International

‘ফোনটাও কি নিরাপদ?’

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • পুলিশের তল্লাশি ও জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা আরও বাড়াতে নতুন বিল এনেছে ত্রিনিদাদ ও টোবাগো সরকার।
  • কিন্তু সেই বিলেই সাংবাদিকতার গোপনীয়তা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন দেশের সাংবাদিকেরা।
  • তাঁদের দাবি, বিলের সংশ্লিষ্ট ধারায় জরুরি ভিত্তিতে সংশোধন এনে সাংবাদিকদের কাজের উপকরণ ও গোপন সংবাদসূত্রকে স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা দিতে হবে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

পুলিশের তল্লাশি ও জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা আরও বাড়াতে নতুন বিল এনেছে ত্রিনিদাদ ও টোবাগো সরকার। কিন্তু সেই বিলেই সাংবাদিকতার গোপনীয়তা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন দেশের সাংবাদিকেরা। তাঁদের দাবি, বিলের সংশ্লিষ্ট ধারায় জরুরি ভিত্তিতে সংশোধন এনে সাংবাদিকদের কাজের উপকরণ ও গোপন সংবাদসূত্রকে স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা দিতে হবে।

সরকারের দাবি, ক্যারিবীয় দেশটিতে অপরাধ ও খুনের উদ্বেগজনক হার মোকাবিলার লক্ষ্যেই ‘স্পেশাল অপারেশনস বিল ২০২৬’ আনা হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর বিলটি পাশও হয়েছে।

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় লাগাতার জরুরি অবস্থার মধ্যে রয়েছে ত্রিনিদাদ ও টোবাগো। এর ফলে গ্রেফতার, আটক, তল্লাশি এবং জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ে প্রযোজ্য কিছু সাংবিধানিক অধিকার এড়িয়ে যাওয়ার অতিরিক্ত ক্ষমতা পেয়েছে পুলিশ।

এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের আশঙ্কা, নতুন আইন কার্যকর হলে তাঁদের নোটবই, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ কিংবা অন্যান্য কাজের উপকরণও পুলিশের তল্লাশি বা বাজেয়াপ্তের আওতায় চলে আসতে পারে। তাই আইনে স্পষ্ট ব্যতিক্রমের দাবি তুলেছেন তাঁরা।

অতীতেও সাংবাদিকদের বাড়ি ও দফতরে পুলিশি তল্লাশির অনুমতি দেওয়া পরোয়ানাকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে হয়েছে।

বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ত্রিনিদাদ ও টোবাগো দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে ছিল। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৫ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে দেশটির স্থান ছিল ১৯তম। কিন্তু ২০২৬ সালে ১৩ ধাপ নেমে তা হয়েছে ৩২তম।

সাংবাদিকদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে আরও একটি প্রশ্ন—অনিয়ম বা দুর্নীতি ফাঁস করতে তথ্য দেওয়া গোপন সংবাদসূত্রদের কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে? তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পুলিশের হাতে চলে গেলে সেই সুরক্ষা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সাংবাদিক মহলের।

মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশন অব ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো (ম্যাট)-এর সভাপতি প্রায়র বেহারি জানিয়েছেন, বিলের ১৫ নম্বর ধারা জরুরি ভিত্তিতে সংশোধনের দাবি জানিয়েছে তাঁদের সংগঠন। তাঁদের দাবি, সাংবাদিকদের কাজের উপকরণ এবং গোপন সংবাদসূত্র সংক্রান্ত তথ্যকে পুলিশের সাধারণ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্য স্পষ্ট বিধান প্রয়োজন।

বিলের ১৫ নম্বর ধারায় কোনও ‘বৈধ পেশা বা ব্যবসায়’ ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং আইনজীবী-মক্কেলের গোপন যোগাযোগের আইনি সুরক্ষার আওতায় থাকা নথি বা উপকরণ বাজেয়াপ্ত করতে পুলিশকে নিষেধ করা হয়েছে।

কিন্তু ম্যাটের অভিযোগ, সাংবাদিকতাকে সেখানে সুরক্ষাপ্রাপ্ত পেশা হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তল্লাশির সময় সাংবাদিকতার গোপনীয় উপকরণ পাওয়া গেলে সেগুলি কীভাবে সামলানো হবে, তারও কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই।

সংগঠনটির দাবি, ধারা ১৫ সংশোধন করে সাংবাদিকতাকে স্পষ্টভাবে ‘সুরক্ষাপ্রাপ্ত বৈধ পেশা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের ফোন, কম্পিউটার, নোটবই ও অন্যান্য কাজের উপকরণ এবং গোপন সংবাদসূত্রের পরিচয় সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

ডিজিটাল যুগে পুলিশের তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তের ক্ষমতা আরও বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে মনে করেন বেহারি। তাঁর কথায়, এখন একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের হাতিয়ারই হতে পারে একটি মোবাইল ফোন।

সাম্প্রতিক জরুরি অবস্থাগুলিতে সাংবাদিকেরা সরাসরি হুমকির মুখে পড়েননি বলে জানালেও তিনি দাবি করেন, সংবাদমাধ্যমের উপর অন্য ধরনের বিধিনিষেধ ক্রমশ বাড়ছে।

বেহারির অভিযোগ, সরকারের শীর্ষস্তরে সাংবাদিকদের পৌঁছনোর সুযোগও কমেছে। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনও আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক বৈঠক করেননি। বিভিন্ন মন্ত্রক সরকারি সম্পদ ব্যবহার করেও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে না, অথচ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।

স্বাধীন সাংবাদিক পিয়ার্স রবিনসনের মতে, নজরদারির ক্ষমতা বৃদ্ধি, সাংবাদিকদের জন্য স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা ছাড়াই তল্লাশির ক্ষমতা বাড়ানো এবং মন্ত্রীদের কাছে সাংবাদিকদের পৌঁছনোর সুযোগ কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সামনে ‘বাস্তব’ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এর প্রভাব গুরুতর হতে পারে বলে তাঁর মত।

রবিনসনের কথায়, সাংবাদিকের ফোন, ল্যাপটপ বা নোটবইয়ে পুলিশের তল্লাশি বা বাজেয়াপ্তের আশঙ্কা থাকলে গোপনীয়তা বজায় রেখে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবাদসূত্ররা পিছিয়ে যেতে পারেন। অথচ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অন্যতম ভিত্তিই হল, তথ্যদাতারা নিরাপদে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন—এই বিশ্বাস।

শুধু তল্লাশি নয়, ফোনে আড়ি পাতা এবং নজরদারি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো গার্ডিয়ানের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উল্লেখ করেছেন রবিনসন।

ওই প্রতিবেদনের দাবি, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ত্রিনিদাদ ও টোবাগোয় যোগাযোগে আড়ি পাতার জন্য বিচারকেরা ৩১৪টি পরোয়ানা অনুমোদন করেছেন।

ফলে নতুন বিল ঘিরে বিতর্কটি শুধু পুলিশের ক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে নয়। সাংবাদিকদের আশঙ্কা, তাঁদের ফোন ও ল্যাপটপের মতো দৈনন্দিন কাজের সরঞ্জাম যদি নিরাপদ না থাকে, তা হলে নিরাপদ থাকবে না সংবাদসূত্রও। আর সেখানেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হচ্ছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles