষ ৪০ হাজার বছর সুস্থ জীবন হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যবহৃত সূচক ‘ডিসঅ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স’ বা ড্যালি অসুস্থতার জন্য সুস্থ জীবনের ক্ষতি এবং অকালমৃত্যুতে হারিয়ে যাওয়া জীবনকাল—দুই-ই হিসাব করে।

তবে গবেষকেরা সংখ্যাগুলি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে বলেছেন। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ফাল্ক মুলার-রিমেনশ্নাইডার, পর্যালোচনার অন্যতম জ্যেষ্ঠ লেখক, বলেন, “এগুলিকে ক্ষতির নির্ভুল পরিমাপ বলে ধরা উচিত নয়। কারণ, সবচেয়ে ভালো যে গবেষণা বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে, তার ভিত্তিতে হিসাব করা হলেও প্রমাণের নিশ্চয়তা কম।”

হিসাবের উদ্দেশ্য সম্ভাব্য সমস্যার ব্যাপ্তি বোঝানো। প্রায় সব শিশুই যখন কোনও না কোনও ভাবে ডিজিটাল মাধ্যমের সংস্পর্শে আসে, তখন প্রত্যেকের ক্ষেত্রে সামান্য ঝুঁকিও মিলিত ভাবে বড় জনস্বাস্থ্যসমস্যা হয়ে উঠতে পারে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি)-র সদস্য দেশগুলিতে ১০ বছর বয়সের মধ্যেই ৯৩ শতাংশ শিশু ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করছে।

প্ল্যাটফর্মের নকশাই কি আসল প্রশ্ন

বেশির ভাগ গবেষণা পর্দার সামনে কাটানো ঘণ্টা গোনে, কারণ সময় মাপা সহজ। কিন্তু ধারাবাহিকের যুক্তি, শুধু তা দিয়ে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যায়। তরুণেরা কী দেখবে এবং কতক্ষণ থাকবে, তা নির্ধারণ করে প্ল্যাটফর্মের নানা বৈশিষ্ট্য। সেগুলির প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা কঠিন, কারণ প্রয়োজনীয় তথ্য সংস্থাগুলির হাতেই থাকে।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের জে শ, ধারাবাহিকের অন্যতম লেখক, বলেন, “বেশির ভাগ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নকশা তৈরি করা হয় মানুষের মনোযোগ ধরে রাখা এবং তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে; স্বাস্থ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে নয়।” তাঁর মতে, শেষহীন স্ক্রল, নিজে থেকে পরের ভিডিয়ো চালু হয়ে যাওয়া এবং ব্যক্তির পছন্দ অনুযায়ী সাজানো ফিড—সবই “ইচ্ছাকৃত নকশাগত সিদ্ধান্ত; বিষয়টি শুধু ব্যক্তির আত্মসংযমের প্রশ্ন নয়।”

চলতি বছরের গোড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে আদালতে এই যুক্তিই তুলে ধরেছিল। পণ্যের ক্ষতির দায়সংক্রান্ত ওই মামলায় সংস্থার প্ল্যাটফর্মগুলির নকশাকেই ত্রুটিপূর্ণ বলে দাবি করা হয়। বিচারপর্বের তৃতীয় সপ্তাহে ১,৮০০ কোটি মার্কিন ডলারে নিষ্পত্তিতে পৌঁছয় মেটা। তবে ওই অর্থের ৩০ শতাংশ প্রদান নির্ভর করছে টিকটক ও ইউটিউব একই ধরনের শর্ত মেনে নেয় কি না, তার উপর। মেটা নকশায় যে পরিবর্তন আনতে রাজি হয়েছে, তাও শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কিশোর-কিশোরীদের অ্যাকাউন্টে প্রযোজ্য।

পাঁচটি মহাদেশের ২৩ থেকে ৩০ বছর বয়সি ছয় জন তরুণ-তরুণী প্রতিবেদনের লেখকদের পরামর্শ দিয়েছেন। নেতিবাচক খবরের পর খবর দেখে স্ক্রল করে যাওয়া বা ‘ডুমস্ক্রলিং’ এবং নিরন্তর অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনার মতো অভ্যাসকে তাঁরা প্ল্যাটফর্মের নকশার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গবেষকেরা তাঁদের বক্তব্য ব্যক্তিগত জীবন-অভিজ্ঞতা হিসেবে নথিবদ্ধ করেছেন, গবেষণার তথ্য হিসেবে গণ্য করেননি।

নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কী বলা হয়েছে

ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বারবারা প্রাইনসাকের নেতৃত্বে লেখা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা-সংক্রান্ত গবেষণাপত্রে প্রযুক্তি শিল্পের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগে বিলম্ব ঘটানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রযুক্তি সংস্থাগুলি তামাক ও জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের বহুল পরিচিত কৌশল ধার করছে—সন্দেহ তৈরি করা, সমালোচকদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করা এবং নিয়ন্ত্রণকে স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা।” তাঁর আরও বক্তব্য, “নিয়ন্ত্রণ না থাকার অর্থ এই নয় যে প্রযুক্তিটি কোনও নিয়ম ছাড়াই চলছে। তার অর্থ, জননীতির পরিবর্তে সংস্থাগুলিই নিয়ম ঠিক করছে।”

ধারাবাহিকের মতে, শুধু বয়সসীমা বেঁধে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। এর সুপারিশগুলি:

  • নতুন পণ্য ও বৈশিষ্ট্য চালুর আগে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা পরীক্ষা;
  • কোনও বৈশিষ্ট্যের স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে সংস্থাগুলির কাছে থাকা তথ্য স্বাধীন গবেষকদের হাতে তুলে দেওয়া;
  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীনে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ, যাতে এক দেশের দুর্বল নিয়ম অন্য দেশের সুরক্ষাকে খাটো না করে;
  • শিশু ও তরুণদের উপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষতিকর প্রভাব নজরদারির জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়া।

আদালতের ভূমিকার কথাও বলেছেন গবেষকেরা। কিকবুশের কথায়, “আইনি পদক্ষেপ এমন কিছু করতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অনেক সময় পারে না। সংস্থাগুলিকে অভ্যন্তরীণ নথি প্রকাশে বাধ্য করতে পারে এবং ক্ষতির দায় কার, তা নিয়ে জনপরিসরের আলোচনার অভিমুখ বদলে দিতে পারে।” তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, মামলা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিকল্প নয়।

২০২৪ সাল পর্যন্ত অধিকাংশ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ন্যূনতম বয়স ছিল ১৩ বছর, যার উৎস ১৯৯৮ সালের একটি মার্কিন শিশুদের গোপনীয়তা সুরক্ষা আইন। কিন্তু আরও কমবয়সিরাও সহজেই সেই বাধা পেরিয়ে যায়। ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়া ‘সোশ্যাল মিডিয়া মিনিমাম এজ অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে ১৬ বছরের কম বয়সিদের সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।

ধারাবাহিকে ইউরোপীয় কমিশনের একটি প্রাথমিক অনুসন্ধানের কথাও আছে। তাতে বলা হয়েছে, নিজেদের নির্ধারিত ন্যূনতম ১৩ বছর বয়সের সীমা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়ে মেটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করে থাকতে পারে।

কীভাবে হয়েছে গবেষণা

এটি আসলে একটি ‘আমব্রেলা রিভিউ’, অর্থাৎ বিভিন্ন গবেষণা-পর্যালোচনার সম্মিলিত পর্যালোচনা। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের স স্যুই হক স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষকেরা নটরাজন পদ্মপ্রিয়ার নেতৃত্বে কাজটি করেছেন। তাঁরা নতুন কোনও পরীক্ষা চালাননি; ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশিত, তরুণদের ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্ত পদ্ধতিগত গবেষণা-পর্যালোচনা সংগ্রহ করেছেন।

১২১টি পর্যালোচনার মধ্যে ৫২টিতে একাধিক গবেষণার পরিসংখ্যান একত্র করে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে প্রায় ২,৭৯০টি গবেষণার তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে। একই তথ্য দু’বার গণনা এড়াতে পুনরাবৃত্তি বাদ দিয়ে ফলগুলি বয়স অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে। বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ২৪ বছর ধরা হয়েছে ল্যানসেট কমিশন অন অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং-এর অবস্থান অনুসরণ করে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি সামলানোর সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের ব্যবস্থাগুলি বিশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিকশিত হতে থাকে।

সীমাবদ্ধতা

গবেষকেরা সীমাবদ্ধতা নিয়েও স্পষ্ট কথা বলেছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণের নিশ্চয়তা মূল্যায়নের প্রচলিত ‘গ্রেড’ পদ্ধতিতে ১২১টি পর্যালোচনার ৯২ শতাংশের প্রমাণের নিশ্চয়তা নিম্ন বা অতি নিম্ন।

হলি বলেন, “আমাদের পর্যালোচনায় সমস্যাজনক ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতির মধ্যে যে সম্পর্কগুলি পাওয়া গিয়েছে, সেগুলির মাত্রা সীমিত। সেগুলি কম নিশ্চয়তাসম্পন্ন প্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে আছে, যা কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।”

তবে প্রমাণের নিশ্চয়তা কম হওয়ার একটি বড় কারণ গবেষণাগুলির পর্যবেক্ষণভিত্তিক চরিত্র। যে পর্যালোচনাগুলি মূল গবেষণার গুণমান যাচাই করেছে, তার বেশির ভাগই সেই মানকে উচ্চ বা মাঝারি বলে মূল্যায়ন করেছে। ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া গবেষণাই বেশি প্রকাশিত হয়েছে—এমন পক্ষপাতের লক্ষণও পরীক্ষায় মেলেনি।

তা সত্ত্বেও শত শত গবেষণা, স্বাস্থ্যের বিভিন্ন পরিণতি এবং নানা বয়সের মানুষের তথ্য মিলিয়ে ফল ধারাবাহিক ভাবে ক্ষতির দিকেই ঝুঁকেছে। গবেষকেরা লিখেছেন, সব মিলিয়ে এই প্রমাণ “সতর্কতামূলক জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপের যথেষ্ট ভিত্তি” তৈরি করে।