কলকাতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগের বিরুদ্ধে সরব হলেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা। সোমবার, ৫ অক্টোবর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কনভেনশনে তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীনরা মনে করছেন বলপ্রয়োগ করে ছাত্রসমাজকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু ছাত্র ও গণআন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষ সেই চাপের কাছে মাথা নত করবেন না।

বিভিন্ন বাম ছাত্রসংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এই কনভেনশনে সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা অংশ নেন। শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্ন উঠে আসে তাঁদের বক্তব্যে। ভিড়ের চাপে কেপি বসু মেমোরিয়াল হল থেকে অনুষ্ঠান সরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গান্ধী ভবনের সামনের খোলা জায়গায় নিয়ে যেতে হয়।

নেহার বক্তব্যে দিল্লির যন্তর মন্তরের প্রতিবাদ এবং কলকাতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির আন্দোলনের মধ্যে সংহতির আহ্বান ছিল। তাঁর কথায়, এক জায়গায় আন্দোলনকারীদের উপর আঘাত নামলে অন্য জায়গার মানুষও তার যন্ত্রণা অনুভব করেন। যাদবপুর কিংবা এসআরএফটিআইয়ে বারবার হামলা চালিয়ে প্রতিবাদ বন্ধ করা সম্ভব নয়। বাম আন্দোলনের ঐতিহ্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতিহাসে বহুবার সংগঠিত মানুষ ক্ষমতার দম্ভের জবাব দিয়েছেন। সেই ঐক্য প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করার ডাক দেন তিনি।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়েও বিজেপিকে আক্রমণ করেন নেহা। তাঁর অভিযোগ, বাংলায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা ভোট দেওয়ার অধিকার; সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে গণতন্ত্রের ভিতই দুর্বল হয়ে পড়ে। পঞ্চায়েত থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত কারা শাসন করবেন, তা নির্ধারণে নাগরিকের ভূমিকা অক্ষুণ্ণ রাখার দাবি জানান তিনি।

বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসের প্রসঙ্গও টানেন আইসা নেত্রী। তাঁর মতে, প্রগতিশীল চিন্তা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় বাংলা অতীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্যের মানুষের দায়িত্ব তাই নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দেশের গণতন্ত্রের পক্ষেও দাঁড়ানো। ভোটারদের অধিকারহরণের অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের জবাবদিহির দাবিও ওঠে কনভেনশনে।

এসআরএফটিআইয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি ব্লসম হাজারিকা বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আক্রমণের মধ্যে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে; পড়ুয়া ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার চেষ্টা চলছে। তবে শিল্প ও চলচ্চিত্রের ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের কাজের মধ্য দিয়েই নিপীড়ন এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি।

রবিবার, ৪ অক্টোবর একদল বহিরাগত এসআরএফটিআইয়ে জোর করে ঢোকার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ। তখন পড়ুয়ারা প্রতিষ্ঠানের ফটকে অবস্থান করছিলেন। দশ দিনের মধ্যে দ্বিতীয়বার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় প্রতিষ্ঠানটি। সোমবার ক্যাম্পাসের একাধিক দেওয়ালচিত্র ও ম্যুরাল সাদা রং দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। ছাত্র সংসদের সহসভাপতি শুভমের বক্তব্য, শরীরের উপর আক্রমণ করা গেলেও তাঁদের শিল্পবোধ ও কল্পনাশক্তিকে দমন করা যাবে না।

আইএসআইয়ের প্রস্তাবিত বিল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সেখানকার এক গবেষক। তাঁর আশঙ্কা, এর ফলে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে সভায় ক্যাম্পাসে হামলার অভিযোগের পাশাপাশি শিক্ষানীতি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় হস্তক্ষেপের প্রশ্নও গুরুত্ব পায়। পড়ুয়াদের বক্তব্যে নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা, প্রশ্ন তোলা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকারের দাবি উঠে আসে। তাঁদের আলোচনায় স্পষ্ট হয়, শিক্ষার সুযোগের সঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নটিকেও একই আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখতে চাইছেন তাঁরা।

অন্যদিকে, সভায় বহিরাগত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানায় এবিভিপি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে সংগঠনটি জানতে চায়, এই অনুষ্ঠানের অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যেই কনভেনশনের বক্তারা পারস্পরিক সংহতি বজায় রেখে শিক্ষাঙ্গন ও ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।