International

‘আর অরবান নয়’

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ইউরোপীয় ইউনিয়নে নতুন করে যোগ দেওয়া কোনও দেশে যাতে ভবিষ্যতে ভিক্টর অরবানের মতো নেতৃত্বের উত্থান না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে চায় ইউরোপীয় কমিশন।
  • সেই লক্ষ্যে নতুন সদস্যদের জন্য ১৫ বছরের একটি ‘পরীক্ষাকাল’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন ইইউয়ের সম্প্রসারণ কমিশনার মার্তা কোস।
  • দ্য গার্ডিয়ান-সহ ইউরোপের কয়েকটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোস জানিয়েছেন, নতুন সদস্যরাষ্ট্রগুলি গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং ইইউয়ের মৌলিক মূল্যবোধ মেনে চলছে কি না, তা নজরে…

বিস্তারিত প্রতিবেদন

ইউরোপীয় ইউনিয়নে নতুন করে যোগ দেওয়া কোনও দেশে যাতে ভবিষ্যতে ভিক্টর অরবানের মতো নেতৃত্বের উত্থান না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে চায় ইউরোপীয় কমিশন। সেই লক্ষ্যে নতুন সদস্যদের জন্য ১৫ বছরের একটি ‘পরীক্ষাকাল’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন ইইউয়ের সম্প্রসারণ কমিশনার মার্তা কোস।

দ্য গার্ডিয়ান-সহ ইউরোপের কয়েকটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোস জানিয়েছেন, নতুন সদস্যরাষ্ট্রগুলি গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং ইইউয়ের মৌলিক মূল্যবোধ মেনে চলছে কি না, তা নজরে রাখতে বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। কোনও দেশ এই মানদণ্ড থেকে সরে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও ইইউয়ের হাতে থাকা উচিত বলে তাঁর মত।

কোসের কথায়, “আর কোনও ভিক্টর অরবান নয়।” তাঁর দাবি, নতুন কোনও সদস্য আইনের শাসন, গণতন্ত্র বা ইইউয়ের মূল্যবোধের বিরুদ্ধে গেলে শুধু চুক্তির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের ওপর নির্ভর করে বসে থাকা যাবে না। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আরও কার্যকর পদ্ধতি প্রয়োজন।

মঙ্গলবার প্রকাশিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন সদস্যরাষ্ট্রগুলিকে ১৫ বছরের একটি পরীক্ষাকালের মধ্যে রাখা হবে। এই সময়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ লঙ্ঘন করলে, কিংবা ইইউয়ের প্রতি আন্তরিক সহযোগিতার নীতি না মানলে, সংশ্লিষ্ট দেশের ভোটাধিকার স্থগিত করা বা ইইউয়ের তহবিল বন্ধ করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

তবে এই প্রস্তাব কার্যকর করতে বর্তমান সদস্যরাষ্ট্রগুলির সম্মতি প্রয়োজন।

ইইউ চুক্তির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও সদস্যরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ‘গুরুতর ও ধারাবাহিকভাবে’ লঙ্ঘন করলে তার ভোটাধিকার স্থগিত করা যায়। কিন্তু এত দিন এই চূড়ান্ত শাস্তি বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়নি। পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির আগের সরকারগুলির আমলে গণতন্ত্রের অবক্ষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চললেও সেই ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।

এর অন্যতম কারণ ছিল, হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড নিজেদের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে পরস্পরকে সম্ভাব্য শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারত।

নতুন পরিকল্পনায় গণতান্ত্রিক মানদণ্ড ভাঙলে ভোটাধিকার স্থগিত বা অন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম তুলনামূলকভাবে সহজ করার প্রস্তাব রয়েছে। ইইউয়ের এক আধিকারিকের কথায়, এটি ‘বড় নতুন পদক্ষেপ’। তাঁর মতে, সম্প্রসারণ নিয়ে যেসব দেশের নাগরিকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে, তাঁদের কাছে এই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ—নতুন সদস্যরা পরে নিয়ম ভাঙলেও তা মোকাবিলার জন্য ইইউয়ের হাতে শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকবে।

তবে এই সুরক্ষাব্যবস্থারও মেয়াদ থাকবে। কোসের মতে, তা অনির্দিষ্টকালের জন্য চালু রাখা হলে ইইউয়ের মধ্যে ‘প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির’ সদস্যরাষ্ট্র তৈরির ঝুঁকি থাকবে।

ইইউয়ের সম্প্রসারণ নিয়ে নতুন করে গতি আসার সময়েই এই প্রস্তাব সামনে এল। সদস্যপদের দৌড়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলির মধ্যে রয়েছে মন্টেনেগ্রো, আলবেনিয়া, মলদোভা ও ইউক্রেন।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর ইইউ সম্প্রসারণের প্রশ্নে নতুন গতি আসে। দীর্ঘদিন ধরে কার্যত স্থবির থাকা প্রক্রিয়ায় নতুন করে গুরুত্ব পায় ইউক্রেন ও মলদোভা। রুশ হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই দুই দেশ ইইউ সদস্যপদের আবেদন করে। এর প্রভাব পড়ে পশ্চিম বলকানের দেশগুলির দীর্ঘদিনের সদস্যপদ পাওয়ার প্রচেষ্টাতেও।

প্রায় ১ কোটি ৭৪ লক্ষ মানুষের এই অঞ্চলকে ঘিরে রাশিয়া ও চিনের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও রয়েছে।

তবে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে ইইউয়ের ২৭টি সদস্যরাষ্ট্রের সর্বসম্মতি প্রয়োজন। বিশেষ করে ফ্রান্স ও চেক প্রজাতন্ত্রের ভোটারদের মধ্যে সম্প্রসারণ নিয়ে সংশয় রয়েছে।

তা সত্ত্বেও সম্প্রসারণকে রাজনৈতিকভাবে সম্ভব বলে মনে করেন কোস। পূর্ব ইউরোপ ও বলকানে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সদস্যরাষ্ট্রগুলিও ‘কী ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে’ তা বুঝতে পারছে।

রাশিয়া ও চিনকে তিনি ইইউয়ের প্রতিবেশী দেশগুলিতে প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী ‘বাইরের শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। কোসের মতে, ইইউ যদি প্রতিবেশী দেশগুলিকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে না পারে, তা হলে অন্য শক্তি সেই দেশগুলিকে ইইউয়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে।

তাঁর দাবি, রাশিয়া বিভিন্ন দেশকে ইউরোপমুখী পথ থেকে সরিয়ে আনতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। মলদোভা ও ইইউয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী আর্মেনিয়ার নির্বাচন প্রসঙ্গেও তিনি রুশ প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, চিন বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজের অর্থনৈতিক শক্তিকে প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ তাঁর।

ইইউয়ের আধিকারিকেরা আশা করছেন, আগামী সপ্তাহেই ইউক্রেন ও মলদোভার সঙ্গে ইইউ আইনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা শুরু করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ বাজার এবং প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত বিষয়। এই ‘ক্লাস্টার’-এর মধ্যে অর্থনৈতিক ও মুদ্রানীতি, করনীতি, গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যম-সহ ইইউয়ের বিস্তৃত বিধিব্যবস্থা রয়েছে।

তবে যুদ্ধরত কোনও দেশ, অথবা যার ভূখণ্ডে সংঘাত আপাতত থেমে থাকলেও তার রাজনৈতিক নিষ্পত্তি হয়নি, সেই দেশ ইইউয়ের সদস্য হতে পারবে কি না—এখনই সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি কোস।

তিনি অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, ইইউয়ের বাজারে ইউক্রেনের প্রবেশে বর্তমান বিধিনিষেধ বহাল থাকলে দেশটির কৃষকরা ইইউয়ের কৃষি ভর্তুকি পাবেন না।

ইইউয়ের আধিকারিকদের মতে, ইউক্রেনের কৃষি উৎপাদনের পরিসর বর্তমান সদস্যরাষ্ট্রগুলির তুলনায় অনেক বড়। যুদ্ধের আগে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে খাদ্যশস্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী ছিল ইউক্রেন। দেশটিকে প্রায়ই ‘ইউরোপের শস্যভান্ডার’ বলা হয়।

আগামী সপ্তাহে ইইউ নেতাদের বৈঠকে সম্প্রসারণ নিয়ে আরও বেশ কিছু কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে সদস্যরাষ্ট্রগুলিকে।

ভবিষ্যতে ইইউয়ের সদস্যসংখ্যা ৩৫-এ পৌঁছলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলাবস্থা এড়াতে কর ও নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলিকে ভেটো ক্ষমতা ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হতে পারে। পাশাপাশি, ব্রাসেলসে ইউরোপীয় কমিশনে সব সময় প্রত্যেক সদস্যরাষ্ট্রের একজন করে কমিশনার থাকবেন—এই ব্যবস্থাও বদলানোর প্রস্তাব রয়েছে।

এমন উদ্যোগ অবশ্য অতীতেও বিরোধিতার মুখে পড়েছে। ২০০৮ সালে আয়ারল্যান্ডের ভোটাররা লিসবন চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, ইইউয়ের শীর্ষ নির্বাহী সংস্থায় আয়ারল্যান্ডের স্থায়ী কমিশনারের পদ হারানোর আশঙ্কা। পরের বছর অবশ্য আয়ারল্যান্ড চুক্তির পক্ষে ভোট দেয়। তার আগে ইইউ নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ইউরোপীয় কমিশনে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একজন করে কমিশনার রাখার ব্যবস্থা বজায় থাকবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles