বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারের সমর্থনপুষ্ট বসতি স্থাপনকারী সন্ত্রাসবাদীরা পশ্চিম তীরে এথনিক ক্লিনসিং  চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করলেন ব্রিটিশ বিদেশসচিব এড মিলিব্যান্ড। ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রিটেনের তরফে এমন কঠোর ভাষায় নিন্দা এর আগে শোনা যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, মানুষের ভয়াবহ দুর্ভোগ চলতে থাকলেও তিনি আর নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকবেন না। দ্য গার্ডিয়ানে একটি নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেন ব্যবস্থা নিতে ইতস্তত করেছে, কারণ তার ভয় ছিল, তাকে ‘ইজরায়েল-বিরোধী’ বলে অভিযুক্ত করা হবে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে বিদেশসচিব জানান, এখন থেকে ব্রিটিশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হবে—পশ্চিম তীরে ইজরায়েলের দখলদারি সম্পূর্ণ বেআইনি। একই সঙ্গে ইজরায়েলি বসতিগুলির সঙ্গে বাণিজ্যের উপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন তিনি।

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান হিংসার পটভূমিতে গোটা গ্রীষ্মকাল ধরে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার পর ব্রিটেনের অবস্থানে এই নাটকীয় পরিবর্তন এল। ফ্রান্স ও কানাডা-সহ মোট ১২টি দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ঘোষণা করেছে।

একটি যৌথ বিবৃতিতে বার্নহ্যাম, ইমানুয়েল মাকরঁ এবং মার্ক কার্নি বলেছেন, “আরও দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই অতিরিক্ত পদক্ষেপ করার সময় এসেছে। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান রক্ষার অঙ্গীকার বজায় রাখতে, আমাদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে এবং আমাদের মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়াতে এই পদক্ষেপ প্রয়োজন।”

পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইজরায়েলের বিদেশমন্ত্রী গিডিয়ন সার জেরুসালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করার কথা ঘোষণা করেছেন। জেরেমি করবিন ও লেবার সাংসদ ডায়ান অ্যাবট-সহ ১২ জন ব্রিটিশ সাংসদ এবং আন্দোলনকর্মীর ইজরায়েলে প্রবেশও নিষিদ্ধ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

মিলিব্যান্ডের বিরুদ্ধে ‘ডাহা মিথ্যাচারের’ অভিযোগ এনে সার বলেছেন, ব্রিটিশ সরকার পরিকল্পিত ভাবে ইজরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে। ইজরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে আমেরিকা।

তবে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো বলেছেন, ওয়াশিংটন ‘অবশ্যই’ ব্রিটেনের পথ অনুসরণ করবে না। পশ্চিম তীর অস্থিতিশীল হয়ে পড়ুক, তা-ও আমেরিকা চায় না। এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। বার্নহ্যাম অবশ্য এই পরিকল্পনার কথা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আগেই জানিয়েছিলেন।

পার্লামেন্টে মিলিব্যান্ড জানান, অধিকৃত ভূখণ্ডের বেআইনি বসতিগুলি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করবে ব্রিটিশ সরকার। দখলদারি বজায় রাখতে কার্যকর ভাবে সাহায্য করে, এমন অস্ত্র রফতানির অনুমতি এবং অন্যান্য রফতানির উপরও নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি হবে।

ইজরায়েলি বসতিগুলির জন্য নির্মাণকাজ বা অর্থ জোগানোর মতো পরিষেবা দেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা চালু করা হবে। ব্রিটেনে ওই বসতিগুলির বিজ্ঞাপন দেওয়াও নিষিদ্ধ হবে। পাশাপাশি, বসতি স্থাপনকারীদের হিংসায় মদত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।

বিদেশসচিব বলেন, এই পদক্ষেপ দেখিয়ে দেবে, “গভীর অন্যায়ের মুখে ব্রিটেন নীরব নয়, আবার অসহায়ও নয়।” আবেগপূর্ণ বিবৃতিতে তিনি পশ্চিম তীরের সেই প্যালেস্টাইনিদের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন, যাঁদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গাজার চিকিৎসকদের কাছ থেকে শোনা অভিজ্ঞতার কথাও বলেন—চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শিশুদের মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছেন তাঁরা।

জেরুসালেমের পূর্ব দিকে ‘ই-১’ বসতি প্রকল্প সম্প্রসারণের ইজরায়েলি পরিকল্পনা ব্রিটেনের পদক্ষেপকে আরও জরুরি করে তুলেছে। এই সম্প্রসারণ কার্যত পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে কার্যকর প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনাই বিপন্ন হবে।

মন্ত্রীদের আশা, বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য বিধিনিষেধ কার্যকর করার আইন আগামী ন’মাসের মধ্যে তৈরি হয়ে যাবে। তবে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে তা কার্যকর হতে দেরি হতে পারে।

বামপন্থীদের একাংশের দাবি সত্ত্বেও গাজায় ইজরায়েলের কার্যকলাপকে ‘গণহত্যা’ বলতে রাজি হননি মিলিব্যান্ড। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবে ব্রিটেন। তবে ‘যুদ্ধাপরাধের’ প্রমাণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

কমন্সে মিলিব্যান্ড বলেন, “ব্রিটিশ সরকার একমত যে, পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় প্যালেস্টাইনিদের জাতিগত ভাবে নির্মূল করা হচ্ছে। এই কাজ চালাচ্ছে বসতি স্থাপনকারী সন্ত্রাসবাদীরা।

“বারবার ইজরায়েল সরকার এ দিকে চোখ বুজে থেকেছে। তার চেয়েও খারাপ হল, ওই সরকারের সদস্যরা এমন বক্তব্য রেখেছেন এবং এমন পদক্ষেপ করেছেন, যা প্যালেস্টাইনিদের জোর করে বাস্তুচ্যুত করাকে সমর্থন জুগিয়েছে।

“এই কথা বলার গুরুত্ব আমি বুঝি। কিন্তু যাঁরা এমন দুর্ভোগের মুখোমুখি, তাঁদের অন্তত সত্য কথাটুকু শোনার অধিকার রয়েছে। আর সেই সত্য স্বীকারই হওয়া উচিত ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ।”

মিলিব্যান্ড ইঙ্গিত দেন, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন কিয়ের স্টারমার পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। সাংসদদের তিনি বলেন, “আমি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলছি, আমাদের আরও আগে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। নতুন প্রধানমন্ত্রী এসে পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করার পরেই এই পদক্ষেপ সম্ভব হয়েছে।”

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গাজা নিয়ে লেবার পার্টির অবস্থানের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন বার্নহ্যাম। দলের প্রগতিশীল ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা ছিল সেটি। এ বার তিনিও বলেছেন, ব্যবস্থা নিতে আগের সরকার অত্যন্ত দেরি করেছে।

তিনি লিখেছেন, “আমরা বছরের পর বছর মধ্যপ্রাচ্যে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে কথা বলে এসেছি। কিন্তু আমাদের স্বীকার করতে হবে, সেই কথার সঙ্গে কাজের মিল না থাকলে কথাগুলি অর্থহীন। দীর্ঘদিন ধরে আমরা ব্যবস্থা নিতে ইতস্তত করেছি, ভয় পেয়েছি আমাদের ইজরায়েল-বিরোধী বলা হবে।”

মিলিব্যান্ড বলেন, তিনি শুধু বিদেশসচিব হিসেবেই এই পদক্ষেপ করছেন না; করছেন একজন ‘গর্বিত ব্রিটিশ ইহুদি’ হিসেবেও, যাঁর আত্মীয়েরা হলোকস্টের পরে ইজরায়েলে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “আমার ইহুদি পরিচয় নিয়ে আমি গর্বিত। ইজরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি আমার সমর্থনও অবিচল।

“এর সঙ্গে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের প্রতি আমার সমর্থনের কোনও বিরোধ নেই। বরং ঠিক উল্টো। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভিত্তিই হল এই স্পষ্ট বিশ্বাস—দুই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার একমাত্র পথ হল স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে পাশাপাশি বসবাস করা।”

বিদেশসচিব জানান, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইহুদিদের বিরুদ্ধে হুমকির মোকাবিলায় লেবাননের হিজবুল্লার অর্থ জোগানদাতা প্রতিষ্ঠান আল-কার্দ আল-হাসানের উপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করবে ব্রিটেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আমেরিকার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ইরানের উপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও ফের কার্যকর করা হবে।

তাঁর কথায়, এই পদক্ষেপ ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইন সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নিন্দা জানিয়ে থেমে থাকবে না, ব্যবস্থাও নেবে।

মিলিব্যান্ড বলেন, “ইজরায়েলের জনগণের সঙ্গে আমাদের বিরোধ নেই। তাঁদের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক অটুট। আমাদের আপত্তি তাঁদের সরকারের আচরণ নিয়ে।”

বার্নহ্যাম লিখেছেন, ইজরায়েল সরকারের কাজের জন্য ব্রিটেনের ইহুদি সম্প্রদায়কে দায়ী করা চলবে না। “এটা সরাসরি অন্যায়। এবং এটা সরাসরি ইহুদিবিদ্বেষ,” লিখেছেন তিনি।

“গত সপ্তাহেই আমি ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেছি। প্রতিদিন তাঁরা যে আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকেন, তা আমি জানি। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমাদের সমাজের প্রতিটি অংশ থেকে ইহুদিবিদ্বেষ দূর করতে আমার সরকার কোনও চেষ্টার ত্রুটি রাখবে না।”

বিরোধী দলের ছায়া বিদেশসচিব টম টুগেনহ্যাট বলেন, “বেআইনি বসতি স্থাপন অন্যায়।” তবে তাঁর দাবি, মিলিব্যান্ড এমন নীতি চালু করছেন, যা কার্যকর হবে বলে ব্রিটিশ বিদেশ দফতর নিজেই বিশ্বাস করে না। সরকারের অন্দরমহলের সূত্র অবশ্য এই দাবি অস্বীকার করেছে।

প্রবীণ এই কনজারভেটিভ সাংসদ আরও বলেন, পশ্চিম তীরে কর্মরত প্যালেস্টাইনিদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, প্যালেস্টাইন ও ইজরায়েলের অর্থনীতি এতটাই পরস্পরের সঙ্গে জড়িত যে, বেআইনি বসতির পণ্যে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব হবে না।

তবে আর এক প্রবীণ কনজারভেটিভ সাংসদ এডওয়ার্ড লি নিষেধাজ্ঞাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, “কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব ইজরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘদিনের সদস্য হিসেবে আমি গর্বের সঙ্গে বলছি, তিনি আজ যা করছেন, তাকে আমি নিঃশর্ত ও সম্পূর্ণ সমর্থন করি। কারণ, এর অর্থ বিশ্বের সমস্ত মানুষের স্বাধীনতা, নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো।”

ইজরায়েল সম্পর্কে ব্রিটিশ নীতি নতুন করে সাজানোর যে বৃহত্তর চেষ্টা বার্নহ্যাম সরকার করছে, এই পদক্ষেপ তারই অংশ। সংঘাতের শুরুর দিকে ব্রিটেনের মুসলিম ও প্রগতিশীল ভোটারদের মধ্যে যে আস্থা লেবার হারিয়েছিল, তা ফিরে পাওয়াও এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

লেবার সাংসদদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় এই প্রশ্নে চাপের মুখে পড়ছিলেন। তবে স্থানীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে কয়েক জন সতর্কতাও জানিয়েছেন।

পার্লামেন্টের বিদেশবিষয়ক বাছাই কমিটির লেবার চেয়ারপার্সন এমিলি থর্নবেরি বলেন, “অবশেষে! একটি ব্রিটিশ সরকার—একটি লেবার সরকার—শেষ পর্যন্ত সঠিক কাজ করছে, দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত… আর অসহায় ভাবে হাত কচলানো দর্শক হয়ে থাকছে না।